কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুগে সন্তানদের শিক্ষা: গবেষক বাবার জরুরি পরামর্শ

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) দ্রুত বিকাশ ও বিস্তারের এই যুগে সন্তানদের ভবিষ্যৎ নিয়ে বিশ্বজুড়ে অভিভাবক ও শিক্ষাবিদদের মধ্যে উদ্বেগ বাড়ছে। দীর্ঘ ১৫ বছর ধরে কর্মক্ষেত্র ও সমাজে এআই-এর প্রভাব নিয়ে গবেষণা করছেন ড্যানিয়েল সাসকিন্ড। তিন সন্তানের এই জনক মনে করেন, এআই-এর যুগে সন্তানদের প্রস্তুত করতে প্রযুক্তি নিষিদ্ধ করা কোনো সমাধান নয়। বরং মৌলিক শিক্ষার ওপর জোর দেওয়া এবং শিক্ষাক্ষেত্রে এআই ব্যবহারের ক্ষেত্রে নতুন কৌশল অবলম্বন করা জরুরি।

নিজের এক ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকে সাসকিন্ড এআই-এর শক্তি ও সীমাবদ্ধতা উপলব্ধি করেন। শৈশবে তাঁর বাবার সঙ্গে একটি গল্প লেখার পরিকল্পনা করেছিলেন, যার নাম ছিল 'দ্য ডে নোবডি ওয়েন্ট টু ডিজনিল্যান্ড'। ব্যস্ততার কারণে গল্পটি আর লেখা হয়ে ওঠেনি। দীর্ঘ ৩০ বছর পর নিজের সন্তানদের সঙ্গে আড্ডার সময় তিনি চ্যাটজিপিটি-কে ডক্টর সিউসের শৈলীতে গল্পটি লিখতে বলেন। মাত্র কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে এআই একটি চমৎকার খসড়া তৈরি করে দেয়। যদিও সেখানে কিছু মার্কিন শব্দ (যেমন 'sneakers' বা 'cinnamon buns') এবং কিছু অসংগতি ছিল, তবুও এটি ছিল একটি দারুণ অভিজ্ঞতা।

আরেকটি ঘটনা ঘটেছিল তাঁর স্ত্রীর সঙ্গে, যিনি নিজে একজন পডকাস্ট ও তথ্যচিত্র নির্মাতা। সপরিবারে সাফোকে তাঁর বাবা-মায়ের বাড়ির দিকে যাওয়ার পথে এ১২ (A12) সড়কে গাড়িতে আটকে থাকা অবস্থায় তিন সন্তানকে নিয়ে যখন পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে উঠছিল, তখন তাঁরা 'হিস্ট্রিজ নট বোরিং' নামের একটি চমৎকার পডকাস্ট খুঁজে পান যা সবাই অলৌকিকভাবে উপভোগ করেছিল। ১৫ মিনিটের এই পডকাস্ট সিরিজটি দুই শিশুর কণ্ঠে রেকর্ড করা ছিল। পরে ওয়েবসাইটে গিয়ে তাঁরা জানতে পারেন যে, ওই delicacies বা শিশুদের কোনো বাস্তব অস্তিত্বই নেই; পুরো পডকাস্টটি ছিল এআই দ্বারা তৈরি। এই ঘটনাটি প্রযুক্তিটির উচ্চ গুণগত মান যেমন প্রমাণ করে, তেমনি মানুষের সৃজনশীল কাজের ভবিষ্যৎ নিয়ে এক ধরনের অস্বস্তিও তৈরি করে।

