কিশোরগঞ্জের কটিয়াদীতে এক সৌদিপ্রবাসীর বাড়ি থেকে নগদ টাকা ও স্বর্ণ লুটের ঘটনায় ভুক্তভোগীর আপন ছোট ভাই মিজান ও তাঁর সহযোগী ইমনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। আজ শুক্রবার ভোরে অভিযান চালিয়ে তাঁদের আটক করা হয়। লুট হওয়া স্বর্ণ ও টাকার বড় অংশ উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
বাড়ির ভেতরের লোকই ডাকাত? কটিয়াদীর বনগ্রাম ইউনিয়নের জামষাইট গ্রামে ঘটনাটি এমন চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করেছে। সৌদি প্রবাসী রফিকুল ইসলামের স্ত্রীকে বেঁধে ও ভয়ভীতি দেখিয়ে দুর্বৃত্তরা লুট করে তিন লাখ টাকা, ১১ ভরি স্বর্ণালংকার ও একটি মোবাইল ফোন। ঘটনাটি ঘটে গত সোমবার সকালে। পরদিন মঙ্গলবার থানায় মামলা হলে পুলিশ তদন্তে নামে।
তবে কে বা কারা এই লুটের ঘটনা ঘটিয়েছে, তা নিয়ে ধোঁয়াশা ছিল। পুলিশ বিভিন্ন সূত্র খুঁজতে থাকে। শেষ পর্যন্ত ধরা পড়েন প্রবাসী রফিকুলের ছোট ভাই মিজান। আজ শুক্রবার ভোরে জামষাইট গ্রামে মিজানের শ্বশুরবাড়িতে অভিযান চালিয়ে তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরে তাঁর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী নিজ বাড়ির বসতঘর থেকে চালের বস্তার ভেতর থেকে লুট হওয়া স্বর্ণ ও নগদ টাকা উদ্ধার করে পুলিশ। গ্রেপ্তার করা হয়েছে তাঁর সহযোগী ইমনকেও।
ঘটনার বিস্তারিত
কটিয়াদী মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. রফিকুল ইসলাম জানান, অভিযোগ পাওয়ার পরপরই ঘটনাস্থল পরিদর্শন ও তদন্ত শুরু হয়। বিভিন্ন তথ্যপ্রমাণ ও সূত্রের ভিত্তিতে তদন্ত এগোলে নানা দিক সামনে আসে।
প্রাথমিকভাবে বাইরের কেউ ডাকাতি করেছে বলে ধারণা করা হলেও পুলিশের জেরায় বেরিয়ে আসে ভিন্ন চিত্র। নিজের ভাইয়ের বাড়িতে ডাকাতির ঘটনার মূল পরিকল্পনাকারী কে—এখন তা স্পষ্ট নয়, তবে মিজান জিজ্ঞাসাবাদে স্বীকারোক্তি দিয়েছেন বলে পুলিশ সূত্রে জানা গেছে।
ওসি বলেন, ‘মিজানকে তাঁর শ্বশুরবাড়ি থেকে গ্রেপ্তার করার পর তাঁর দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে তাঁর নিজ ঘর থেকে চালের বস্তার ভেতর থেকে নগদ টাকা ও স্বর্ণালংকার উদ্ধার করতে সক্ষম হয়েছি। পাশাপাশি তাঁর সহযোগী ইমনকেও গ্রেপ্তার করা হয়েছে।’
প্রবাসী বাড়িতে কেন বাড়ছে অরক্ষা?
একটি সৌদিপ্রবাসীর বাড়িতে ডাকাতি, আর সেই ডাকাতির সঙ্গে জড়িত তাঁর নিজের ছোট ভাই—এমন ঘটনা এলাকায় ব্যাপক আলোড়ন তুলেছে। সাধারণত প্রবাসীদের বাড়ি দীর্ঘদিন ফাঁকা থাকে, সেখানে চোর–ডাকাতের দল নজর রাখে। কিন্তু এখানে ঘটনা আরও শোচনীয়, কারণ আত্মীয় পরিজনের মধ্যে থেকেই ষড়যন্ত্র হয়েছে বলে পুলিশি তদন্তে প্রমাণিত হচ্ছে।
স্থানীয় সূত্র জানায়, প্রবাসী রফিকুল ইসলাম দীর্ঘদিন ধরে সৌদি আরবে কাজ করছেন। তাঁর স্ত্রী ও সন্তানরা গ্রামের বাড়িতেই থাকেন। সোমবার সকালে বাড়িতে একা পেয়ে দুর্বৃত্তরা তাঁর স্ত্রীকে বেঁধে ভয়ভীতি দেখিয়ে লুট করে। এখন আতঙ্ক ছড়িয়েছে এলাকায়।
প্রবাসীকল্যাণ ও স্থানীয় প্রশাসন বারবার বললেও প্রবাসী পরিবারগুলোর নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়। অনেক পরিবার বাড়িতে সিসি ক্যামেরা, নিরাপত্তাকর্মী বা আত্মরক্ষার ব্যবস্থা করতে পারেন না। সেটারই সুযোগ নিচ্ছে সুযোগসন্ধানীরা।
আইনি প্রক্রিয়া চলছে
গ্রেপ্তার দুই আসামিকে আদালতে পাঠানোর প্রস্তুতি চলছে। তাঁদের বিরুদ্ধে থানায় দায়েরকৃত মামলায় আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে। লুট হওয়া স্বর্ণ ও টাকা জব্দ করা হয়েছে। বাকি কোনো আলামত উদ্ধারে তদন্ত অব্যাহত আছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
এ ঘটনায় এলাকাবাসীর মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। কেউ কেউ বলছেন, ‘যেখানে আপন ভাইয়ের মতো কাছের মানুষ বিশ্বাসঘাতক হয়, সেখানে আর কার ওপর ভরসা রাখা যায়?’ প্রবাসী রফিকুল ইসলাম নিজে এখনো সৌদি আরবে রয়েছেন। এই খবরে তিনি মানসিকভাবে বিপর্যস্ত বলে পরিবার সূত্রে জানা গেছে।
প্রবাসী ও পরিবারের প্রতি অনুরোধ
প্রবাসীরা দেশের রেমিট্যান্সের চালিকাশক্তি। তাঁদের অর্জিত সম্পদ ও পরিবারের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। কটিয়াদীর এই ঘটনা প্রমাণ করে, শুধু বাইরের চোর–ডাকাত নয়, কখনো কখনো আপনজনেরাও হতে পারেন বিপদের কারণ। তাই প্রবাসী ও তাঁদের পরিবারগুলোর সতর্ক থাকা এবং প্রয়োজনে স্থানীয় প্রশাসন ও পুলিশের সঙ্গে সমন্বয় বাড়ানো জরুরি।
পাশাপাশি ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধে আইনের কঠোর প্রয়োগ এবং সম্পদের নিরাপত্তায় কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া এখন সময়ের দাবি। কারণ প্রবাসীর টাকা দেশে ফেরে, গড়ে ওঠে ঘর–সংসার, আর সেই স্বপ্নকে বাঁচিয়ে রাখতে প্রয়োজন সুরক্ষার নিশ্চয়তা।
