২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর যখন হাজার হাজার জরুরি উদ্ধারকর্মী ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারের ধ্বংসস্তূপের দিকে ছুটে যাচ্ছিলেন, তখন মার্কিন সামরিক বাহিনীও দেশের আকাশ সুরক্ষায় দ্রুত মাঠে নেমেছিল। সেই ভয়াবহ দিনটির স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে মার্কিন জয়েন্ট চিফস অব স্টাফের চেয়ারম্যান জেনারেল ড্যান কেইন জানিয়েছেন, সে সময় কোনো সন্দেহ ছিল না যে দেশ একটি যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েছে।
হামলার দিন জেনারেল কেইন মেরিল্যান্ডের অ্যান্ড্রুজ এয়ার ফোর্স বেসে ১২১তম ফাইটার স্কোয়াড্রনের অস্ত্র ও যুদ্ধকৌশল বিভাগের প্রধান হিসেবে কর্মরত ছিলেন। সিবিএস নিউজের উপস্থাপক নোরা ও'ডোনেলকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, সেদিন সকালে তিনি কেবলই একটি বৈঠকে যোগ দিয়েছিলেন। এমন সময় এক তরুণ কর্মী হন্তদন্ত হয়ে কক্ষে প্রবেশ করে জানান যে ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারের নর্থ টাওয়ারে একটি বিমান আঘাত হেনেছে। এর কিছুক্ষণের মধ্যেই, সকাল ৯টা ৩ মিনিটে তারা সরাসরি টেলিভিশনের পর্দায় সাউথ টাওয়ারে দ্বিতীয় বিমানটির আছড়ে পড়ার দৃশ্য দেখতে পান।
জেনারেল কেইন সেই মুহূর্তের অনুভূতি প্রকাশ করে বলেন, নিউজ হেলিকপ্টারের ক্যামেরায় জ্বলন্ত টাওয়ারের দৃশ্য দেখার সময় মনের ভেতর কী চলছিল, তা আজও তার স্পষ্ট মনে আছে। দ্বিতীয় বিমানটি যখন আঘাত হানল, তখনই তিনি বুঝতে পেরেছিলেন যে দেশ আক্রান্ত হয়েছে এবং তারা তাৎক্ষণিকভাবে ব্যবস্থা নিতে শুরু করেন।
তৎকালীন পরিস্থিতি অনুযায়ী কেইন ঘাঁটির আকাশ থেকে আকাশে নিক্ষেপণযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্রসহ সব ধরনের যুদ্ধাস্ত্র প্রস্তুত করার নির্দেশ দেন। দূর দিগন্তে তখন পেন্টাগন থেকে ধোঁয়া উড়তে দেখা যাচ্ছিল। এমন সময় হোয়াইট হাউস থেকে একটি ফোন আসে, যেখানে ওয়াশিংটন ডিসি রক্ষায় তাদের স্কোয়াড্রনকে অবিলম্বে আকাশে ওড়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। কেইন জানান, সে সময় তাদের ওপর হামলাকারী বিমান ভূপাতিত করার ক্ষেত্রে অত্যন্ত শিথিল নিয়ম বা 'ভেরি লিবারেল রুলস অব এনগেজমেন্ট' দেওয়া হয়েছিল।
তাদেরকে মূলত ইউনাইটেড ফ্লাইট ৯৩ বিমানটিকে বাধা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল, যা ছিনতাইকারীরা ওয়াশিংটনের কোনো একটি সরকারি ভবনে আঘাত হানার জন্য নিয়ে যাচ্ছিল। তবে বিমানটি শেষ পর্যন্ত পেনসিলভানিয়ার একটি মাঠে বিধ্বস্ত হয়। কেইন স্মরণ করেন, উইং কমান্ডার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ডেভ হোয়ার্লি তাকে বলেছিলেন, 'ড্যান, তোমাকে আকাশে গিয়ে কী করতে হবে আমি জানি না, তবে আমি বিশ্বাস করি তুমি সঠিক সিদ্ধান্তই নেবে।'
পরিস্থিতি এতই জরুরি ছিল যে কিছু যুদ্ধবিমান ক্ষেপণাস্ত্র লোড করার সময়টুকুও পায়নি। এমন দুটি বিমান নিয়ে আকাশে উড়েছিলেন লেফটেন্যান্ট কর্নেল মার্ক স্যাসেভিল এবং উইংম্যান হিদার পেনি। ২০২১ সালে তারা সিবিএস নিউজকে জানিয়েছিলেন, কোনো অস্ত্র না থাকায় তারা সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন নিজেদের বিমান দিয়েই ছিনতাই হওয়া যাত্রীবাহী বিমানটিকে ধাক্কা দেবেন, যা নিশ্চিতভাবেই তাদের মৃত্যুর কারণ হতো। হিদার পেনি বলেন, সামরিক বাহিনীতে আত্মঘাতী মিশনে পাঠানোর নিয়ম নেই, কিন্তু সেদিন সকালে এছাড়া কোনো উপায় ছিল না।
তবে কেইনের যুদ্ধবিমানটি ক্ষেপণাস্ত্র দ্বারা সজ্জিত ছিল। ওয়াশিংটন ডিসির আকাশসীমায় সমস্ত বেসামরিক বিমান চলাচল বন্ধের নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল এবং সতর্ক করা হয়েছিল যে নির্দেশ অমান্যকারী যেকোনো বিমানকে গুলি করে নামানো হবে। কেইন বলেন, 'আমি ভাবছিলাম, গুলিটা কিন্তু আমাকেই চালাতে হবে। তখন মনে মনে শুধু সৃষ্টিকর্তার কাছে প্রার্থনা করছিলাম, হে ঈশ্বর, আমার হাত দিয়ে যেন কোনো ভুল না হয়ে যায়। আমি শুধু শান্ত থেকে দেশের সুরক্ষায় নিজের দায়িত্বটুকু পালন করতে চেয়েছিলাম।'
তবে কেইনকে শেষ পর্যন্ত গুলি চালাতে হয়নি। ইউনাইটেড ফ্লাইট ৯৩-এর বীর যাত্রীরা ছিনতাইকারীদের প্রতিরোধ করেন এবং বিমানটি লক্ষ্যবস্তুতে পৌঁছানোর আগেই ফাঁকা মাঠে বিধ্বস্ত হয়। কেইন সেই যাত্রীদের সাহসিকতার প্রশংসা করে বলেন, 'আমরা দেশের সুরক্ষায় শপথ নিয়েছি। কিন্তু সেই অন্ধকার মুহূর্তে বিমানের সাধারণ যাত্রীরাই প্রথম প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিলেন।'
হামলার ২৫ বছর পরও সেই দিনের ঘটনা কেইনকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে। তিনি বলেন, '১১ সেপ্টেম্বরের আগে আমি হয়তো ভাবতাম ফাইটার জেট চালানো খুব দারুণ একটি কাজ। কিন্তু ওই দিনের পর থেকে দেশের সেবা করার প্রকৃত অর্থ কী, তা আমি বুঝতে পেরেছি। সেদিন মার্কিন জনগণ সাহসিকতা ও দেশপ্রেমের যে অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিল, তা আজও আমার কাছে এক বড় অনুপ্রেরণা।'

