যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল প্রশাসনকে ঢেলে সাজানোর নামে ইলন মাস্কের নেতৃত্বাধীন ‘ডিপার্টমেন্ট অব গভর্নমেন্ট এফিসিয়েন্সি’ (ডোজ)-এর তরুণ প্রযুক্তিবিদরা ওয়াশিংটনের বিভিন্ন সংস্থায় যে তাণ্ডব চালিয়েছিলেন, তার এক চাঞ্চল্যকর চিত্র উঠে এসেছে। বিশেষ করে অভ্যন্তরীণ রাজস্ব বিভাগে (আইআরএস) তাদের আগ্রাসী হস্তক্ষেপ এবং লাখ লাখ অনথিভুক্ত অভিবাসীর অত্যন্ত সংবেদনশীল করদাতার তথ্য হাতিয়ে নেওয়ার চেষ্টা কীভাবে একজন সাহসী কর্মকর্তার কারণে সাময়িকভাবে বাধাগ্রস্ত হয়েছিল, তা সম্প্রতি প্রকাশিত একটি বইয়ের চুম্বক অংশে উন্মোচিত হয়েছে।
২০২৫ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি শনিবার গভীর রাতে যুক্তরাষ্ট্রের পুরো ফেডারেল কর্মীদের কাছে একটি আকস্মিক ইমেইল পাঠানো হয়। ‘গত সপ্তাহে আপনি কী করেছেন?’ বিষয়ের সেই ইমেইলে কর্মীদের কাছ থেকে তাদের কাজের পাঁচটি প্রধান সাফল্য জানতে চাওয়া হয় এবং সোমবার মধ্যরাতের মধ্যে জবাব দেওয়ার সময়সীমা বেঁধে দেওয়া হয়। এই ইমেইলটি যখন আইআরএস-এর প্রধান প্রাইভেসি অফিসার ৫২ বছর বয়সী ক্যাথলিন ওয়াল্টার্সের নজরে আসে, তখন তিনি ব্যক্তিগত জীবনে স্তনের টিউমার সংক্রান্ত ক্যানসারের আশঙ্কায় চরম উদ্বেগের মধ্য দিয়ে যাচ্ছিলেন। কিন্তু পেশাগতভাবে তার দায়িত্ব ছিল আরও বড়—৬৫০ জন কর্মীর একটি দল পরিচালনা করে আইআরএস-এর এক লাখ কর্মীর হাত থেকে ২৬ কোটি ৬০ লাখ করদাতার গোপন তথ্য সুরক্ষিত রাখা।
এর মাত্র নয় দিন আগে, ১৩ ফেব্রুয়ারি, গ্যাভিন ক্লিগার নামের এক তরুণ ‘ডোজ’ প্রতিনিধি কোনো পূর্ব নোটিশ ছাড়াই আইআরএস ভবনে প্রবেশ করতে চান। আইআরএস-এর মানবসম্পদ বিভাগের প্রধান ট্রেসি ডিমার্টিনি তাকে নিজের অফিসে নিয়ে আসেন। কালো হুডি ও স্নিকার্স পরা গ্যাভিনের আচরণ ছিল চরম উদ্ধত। ক্যালিফোর্নিয়াতে বড় হওয়া এবং ইউসি বার্কলে থেকে ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং ও কম্পিউটার সায়েন্সে স্নাতক করা এই তরুণ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ‘এক্স’-এ শ্বেতাঙ্গ জাতীয়তাবাদীদের পোস্ট শেয়ার করার জন্য পরিচিত ছিলেন। গ্যাভিনকে ডেটা প্রাইভেসি আইন সম্পর্কে ব্রিফ করার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল ক্যাথলিনের কৃষ্ণাঙ্গ সহকারী ফিলিস গ্রিমসকে। কিন্তু গ্যাভিন তার সাথে হ্যান্ডশেক করতে অস্বীকৃতি জানান এবং ব্রিফিংয়ের সময় ফোনে ব্যস্ত থেকে চরম অপেশাদারিত্ব প্রদর্শন করেন। আইআরএস-এ পা রেখেই তিনি করদাতাদের মূল তথ্যভাণ্ডারে প্রবেশাধিকার, একটি সরকারি ফোন, চারটি ল্যাপটপ এবং আইআরএস-এর ভারপ্রাপ্ত কমিশনার ডগ ও’ডোনেলের সাথে বৈঠকের দাবি জানান。
ডোজ-এর এই তরুণদের কাছে ইলন মাস্ক ছিলেন ‘নবী’র মতো, যার প্রতিটি নির্দেশ তারা অন্ধভাবে পালন করতেন। তাদের মূল লক্ষ্য ছিল সরকারি সংস্থাগুলোতে বিশৃঙ্খলা তৈরি করে গণহারে কর্মী ছাঁটাই করা। গ্যাভিন ক্লিগার আইআরএস-এ প্রবেশ করেই ৬,৭০০ শিক্ষানবিস কর্মীকে পারফরম্যান্সের মিথ্যা অজুহাতে ছাঁটাই করার দাবি জানান। মানবসম্পদ প্রধান ট্রেসি ডিমার্টিনি এই মিথ্যা চিঠিতে স্বাক্ষর করতে অস্বীকৃতি জানালে তাকে চাকরি হারাতে হয়। এর আগে ভারপ্রাপ্ত কমিশনার ডগ ও’ডোনেলও এই অনৈতিক আদেশে রাজি না হওয়ায় তাকে অবসরে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। তাদের জায়গায় মেলানি ক্রাউসকে নতুন ভারপ্রাপ্ত কমিশনার হিসেবে বসানো হয়, যিনি ডোজ-এর আজ্ঞাবহ হিসেবে কাজ করতে প্রস্তুত ছিলেন।
