আগামী ৩ নভেম্বরের মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনকে সামনে রেখে যুক্তরাষ্ট্রের সাধারণ মানুষের প্রধান দুশ্চিন্তা যখন তাদের পকেটের টান ও জীবনযাত্রার ব্যয়, ঠিক সেই মুহূর্তে ভিন্ন আলোচনার জন্ম দিচ্ছেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। সম্প্রতি আলাস্কার ওয়াসিলায় এক নির্বাচনী জনসভায় ডান হাত দিয়ে কাটার ভঙ্গি করে ট্রাম্প বলেন, "আমরা আমাদের সন্তানদের ওপর কোনো অস্ত্র চালাতে দেব না। এটাকে বলা হয় অঙ্গচ্ছেদ (মিউটিলাইজেশন)।" জেন্ডার পরিবর্তনের জন্য অস্ত্রোপচারের বিষয়টিকে ইঙ্গিত করে দেওয়া ট্রাম্পের এই মন্তব্য মূলত তার শক্ত রাজনৈতিক ভিত্তি ‘মেগা’ (এমএজিএ) সমর্থকদের চাঙ্গা করার একটি চেনা কৌশল। এরপর তিনি নারী খেলাধুলায় ট্রান্সজেন্ডার অ্যাথলেটদের অংশগ্রহণের সমালোচনা করে একাধিক গল্প শোনান এবং প্রশ্ন তোলেন, নারী খেলাধুলা থেকে পুরুষদের দূরে রাখার জন্য লড়াই করতে হবে—এমন কথা কে ভেবেছিল।
মধ্যবর্তী নির্বাচনের এই শেষ ধাপে এসে মূল্যস্ফীতি এবং অর্থনৈতিক সংকট যখন ভোটারদের মূল আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে, তখন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প প্রতিদিনের নির্বাচনী সফরে সামাজিক ও সামাজিকভাবে বিভাজন সৃষ্টিকারী বিতর্কিত বিষয়গুলোর ওপরই জোর দিচ্ছেন। অভিবাসীদের নিয়ে ভয় ছড়ানো, ইসলামোফোবিয়া থেকে শুরু করে সমকামী ও ট্রান্সজেন্ডার অধিকার সংক্রান্ত বিষয়গুলো নিয়ে তিনি জোরালো বক্তব্য দিচ্ছেন। মূলত রিপাবলিকান অধ্যুষিত রাজ্যগুলোর নিজ সমর্থক পরিবেষ্টিত এলাকায় এই প্রচার চালানো হচ্ছে নতুন ভোটার টানার উদ্দেশ্যে নয়, বরং বিগত তিনটি প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ট্রাম্পকে ভোট দেওয়া যেসব ভোটার সচরাচর কম ভোট দেন, তাদের কেন্দ্রমুখী করাই এই কৌশলের প্রধান লক্ষ্য।
জর্জ ওয়াশিংটন ইউনিভার্সিটির পলিটিক্যাল ম্যানেজমেন্ট প্রোগ্রামের পরিচালক টড বেল্ট এই কৌশল ব্যাখ্যা করে বলেন, ভোটাররা ভেবেছিলেন ট্রাম্প অর্থনীতির সমাধান করবেন, কিন্তু তিনি তা পারেননি। তাই প্রধান ইস্যুতে ব্যর্থ হয়ে তিনি অন্য ইস্যুতে মোড় ঘোরাচ্ছেন। ট্রাম্প ও রিপাবলিকানরা এই নির্বাচনকে প্রেসিডেন্টের কর্মক্ষমতার মূল্যায়নের বদলে ডেমোক্র্যাটদের বিরুদ্ধে এক প্রকার বেছে নেওয়ার নির্বাচনে রূপ দিতে চান, যাতে ডেমোক্র্যাটিক প্রার্থীদের পরিচয় ও অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন তোলা যায়। একই সঙ্গে জনসভায় পুরনো জনপ্রিয় সামাজিক ইস্যুগুলো তুলে ধরে ট্রাম্প তার সমর্থক গোষ্ঠীকে জাগ্রত করতে চাইছেন।