বর্তমানে শিক্ষক, অভিভাবক ও নিয়োগকর্তারা এআই-এর প্রভাব নিয়ে বিভ্রান্ত। অনেকেই শিক্ষার্থীদের এআই ব্যবহারে বাধা দিচ্ছেন বা একে 'প্রতারণা' হিসেবে দেখছেন। কিন্তু সাসকিন্ডের মতে, এই প্রযুক্তিকে নিষিদ্ধ করা হবে ভুল পদক্ষেপ। কারণ নতুন প্রজন্মকে এমন এক পৃথিবীর জন্য প্রস্তুত করা উচিত যেখানে তারা আসলেই বাস করবে, আমাদের পুরোনো শৈশবের পৃথিবীতে নয়। ২০১৩ সালে যুক্তরাজ্যের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরন এবং শিক্ষামন্ত্রী মাইকেল গোভ প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরে কোডিং শেখানোর যে বৈপ্লবিক উদ্যোগ নিয়েছিলেন, তা ছিল মূলত "ভবিষ্যতের জন্য সুরক্ষিত দক্ষতা" (future-proof skills) ধারণার ওপর ভিত্তি করে। তবে বর্তমান বাস্তবতা প্রমাণ করছে যে, ভবিষ্যৎ প্রযুক্তির গতিপ্রকৃতি আগে থেকে নিখুঁতভাবে অনুমান করা অসম্ভব।

এই uncertainty বা অনিশ্চয়তার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে সাসকিন্ড দুটি প্রধান পদক্ষেপের কথা বলেছেন। প্রথমত, মৌলিক শিক্ষায় ফিরে যাওয়া। ২০০৯ সাল থেকে ওইসিডি-র 'পিসা' (Pisa) জরিপ অনুযায়ী বিশ্বজুড়ে তরুণদের মধ্যে পঠন ও গাণিতিক দক্ষতা (literacy and numeracy) হ্রাস পাচ্ছে। কম্পিউটার বিজ্ঞানী জেফরি হিন্টন এআই-কে "ইডিয়ট স্যাভ্যান্ট" (idiot savants) বা বোকা পণ্ডিত হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। এআই প্রায়ই সাধারণ বিষয়ে ভুল করে এবং আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে কাল্পনিক তথ্য দেয় (হ্যালুসিনেশন)। তাই এআই কখন সঠিক বলছে আর কখন ভুল, তা বুঝতে হলে মানুষের নিজস্ব মৌলিক দক্ষতা অত্যন্ত তীক্ষ্ণ হওয়া প্রয়োজন। লেখক নিজে তাঁর সন্তানদের পড়াশোনায় একঘেয়েমি কাটাতে চ্যাটজিপিটি দিয়ে গুণের নামতার গেম এবং তাদের পছন্দের বিষয় (যেমন এইচএমএস বেলফাস্ট বা ফুটবলার বুকায়ো সাকা) নিয়ে কাস্টম গল্প তৈরি করেছেন। একইভাবে দ্য গার্ডিয়ানের সম্পাদকীয় উদ্ভাবন প্রধান ক্রিস মরান ও তাঁর মেয়ে এআই-এর সাহায্যে 'প্লটলাইনস' (PlotLines) নামের একটি অ্যাপ তৈরি করেন, যা ১৮৯০ সালের মানচিত্রে বিখ্যাত ড্রাকুলা উপন্যাসের দৃশ্যগুলো ফুটিয়ে তোলে।