২৮ ফেব্রুয়ারি শুক্রবার রাতে ক্যাথলিনের কাছে আরেকটি চাঞ্চল্যকর খবর আসে। আইআরএস-এর আইনি বিভাগ জানায়, মেলানি ক্রাউসের নির্দেশে হোমল্যান্ড সিকিউরিটি বিভাগ (ডিএইচএস) প্রায় ৭ লাখ অনথিভুক্ত অভিবাসীর ঠিকানা চেয়ে পাঠিয়েছে, যা সামাজিক নিরাপত্তা নম্বর (এসএসএন) না থাকায় ‘আইটিআইএন’ (ইন্ডিভিজুয়াল ট্যাক্সপেয়ার আইডেন্টিফিকেশন নম্বর) ব্যবহার করে নিয়মিত কর পরিশোধকারীদের থেকে নেওয়া। ক্যাথলিন বুঝতে পারেন, আইআরএস-এর এই সংবেদনশীল তথ্য অবৈধভাবে হাতিয়ে নিতেই শুক্রবার রাতে এই চক্রান্ত করা হয়েছে। তিনি মেলানিকে সরাসরি ফোন করে এই পদক্ষেপের তীব্র বিরোধিতা করেন এবং জানান যে এটি সম্পূর্ণ বেআইনি।
সোমবার ৩ মার্চ গ্যাভিন ক্লিগার আইআরএস কর্মকর্তাদের এক বৈঠকে দম্ভের সাথে বলেন, “আইআরএস-এর সবচেয়ে বড় শক্তি হলো এর ডেটা।” ক্যাথলিন যখন এই তথ্যের অপব্যবহারের বিরুদ্ধে ঢাল হয়ে দাঁড়ান, তখন গ্যাভিন তাকে ‘দ্য ব্লকার’ বা অগ্রগতির প্রতিবন্ধক হিসেবে চিহ্নিত করে চাকরিচ্যুত করার চেষ্টা করেন। এরপর ক্যাথলিন ডিএইচএস-এর ‘আইসিই ইনোভেশন ল্যাব’-এর সাথে একটি জুম মিটিংয়ের আয়োজন করেন। সেখানে জানা যায়, তারা কেবল ৭ লাখ নয়, বরং কর প্রদানকারী প্রায় ৭০ লাখ অনথিভুক্ত অভিবাসীর বর্তমান ঠিকানা চায়, যাতে তাদের সহজে আটক করে ডিপোর্ট করা যায়। এই ভয়াবহ পরিকল্পনা শুনে আইআরএস-এর প্রাইভেসি আইনজীবী জুলি শোয়ার্টজ মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন এবং কাজ করতে অস্বীকৃতি জানান।
এই অনৈতিক চাপের মুখে ক্যাথলিন ওয়াল্টার্স তার ২০ বছরের চাকরিজীবন পূর্ণ হওয়ার মাত্র কয়েক সপ্তাহ আগে পদত্যাগপত্র জমা দেন। এর ফলে তিনি আজীবন অবসরকালীন সুবিধা থেকে বঞ্চিত হন, তবুও নিজের নীতি বিসর্জন দেননি। তার পদত্যাগের পরপরই মেলানি ক্রাউসও পদত্যাগ করেন এবং গণমাধ্যমে নিজেকে নীতিবান হিসেবে জাহির করার চেষ্টা করেন। কিন্তু ততদিনে অনথিভুক্ত অভিবাসীদের ওপর রাতারাতি অভিযান শুরু হয়ে যায়। টেক্সাসের অস্টিনে আন্তোনিও মার্কেজের মতো আবাসন পরিচালকদের অ্যাপার্টমেন্টে মাঝরাতে আইসিই এজেন্টরা হানা দিতে শুরু করে।
অবশেষে ২০২৬ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি ওয়াশিংটন পোস্ট এক প্রতিবেদনে প্রকাশ করে যে, আইআরএস গোপনে ৪৭,০০০ অনথিভুক্ত কর্মীর কর সংক্রান্ত তথ্য হোমল্যান্ড সিকিউরিটির কাছে হস্তান্তর করেছে। পরবর্তীতে ফেডারেল আদালতে শুনানির সময় আইআরএস আইনজীবীরা স্বীকার করেন যে তারা আদালতের কাছে মিথ্যা বলেছিলেন। বিচারক তার রায়ে জানান, আইআরএস অন্তত ৪২,৬৯৫ বার ইন্টারনাল রেভিনিউ কোড লঙ্ঘন করে করদাতাদের ঠিকানা আইসিই-র কাছে ফাঁস করেছে। মাইকেল লুইসের সদ্য প্রকাশিত বই ‘ব্লকার্স: রেবেল্স ইন দ্য ডিপ স্টেট’ থেকে এই রোমাঞ্চকর ও সত্য ঘটনাটি সংকলিত হয়েছে।