ট্রাম্প যখন সামাজিক বিতর্কে নজর দিচ্ছেন, তখন ইরানের সাথে মার্কিন যুদ্ধের ফলে তেলের বাজারে অস্থিরতা এবং উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে অর্থনৈতিক অবস্থা নিয়ে আমেরিকানদের আশ্বস্ত করতে হিমশিম খাচ্ছেন তিনি। গত সপ্তাহের ওয়াশিংটন পোস্ট-এবিসি নিউজ-আইপসোস জরিপ অনুযায়ী, ৭৫ শতাংশ আমেরিকানই দেশের অর্থনীতিকে বাজে অবস্থায় রয়েছে বলে মনে করেন। এছাড়া অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস-এনওআরসি সেন্টার ফর পাবলিক অ্যাফেয়ার্স রিসার্চের জরিপ অনুযায়ী, ৬৫ শতাংশ উত্তরদাতা উচ্চ ব্যয়ের জন্য ট্রাম্পের নীতিকেই দায়ী করেছেন এবং ৭৩ শতাংশ মানুষ ট্রাম্পের অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনার সমালোচনা করেছেন।
নির্বাচনী প্রচারে অর্থনীতির কথা ট্রাম্প একেবারে এড়িয়ে যাচ্ছেন না, তবে জীবনযাত্রার ব্যয়ের উদ্বেগকে সমাধান করার পরিবর্তে তিনি 'সাশ্রয়' শব্দটিকে ডেমোক্র্যাটদের সৃষ্টি বলে উপহাস করছেন। একই সাথে মূল্যস্ফীতি কমেছে বলে মিথ্যা দাবি করছেন এবং এই অর্থনীতিকে আমেরিকার ইতিহাসের সেরা অর্থনীতি বলে আখ্যা দিচ্ছেন। তবে ডেমোক্র্যাটরা প্রতিনিধি পরিষদের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার দৌড়ে এগিয়ে থাকায় এবং একাধিক নিশ্চিত রিপাবলিকান রাজ্যে সিনেটের লড়াই হাড্ডাহাড্ডি হওয়ায় রিপাবলিকানরা রূপান্তরকামী বা ট্রান্সজেন্ডারবিরোধী মন্তব্যকে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে। ট্র্যাকিং ফার্ম অ্যাডইমপ্যাক্ট জানায়, ১ আগস্ট থেকে রিপাবলিকান দল ও তাদের সমর্থক গোষ্ঠীগুলো ট্রান্সজেন্ডার ইস্যুকে কেন্দ্র করে ২০০টি বিজ্ঞাপনে ১০ কোটি ডলারের বেশি খরচ করেছে।
বিভিন্ন রাজ্যের জনসভায় ট্রাম্পের আক্রমণ ছিল বহুমুখী। আলাস্কার সভায় মিনেসোটার সোমালি অভিবাসীদের বিরুদ্ধে বিষোদগার করে ট্রাম্প দাবি করেন, তারা রাজ্যটিকে ধ্বংস ও লুট করেছে। জর্জিয়ার ডালটনে তিনি সেকেন্ড অ্যামেন্ডমেন্টের প্রসঙ্গ তুলে ধরে ডেমোক্র্যাটিক সিনেটর জন ওসফ সম্পর্কে বলেন, তিনি অস্ত্র কেড়ে নেবেন। ওহিওর ইয়ংসটাউনে তিনি মিশিগানের ডেমোক্র্যাটিক সিনেট প্রার্থী আব্দুল এল-সায়েদকে 'জিহাদি' বলে অভিহিত করেন, বামপন্থীদের বিরুদ্ধে ক্রিস্টোফার কলাম্বাস ডে মুছে ফেলার চেষ্টার অভিযোগ তোলেন এবং স্প্রিংফিল্ডের হাইতিয়ান অভিবাসীদের সরিয়ে দেওয়ার হুমকি দেন। মন্টানার কালিস্পেলে তিনি ডেমোক্র্যাটিক প্রার্থী স্যাম ফরস্ট্যাগের বিরুদ্ধে মন্টানার শিশুদের শারীরিক রূপান্তর ও ড্রাগ শো সমর্থনের অভিযোগ তোলেন। এছাড়া তিনি ডব্লিউএনবিএ খেলোয়াড় সোফি কানিংহামের প্রশংসা করে সাবেক এনএফএল কোচ জন গ্রুডেনকে রসিকতা করে বলেন, তাকে দলে নিলে পয়েন্ট না বাড়লেও দর্শক বাড়বে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তিনি সাউথ ক্যারোলাইনার ডেমোক্র্যাটিক প্রার্থী অ্যানি অ্যান্ড্রুজকে কুরুচিপূর্ণ ভাষায় আক্রমণ করেন।
