হাঙ্গেরি আর যুক্তরাষ্ট্র—দুই দেশে স্কলারশিপ পেয়েও যেতে পারেননি তানজুমান আলম ঝুমা। এক বছরের বেশি সময় ধরে চেষ্টা করেও ভিসা পাননি। শুধু শিক্ষার্থীরা নন, পর্যটক, ব্যবসায়ী, এমনকি শ্রমিকরাও এখন ভিসা পেতে হিমশিম খাচ্ছেন। ভারতে ভিসা জটিলতা ছাড়াও ইউরোপ, আমেরিকা, এশিয়ার অনেক দেশেই বাড়তি কড়াকড়ি। প্রত্যক্ষ কোনো নিষেধাজ্ঞা না থাকলেও কেন দিচ্ছে না দেশগুলো? বিশ্লেষকরা বলছেন, ভিসার অপব্যবহার ও রাজনৈতিক অস্থিরতাই মূল কারণ।
বিদেশে পড়তে যাওয়ার স্বপ্ন দেখেছিলেন তানজুমান আলম ঝুমা। বেশ কয়েক মাস চেষ্টার পর হাঙ্গেরির বুদাপেস্টে স্কলারশিপ পান। আবেদন করেন ভিসার জন্য। জানুয়ারিতে এল ‘নো’। পরে যুক্তরাষ্ট্রের জন্যও আবেদন। এবারও শেষরক্ষা হয়নি। অক্টোবর থেকে নভেম্বর পর্যন্ত প্রায় সাড়ে ১২ মাস শুধু ভিসার পেছনে সময় গেছে তাঁর। এখন সব স্বপ্ন যেন আটকে আছে কাগজপত্রের জটিলতায়।
তানজুমানের গল্প শুধু এককের নয়। সম্প্রতি বাংলাদেশি শিক্ষার্থী, পর্যটক, এমনকি শ্রমিকদের জন্যও ভিসা পাওয়া যেন দুঃসাধ্য হয়ে উঠেছে। ট্যুর অপারেটর অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ-টোয়াবের সভাপতি মো. রাফেউজ্জামান বলছেন, ‘ইন্ডিয়া, ইউএই, কাতার, বাহরাইন, ওমান, উজবেকিস্তান, সৌদি আরব, ভিয়েতনাম—এই সব দেশ আমাদের ভিসা দিচ্ছে না।’
শুধু তা–ই নয়, থাইল্যান্ডের ভিসা পেতে লম্বা সময় লাগছে। সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়ার ভিসা অনুমোদনের হার কমে গেছে। ফিলিপাইন অনেক সময় নিচ্ছে। ইন্দোনেশিয়ার ভিসা ফি বেড়েছে। অ্যারাইভাল ভিসা দেওয়া শ্রীলঙ্কাও ইলেক্ট্রনিক ভিসা দিতে দুই-তিন দিন সময় নিচ্ছে।
কার্যত নিষেধাজ্ঞা নেই, কিন্তু ভিসা মিলছে না
বাংলাদেশের ওপর কার্যত কোনো দেশই ভিসা নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেনি। তবে বাস্তবে অনেক দেশ ভিসা দেওয়ার ক্ষেত্রে কঠোর অবস্থান নিচ্ছে। পর্যটন ব্যবসায়ী মহিউদ্দিন সেলিম বিবিসি বাংলাকে জানান, যুক্তরাষ্ট্র প্রতি বছর পাঁচ-ছয় লাখ ভিসা দিলেও এ বছর দিয়েছে দু’লাখেরও কম। একই চিত্র অস্ট্রেলিয়া, কানাডার ক্ষেত্রেও।
‘যুক্তরাষ্ট্র, অস্ট্রেলিয়া বা কানাডা ২০২৩-২৪ সালে আমাদের পাসপোর্টের মেয়াদ অনুযায়ী ভিসা দিয়েছে, কিন্তু এ বছর কোনো দেশই ভিসা দিচ্ছে না,’ বলেন তিনি।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট গণঅভ্যুত্থানের পর ভারত বাংলাদেশিদের জন্য পর্যটন ভিসা বন্ধ করে দেয়। এটি রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত বলে ধরা হলেও এর বাইরে ইউরোপ, আমেরিকা ও এশিয়ার অনেক দেশ নীরবেই ভিসা দেওয়া কমিয়ে দিয়েছে।
কেন ভিসা দিচ্ছে না দেশগুলো?
বিশ্লেষকেরা বলছেন, ভিসা জটিলতার পেছনে কয়েকটি কারণ কাজ করছে। প্রথমত, অনিয়মিত অভিবাসন ও ভিসার অপব্যবহার। সাবেক রাষ্ট্রদূত এম হুমায়ুন কবির মনে করেন, ‘ভিসা পাওয়ার সুযোগকে অপব্যবহার করে অনেকে অনিয়মিতভাবে যাচ্ছে। ভিয়েতনাম, থাইল্যান্ডের মতো দেশগুলো যেখানে অভিবাসনবিরোধী আবহ নেই, তারাও এখন সতর্ক হচ্ছে।’
দ্বিতীয়ত, প্রবাসে গিয়ে রাজনৈতিক দলের কর্মী–সমর্থকদের প্রকাশ্য বিবাদ বাংলাদেশের ভাবমূর্তি নষ্ট করছে। তৃতীয়ত, হেনলি পাসপোর্ট ইনডেক্স অনুযায়ী বিশ্বের দুর্বলতম পাসপোর্টের তালিকায় বাংলাদেশ সপ্তম। মাত্র ৩৮টি দেশে ভিসামুক্ত ভ্রমণের সুযোগ আছে, যার অধিকাংশ আফ্রিকা ও ক্যারিবীয় অঞ্চলে।
এছাড়া রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা অবৈধ অভিবাসনের প্রবণতা বাড়িয়েছে, যা ভিসা প্রদানে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
সমাধান কোথায়?
সাবেক রাষ্ট্রদূত হুমায়ুন কবিরের মতে, ভারতের ভিসা জটিলতা পুরোপুরি রাজনৈতিক। সেখানে নির্বাচিত সরকার না আসা পর্যন্ত পরিবর্তনের সুযোগ নেই। তবে অন্য দেশগুলোর ক্ষেত্রে কূটনৈতিক উদ্যোগ নেওয়া জরুরি।
তিনি বলেন, ‘দেশের ভেতরে যারা অসৎ উপায়ে মানুষ পাঠাচ্ছেন, তাদের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান আইনি ব্যবস্থা নিতে হবে। তাহলে এই বাড়তি জটিলতা থেকে বেরিয়ে আসা সম্ভব হবে।’
বিশ্লেষকেরা মনে করছেন, সরকারকে এখন কূটনৈতিক তৎপরতা বাড়ানোর পাশাপাশি ভিসার অপব্যবহার রোধে কঠোর অবস্থান নিতে হবে। এককথায়, শুধু প্রতিশ্রুতি নয়, প্রয়োজন বাস্তব কর্মপরিকল্পনা।
কারণ আটকে থাকা প্রতিটি ভিসার আবেদনের পেছনে আছে একটি করে স্বপ্ন—পড়াশোনা, ভালো চাকরি, ব্যবসা, বা শুধু একটু ঘুরে বেড়ানোর স্বপ্ন। সেই স্বপ্নের কাছে ‘না’ শুনতে চান না লাখো বাংলাদেশি।