দ্বিতীয়ত, সাসকিন্ড একটি বৈপ্লবিক শিক্ষাপদ্ধতির প্রস্তাব করেছেন, যার নাম "উভয় পদ্ধতিতেই শিক্ষা ও পরীক্ষা" (teach both, test both)। এই ধারণাটি তিনি নিয়েছেন ১৯৮২ সালের ঐতিহাসিক 'ককক্রফট রিপোর্ট' থেকে। ১৯৭০-এর দশকে (1970s) যুক্তরাজ্যের স্কুলগুলোতে গণিত শিক্ষার মান ভেঙে পড়ছে বলে মনে হয়েছিল এবং সংখ্যাজ্ঞান বা গণিত দক্ষতা আশঙ্কাজনকভাবে কম ছিল। গণিত শিক্ষায় দীর্ঘদিনের আগ্রহ থাকা ককক্রফটকে সরকার বিষয়টি খতিয়ে দেখার অনুরোধ জানায়। এর ফলশ্রুতিতে ১৯৮২ সালে এই রিপোর্ট প্রকাশিত হয়, যা ছিল বিশাল ও পুঙ্খানুপুঙ্খ। ককক্রফট বাস্তববাদী ছিলেন এবং তিনি আশা করেছিলেন যে ১৯৮৫ সালের (1985) মধ্যে সকল পরীক্ষার্থীর কাছে ক্যালকুলেটর থাকবে। তাঁর প্রস্তাবটি ছিল বৈপ্লবিক: গণিত শিক্ষাকে দুই ভাগে ভাগ করে, সময়ের কিছু অংশ ক্যালকুলেটর ব্যবহার শেখানো এবং বাকি অংশ ক্যালকুলেটর ছাড়া মানিয়ে নেওয়ার দক্ষতা অর্জনে ব্যয় করার কথা বলা হয়েছিল। এআই-এর ক্ষেত্রেও ইতিহাস থেকে শুরু করে ইংরেজি সাহিত্য—সব বিষয়েই এই নীতি প্রয়োগ করা উচিত। শিক্ষার্থীদের এক অংশে এআই ব্যবহার করে কাজ করা শেখাতে হবে, এবং অন্য অংশে এআই ছাড়া পরীক্ষা দিতে হবে।

অনেকেই এআই-এর ক্ষতিকর দিককে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ক্ষতিকর প্রভাবের সঙ্গে গুলিয়ে ফেলেন। কিন্তু সাসকিন্ড মনে করেন, সোশ্যাল মিডিয়া মানুষকে বাস্তব জগৎ থেকে দূরে সরিয়ে নিলেও এআই-এর সঠিক ব্যবহার জীবনকে সহজ করে তুলতে পারে। যেমন, এআই এখন অতি সস্তায় প্রতিটি শিক্ষার্থীর জন্য ব্যক্তিগত শিক্ষকের (personal tutor) মতো মানসম্মত শিক্ষা দিতে সক্ষম। ২০২৫ সালের এপ্রিলে 'দ্য নিউ ইয়র্কার'-এ প্রকাশিত এক শিক্ষার্থীর মন্তব্য ছিল, "কেউ কখনও আমার চিন্তাভাবনা ও প্রশ্নের প্রতি এমন নিখাদ মনোযোগ দেয়নি।" লেখক নিজেও এটি দিয়ে স্নাতকোত্তর স্তরের অর্থনীতিতে 'র‌্যামসে গ্রোথ অবদান' বা 'র‌্যামসে গ্রোথ модель' (Ramsey growth model) সমাধানের নির্দেশিকা তৈরি করেছেন।

নতুন প্রজন্মের ক্যারিয়ারের বিষয়ে সাসকিন্ডের পরামর্শ হলো—চাকরির পদের চেয়ে যে সমস্যাটি সমাধান করতে চান, তার প্রতি মনোযোগ দিন। কারণ এআই-এর কারণে কাজের ধরন বদলে গেলেও সমস্যাগুলো হারিয়ে যাবে না। নিজের ক্যারিয়ারের শুরুতে থাকলে লেখক কোনো দ্বিধা ছাড়াই এআই এবং বিজ্ঞানের দিকে ধাবিত হতেন—এটি অটোমেশন থেকে সুরক্ষিত বলে নয়, বরং আগামী বছরগুলোতে এখানেই সবচেয়ে বেশি রোমাঞ্চকর ঘটনা ঘটবে। ২০ শতকে (20th century) যেখানে সেরা ধারণাগুলো তৈরি হতো, ২১ শতকে (21st century) এসে পরিস্থিতি বদলে যাচ্ছে। যেমন, ২০১৭ সালে স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি এআই চর্মরোগ বিশেষজ্ঞদের মতোই নিখুঁতভাবে ত্বকের ক্যানসার শনাক্ত করতে পেরেছিল। অথচ এই গবেষণার সহ-লেখক সেবাস্টিয়ান থ্রুন কোনো চিকিৎসক ছিলেন না, বরং তিনি ছিলেন চালকবিহীন গাড়ি নির্মাতা এক কম্পিউটার বিজ্ঞানী। এছাড়া ২০২৪ সালের শেষের দিকে রসায়নে নোবেলজয়ী ডিপমাইন্ডের আলফাফোল্ড২ (AlphaFold2) প্রোটিন ফোল্ডিং সমস্যার সমাধান করে বিজ্ঞানে এআই-এর অসীম সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দিয়েছে। সাসকিন্ডের মতে, এআই ব্যবহারের একমাত্র সীমাবদ্ধতা হলো আমাদের কল্পনাশক্তির অভাব। কবি লুইস গ্লুকের ভাষায়, "আমরা শৈশবে একবারই পৃথিবীর দিকে তাকাই, বাকিটা কেবল স্মৃতি।" নতুন প্রজন্মের মুক্ত মন ও রোমাঞ্চপ্রিয়তাই পারে এআই-এর মতো অসাধারণ প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করতে。