টিভি বিজ্ঞাপনেও এই ধরনের আক্রমণের সয়লাব দেখা গেছে। ওহিওতে সিনেট লিডারশিপ ফান্ডের এক বিজ্ঞাপনে ডেমোক্র্যাটিক প্রার্থী শেরোড ব্রাউনের বিরুদ্ধে অপ্রাপ্তবয়স্কদের লিঙ্গ পরিবর্তনের সমর্থনের অভিযোগ তোলা হয়, যদিও ব্রাউন ২০২৩ সালের এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন যে সন্তানের স্বাস্থ্য সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত পরিবার ও চিকিৎসকদের, রাজনীবিদদের নয়। টেক্সাসে কেন প্যাক্সটনের অনুসারী পিএসি বিজ্ঞাপনে ডেমোক্র্যাট প্রার্থী জেমি তালারিকোর বিরুদ্ধে করদাতাদের টাকায় শিশুদের অস্ত্রোপচারের সমর্থনের অভিযোগ তোলে, যেখানে তালারিকোর মূল আইনি সংশোধনীর পক্ষে দেওয়া ভোটের তথ্য চেপে যাওয়া হয়।
ট্রাম্প এমনকি আন্তর্জাতিক ঘটনাকেও নির্বাচনী হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছেন। ১৯ অক্টোবর কানসাসের পার্ক সিটিতে এক সমাবেশে ফ্রান্সে শিক্ষা ও জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ে সাম্প্রতিক গণবিক্ষোভের কথা উল্লেখ করে ট্রাম্প বলেন, অনিয়ন্ত্রিত অভিবাসনের কারণেই ফ্রান্সের এই দশা হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের শাসনভার ডেমোক্র্যাটদের হাতে গেলে একই পরিণতি হবে বলে তিনি সতর্ক করেন।
তবে ট্রান্সজেন্ডারদের অধিকার রক্ষা সংস্থা এবং অনেক জরিপ বিশেষজ্ঞ মনে করছেন, গত ২০২৪ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে এই কৌশল কাজ করলেও এবার তা ততটা সফল হবে না। হিউম্যান রাইটস ক্যাম্পেইনের জাতীয় প্রেস সচিব রামিরো সারমিয়েন্টো বলেন, ভোটাররা পরপর তিন নির্বাচনে একই ট্রান্সজেন্ডারবিরোধী পুরনো আক্রমণে বিরক্ত। রিপাবলিকানরা আসল সমস্যা—যেমন দ্রব্যমূল্য, গ্যাস, মুদিপণ্য ও রাজনৈতিক দুর্নীতি এড়িয়ে চলেছে। সেপ্টেম্বর মাসের সিএনএন/এসএসআরএস জরিপে দেখা গেছে, মাত্র ২৫ শতাংশ ভোটারের কাছে ট্রান্সজেন্ডার নীতিটি গুরুত্বপূর্ণ, যেখানে ৬৮ শতাংশ ভোটারের কাছে অর্থনীতিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
এমনকি রিপাবলিকান দলের ভেতরেও এই ধরনের আক্রমণের কার্যকারিতা নিয়ে সন্দেহ রয়েছে। টেক্সাস হাউস অব রিপ্রেজেন্টেটিভসের সাবেক স্পিকার ডেইড ফেলান জানান, এসব কৌশল প্রাথমিক নির্বাচনে কাজ করলেও সাধারণ নির্বাচনে এটি ১০ শতাংশ দোদুল্যমান ও মধ্যপন্থী ভোটারকে দূরে সরিয়ে দিতে পারে, যারা অর্থনৈতিক সংকট নিয়ে বেশি চিন্তিত। এছাড়া টেক্সাসের প্রান্তিক এলাকাগুলোতে এই ধরনের ঘটনার কোনো অস্তিত্ব নেই বলেও তিনি মন্তব্য করেন। রাজনৈতিক বিশ্লেষক হুইট আয়ার্স মনে করেন, ২০২৪ সালে যেসব সামাজিক ইস্যু কাজ করেছিল, বর্তমানে উচ্চ মূল্যস্ফীতি, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, শুল্ক ও ইরানের যুদ্ধের প্রভাবে তৈরি অর্থনৈতিক উদ্বেগের কাছে সেগুলো ফিকে হয়ে গেছে।
