সংযুক্ত আরব আমিরাতে ভিসা জটিলতায় অনিশ্চয়তা, ফিরছেন অনেকে

সংযুক্ত আরব আমিরাতে ভিসা ট্রান্সফার বন্ধ থাকায় হাজারো বাংলাদেশি শ্রমিক বৈধতা হারানোর শঙ্কায়। জরিমানা, গ্রেপ্তার আর দেশে ফেরার আতঙ্কে প্রতিদিন কাটছে তাদের। ফিরছেন অনেকে, স্বপ্নভঙ্গের বেদনা বুকে নিয়ে। প্রবাসীর এই সংকট শুধু ব্যক্তির নয়, জড়িয়ে আছে দেশের রেমিট্যান্স ও অর্থনীতি।

মো. শফিকুল ইসলামের স্বপ্ন ছিল সংযুক্ত আরব আমিরাতে গিয়ে সংসারের হাল ধরবেন। কয়েক বছর আগে ভিসা নিয়ে দুবাই পাড়ি জমান তিনি। কিন্তু এখন সেই স্বপ্ন যেন ধুঁকছে। কোম্পানি পরিবর্তনের পথ বন্ধ, ভিসার মেয়াদ শেষ হওয়ার পথে, প্রতিদিন জরিমানা আর গ্রেপ্তারের ভয়ে থাকতে হচ্ছে তাকে। তাঁর মতো অবস্থা হাজারো বাংলাদেশি প্রবাসীর। অনেকে ইতিমধ্যে ফিরে এসেছেন ফাঁকা হাতে।

আরব আমিরাতের আকাশচুম্বী দালানের নিচে যেন লুকিয়ে আছে লাখো প্রবাসীর দীর্ঘশ্বাস। ২০১২ সাল থেকে শ্রমবাজারের এই অচলাবস্থা পুরোপুরি কাটেনি। কূটনৈতিক বৈঠক হয়েছে, আশ্বাস এসেছে, কিন্তু বাস্তবে তেমন পরিবর্তন নেই। অভিযোগ, সরকার পরিবর্তনের সময় আরব আমিরাত উচ্চপর্যায়ের সফরের গন্তব্য হয়, হয় বৈঠক–সংবাদ সম্মেলন, কিন্তু সমাধান অধরা থেকে যায়।

যে পথ বন্ধ, যে সংকট গভীর

একসময় ভিজিট ভিসায় এসে অনেক বাংলাদেশি কাজের সুযোগ তৈরি করতেন। এখন সেই পথ প্রায় বন্ধ। বর্তমানে সবচেয়ে বড় সংকট ভিসা ট্রান্সফার ও নবায়ন জটিলতা। চাকরি হারালে বা প্রতিষ্ঠান পরিবর্তন করতে চাইলে বৈধভাবে নতুন জায়গায় যোগ দেওয়ার সুযোগ নেই। ফলে অনেকে অবৈধ হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছেন।

প্রবাসী ব্যবসায়ীরাও উদ্বিগ্ন। তাঁদের ভাষ্য, নতুন শ্রমিক না আসায় এবং ট্রান্সফার জটিলতায় ব্যবসা পরিচালনা কঠিন হয়ে পড়েছে। ফ্যাক্টরিতে প্রয়োজনীয় দক্ষ কর্মী পাওয়া যাচ্ছে না। এতে বাজারে বাংলাদেশিদের অবস্থান দুর্বল হচ্ছে। দীর্ঘমেয়াদে এই বিশাল শ্রমবাজার হাতছাড়া হওয়ার শঙ্কা তৈরি হবে।

রেমিট্যান্সের চাকা থেমে যাওয়ার আশঙ্কা

বাংলাদেশের অর্থনীতিতে রেমিট্যান্স এক মেরুদণ্ড। মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর মধ্যে আরব আমিরাত গুরুত্বপূর্ণ উৎস। যে প্রবাসীরা কঠোর পরিশ্রমের টাকা দেশে পাঠিয়ে গ্রামগঞ্জের অসংখ্য পরিবার, সন্তানের শিক্ষা, চিকিৎসা, ঘরবাড়ির স্বপ্ন দেখান, তাঁরাই আজ নিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চিত। এই সংকট দীর্ঘায়িত হলে দেশের রেমিট্যান্স প্রবাহে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন বিশ্লেষকরা।

কূটনৈতিক দুর্বলতা কোথায়?

প্রশ্ন উঠছে, কেন বাংলাদেশ এখনো স্থিতিশীল সমাধান আনে নাই? পাকিস্তানের মতো দেশ কূটনৈতিক উদ্যোগ ও দক্ষ আলোচনার মাধ্যমে বারবার শ্রমবাজার চালু করতে সক্ষম হয়েছে। অথচ বাংলাদেশের ক্ষেত্রে বারবার ব্যর্থতা। বিশ্লেষকেরা বলছেন, স্থানীয় শ্রমবাজারের চাহিদা যথাযথ মূল্যায়ন না করা এবং দক্ষ জনশক্তি তৈরিতে ঘাটতি সংকট দীর্ঘায়িত করছে।

সময় এখন বাস্তব উদ্যোগের

প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ দূতাবাস ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আরও সক্রিয় ভূমিকা জরুরি। আরব আমিরাত সরকারের সঙ্গে জরুরি আলোচনায় বর্তমানে অবস্থানরত শ্রমিকদের ভিসা নবায়ন ও কোম্পানি থেকে কোম্পানিতে ট্রান্সফারের সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে। নতুন ভিসা চালুর চেয়ে বিদ্যমান শ্রমিকদের বৈধতা রক্ষা এখন গুরুত্বপূর্ণ।

প্রবাসীরা কোনো ভিআইপি সেবা চান না। তাঁরা চান রাষ্ট্র পাশে দাঁড়াক, সমস্যা শুনুক ও বাস্তবসম্মত সমাধান দিক। কারণ এই মানুষগুলোই দেশের অর্থনীতির চালিকাশক্তি। তাঁদের অনিশ্চয়তায় ফেলে রাখা মানে পরিবার, সমাজ ও পুরো দেশকে ক্ষতির মুখে ঠেলে দেওয়া।

দ্রুত কূটনৈতিক উদ্যোগের মাধ্যমে আরব আমিরাত সরকারের সঙ্গে কার্যকর আলোচনা ও ভিসা ট্রান্সফার–নবায়নের স্থায়ী সমাধান এখন সময়ের দাবি। অন্যথায় অদূর ভবিষ্যতে লাখ লাখ প্রবাসী অবৈধ হয়ে পড়বেন, যার প্রভাব পড়বে দেশের অর্থনীতির মূলভিত্তিতে।

মরুভূমির তপ্ত রোদে যারা ঘাম ঝরিয়ে পরিবারের সচ্ছলতা আনে, তাদের শ্রমের মূল্য কি কেবল কাগজে–কলমেই সীমাবদ্ধ থাকবে? নাকি বাস্তবেও তারা সম্মান ও নিরাপত্তা পাবেন—এটাই আজ সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।

Related posts

Leave a Comment