আয়ারল্যান্ডে প্রগতিশীল বামপন্থী সরকার গঠন এবং ক্ষমতার মসনদে বসার যে স্বপ্ন সিন ফেইন (Sinn Féin) দেখেছিল, তা কীভাবে উগ্র ডানপন্থীদের অভিবাসনবিরোধী প্রচারণার মুখে ধূলিসাৎ হয়ে গেল, তা নিয়ে বিস্ফোরক তথ্য প্রকাশ করেছেন দলটির এক সাবেক অভ্যন্তরীণ কর্মকর্তা। দলের নীতি ও প্রচার উপদেষ্টা শিভন ফেনটন (Siobhán Fenton) তাঁর সদ্য প্রকাশিত ‘আওয়ারসেলভস অ্যালোন: সিন ফেইন বিহাইন্ড ক্লোজড ডোরস’ (Ourselves Alone: Sinn Féin Behind Closed Doors) বইয়ে এই নেপথ্য কাহিনী বিস্তারিতভাবে তুলে ধরেছেন।
২০২৪ সালের মে মাসের এক ঘটনার মধ্য দিয়ে দলটির এই পতনের চিত্র প্রথম স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ফেনটন তখন ডাবলিনের একটি কর্মজীবী অধ্যুষিত এলাকার ফ্ল্যাট ব্লকে দলের হয়ে নির্বাচনী প্রচারণা চালাচ্ছিলেন। হঠাৎ উপর থেকে তাঁর ঘাড় ও কাঁধে শক্ত কিছু এসে আঘাত করে। তিনি লক্ষ্য করেন, উপর থেকে এক ব্যক্তি তাঁর দিকে কয়েন ছুঁড়ে মারছে এবং চিৎকার করে বলছে, "সিন ফেইন বিশ্বাসঘাতক! মেরি লু মোহাম্মদ! আয়ারল্যান্ড পূর্ণ হয়ে গেছে!" এই ঘটনাটিই ছিল দলটির জন্য এক বড় ধাক্কার পূর্বাভাস, যা পরবর্তীতে তাদের নিশ্চিত জয়ের পথকে পুরোপুরি বদলে দেয়।
ফেনটন জানান, উগ্র ডানপন্থীরা যে সিন ফেইনের দীর্ঘদিনের শক্ত ঘাঁটিগুলোতে গোপনে প্রভাব বিস্তার করে ফেলেছিল, তা দলটির নীতিনির্ধারকেরা সময়মতো টের পাননি। যখন তারা বিষয়টি বুঝতে পারেন, ততক্ষণে অনেক দেরি হয়ে গেছে। এই চরম ডানপন্থী প্রচারণার মুখে দলের শীর্ষ নেতৃত্ব এক ধরনের পক্ষাঘাতগ্রস্ত অবস্থায় পড়ে যান এবং পরিস্থিতি সামাল দিতে ব্যর্থ হন।
সিন ফেইনের মতো একটি সুশৃঙ্খল ও গোপনীয়তার জন্য পরিচিত দলের ভেতর থেকে এমন তথ্য প্রকাশ হওয়া বেশ নজিরবিহীন। ৩৪ বছর বয়সী ফেনটন অবশ্য প্রথাগত সিন ফেইন সমর্থকদের মতো ছিলেন না। তিনি বেলফাস্টের এক মধ্যবিত্ত পরিবারে বড় হয়েছেন, যারা সহিংসতা এড়িয়ে নিয়মতান্ত্রিক জাতীয়তাবাদের পক্ষে ছিল। অক্সফোর্ড থেকে ইংরেজি সাহিত্যে পড়াশোনা এবং কেমব্রিজে জেন্ডার-ভিত্তিক সহিংসতা নিয়ে গবেষণার পর তিনি লন্ডনে ‘দি ইন্ডিপেনডেন্ট’ পত্রিকায় সাংবাদিকতা করেন। পরবর্তীতে তিনি বিবিসি এবং দ্য গার্ডিয়ানসহ বিভিন্ন গণমাধ্যমে ফ্রিল্যান্সার হিসেবে কাজ করেন এবং গুড ফ্রাইডে চুক্তি নিয়ে একটি বইও লেখেন।
২০২০ সালের শুরুতে সিন ফেইন যখন ফেনটনকে ডাবলিনে কাজের প্রস্তাব দেয়, তখন দলটি জনপ্রিয়তার তুঙ্গে ছিল। সে বছরের সাধারণ নির্বাচনে তারা ২৪.৫ শতাংশ প্রথম পছন্দের ভোট পেয়ে শতাব্দীর প্রাচীন দুই দল ফিয়ানা ফেল (Fianna Fáil) ও ফিনে গেলকে (Fine Gael) পেছনে ফেলে দেয়। দলটির নতুন নেত্রী মেরি লু ম্যাকডোনাল্ড বিশেষ করে তরুণ ভোটারদের কাছে আবাসন সংকট সমাধানের এক নতুন আশা হিসেবে আবির্ভূত হন। তবে সে সময় পর্যাপ্ত প্রার্থী না থাকায় তারা সরকার গঠন করতে পারেনি এবং ফিয়ানা ফেল ও ফিনে গেল জোট সরকার গঠন করে।