শিরোনাম :
ইলদিজ যেন কভারাতসখেলিয়া, ভ্লাহোভিচ নিজেই নিজের সমস্যা তৈরি করেন: স্পালেত্তি ২০২৬ সালে টিজে ম্যাক্সের কয়েকটি শাখা বন্ধ হলেও খুলছে আরও অনেক নতুন স্টোর ব্রাজিলের নির্বাচনে বলসোনারোর জয় ট্রাম্পের আধিপত্যের নতুন ধাপ হতে পারে ব্রাজিলের সাধারণ নির্বাচনে ভোটগ্রহণ শেষ, মুখোমুখি লড়াইয়ে লুলা ও বলসোনারো নিউজিল্যান্ড সিরিজের জন্য ভাবনায় মুকেশ কুমার ও আকাশ দীপ এফবিআই ওয়েবসাইট হ্যাক: জর্ডানে শাইনিহান্টার্সের সন্দেহভাজন সদস্য আটক গ্রিসের সঙ্গে কয়েক দশকের আলোচনা শেষে বুলগেরিয়ায় ফিরল জার স্যামুয়েলের অবশেষ কুমিল্লার সিএনজি ফিলিং স্টেশনে অগ্নিকাণ্ড, আহত ফায়ার সার্ভিস কর্মী ৪৬ কোটি ৭০ লাখ ডলারে পৌঁছাল পাওয়ারবল জ্যাকপট, সোমবার পরবর্তী ড্র কোনো প্রমাণ ছাড়াই ৩০ বছরের জেল, তুর্কি কারাগারে বন্দি ফিনিশ নাবিকের মুক্তির লড়াই ইলদিজ যেন কভারাতসখেলিয়া, ভ্লাহোভিচ নিজেই নিজের সমস্যা তৈরি করেন: স্পালেত্তি ২০২৬ সালে টিজে ম্যাক্সের কয়েকটি শাখা বন্ধ হলেও খুলছে আরও অনেক নতুন স্টোর ব্রাজিলের নির্বাচনে বলসোনারোর জয় ট্রাম্পের আধিপত্যের নতুন ধাপ হতে পারে ব্রাজিলের সাধারণ নির্বাচনে ভোটগ্রহণ শেষ, মুখোমুখি লড়াইয়ে লুলা ও বলসোনারো নিউজিল্যান্ড সিরিজের জন্য ভাবনায় মুকেশ কুমার ও আকাশ দীপ এফবিআই ওয়েবসাইট হ্যাক: জর্ডানে শাইনিহান্টার্সের সন্দেহভাজন সদস্য আটক গ্রিসের সঙ্গে কয়েক দশকের আলোচনা শেষে বুলগেরিয়ায় ফিরল জার স্যামুয়েলের অবশেষ কুমিল্লার সিএনজি ফিলিং স্টেশনে অগ্নিকাণ্ড, আহত ফায়ার সার্ভিস কর্মী ৪৬ কোটি ৭০ লাখ ডলারে পৌঁছাল পাওয়ারবল জ্যাকপট, সোমবার পরবর্তী ড্র কোনো প্রমাণ ছাড়াই ৩০ বছরের জেল, তুর্কি কারাগারে বন্দি ফিনিশ নাবিকের মুক্তির লড়াই