২০২২ সালে উত্তর আয়ারল্যান্ডের স্টরমন্টে সিন ফেইন বৃহত্তম দল হিসেবে জয়ী হওয়ার পর মিশেল ও’নিল ফার্স্ট মিনিস্টার হন। এরপর লক্ষ্য ছিল ডাবলিনের লিনস্টার হাউসে মেরি লু ম্যাকডোনাল্ডকে প্রধানমন্ত্রী (তিশাক) হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা। বেলফাস্টের এক সহকর্মী তখন ফেনটনকে রসিকতা করে বলেছিলেন, "সব ঠিকঠাক রেখো, কোনো গড়বড় করো না।" দলটির জনপ্রিয়তার গ্রাফ তখন এত উঁচুতে ছিল যে তাদের দীর্ঘদিনের স্লোগান ‘তিওকফাই আর লা’ (আমাদের দিন আসবে) অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক মনে হচ্ছিল।
কিন্তু এরপরই শুরু হয় দলটির পতন। ২০২৩ সালের নভেম্বরে ডাবলিনের দাঙ্গার জন্য পুলিশকে দায়ী করে মেরি লু ম্যাকডোনাল্ড সমালোচনার মুখে পড়েন। এছাড়া ডাবলিনের বাড়ির গড় দাম ৩ লাখ ইউরোতে নামিয়ে আনার প্রস্তাব দিয়ে তিনি মধ্যবিত্ত সম্পত্তি মালিকদের শঙ্কিত করে তোলেন। তবে সবচেয়ে বড় আঘাতটি আসে অভিবাসন ইস্যু থেকে। আবাসন সংকট, জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি এবং বিপুল সংখ্যক শরণার্থী আগমনের সুযোগ নিয়ে উগ্র ডানপন্থীরা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সক্রিয় হয়ে ওঠে। কোভিড-১৯ বিধিনিষেধের কারণে তৃণমূলের সাথে সম্পর্ক দুর্বল হয়ে পড়ায় সিন ফেইন নেতৃত্ব সাধারণ মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে পড়া ক্ষোভ ও ষড়যন্ত্র তত্ত্বের গভীরতা বুঝতে ব্যর্থ হয়।
ফেনটন মনে করেন, দলটির উচিত ছিল স্মার্টফোনের স্ক্রিন থেকে মানুষকে বের করে এনে সরাসরি কঠিন আলোচনা করা। উগ্র ডানপন্থীদের বর্ণবাদী প্রচারণার বিপরীতে দাঁড়িয়ে তাদের স্পষ্ট করা উচিত ছিল যে, আবাসন সংকটের জন্য অভিবাসীদের বলির পাঁঠা বানানো ভুল সমাধান। কিন্তু তা না করে দলটি নীরবতা বজায় রাখায় ২০২৪ সালের স্থানীয় ও ইউরোপীয় নির্বাচনে তাদের ভরাডুবি ঘটে। সাধারণ নির্বাচনেও দলটি ভালো করতে পারেনি এবং ফিয়ানা ফেল ও ফিনে গেল জোট পুনরায় ক্ষমতায় ফিরে আসে।
নির্বাচনের পর ফেনটনের চুক্তির মেয়াদ আর নবায়ন করা হয়নি। বর্তমানে তিনি বেলফাস্টে ফিরে লেখক ও বিশ্লেষক হিসেবে কাজ করছেন এবং সিন ফেইনের সদস্যপদেও আর নেই। তাঁর মতে, অভিবাসন নিয়ে দলের ভেতরে এখনো চরম দ্বন্দ্ব রয়েছে এবং আগামী নির্বাচনের আগে দলটির নেতৃত্ব এই স্পর্শকাতর ইস্যুটি এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করতে পারে।

