যে স্ত্রী-সন্তানের মুখে হাসি ফোটাতে জীবনের সেরা ১২টি বছর প্রবাসের মাটিতে মাথার ঘাম পায়ে ফেলেছেন জামাল উদ্দিন (৪৯), অসুস্থ হয়ে দেশে ফেরার পর সেই পরিবারই তাঁকে রাতের আঁধারে রাস্তায় ফেলে রেখে গেছে। প্রবাস থেকে পাঠানো অর্থ দিয়ে যে সংসারের চাকা সচল থেকেছে, সেই সংসারের কাছেই অসুস্থ জামাল আজ যেন এক ভারী বোঝা।
গত শনিবার (১ আগস্ট) গভীর রাতে টাঙ্গাইলের সখীপুর উপজেলার কালমেঘা এলাকায় এই হৃদয়বিদারক ঘটনাটি ঘটে। পৈতৃক ভিটার কাছের একটি নিভৃত রাস্তার পাশে অসুস্থ জামালকে ফেলে রেখে যান তাঁর স্ত্রী ও সন্তানরা। রাতে মুষলধারে বৃষ্টির মধ্যে সেখানে মানবেতর অবস্থায় পড়ে থাকার পর রবিবার সকালে স্থানীয়দের নজরে আসেন তিনি।
জানা গেছে, কালমেঘা গ্রামের ফজর আলীর ছেলে জামাল ২৫ বছর আগে গ্রাম ছেড়ে গাজীপুরের শ্রীপুর উপজেলার বাঁশবাড়ি দক্ষিণ পাড়ায় শ্বশুরবাড়িতে বসবাস শুরু করেন। পরবর্তীতে পরিবারের সচ্ছলতার আশায় সৌদি আরবে পাড়ি জমান এবং সেখানে টানা ১২ বছর কঠোর পরিশ্রম করেন।
কিডনি জটিলতাসহ নানা শারীরিক সমস্যায় আক্রান্ত হয়ে প্রায় আট মাস আগে নিঃস্ব অবস্থায় দেশে ফেরেন জামাল। স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রবাসে থাকা অবস্থায় অর্জিত সব টাকা তিনি স্ত্রীর কাছেই পাঠাতেন। কিন্তু গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়ার পর চিকিৎসা ও সেবা-শুশ্রূষার বদলে পরিবারে শুরু হয় অবহেলা ও নির্যাতন। শেষ পর্যন্ত তাকে রাতের আঁধারে সাবেক পৈতৃক বাড়ির পাশে পলিথিন মুড়ে ফেলে রেখে যাওয়া হয়।
বর্তমানে কালমেঘা গ্রামের উত্তর-পূর্ব পাড়ায় ভাতিজি ইসমতারার বাড়িতে ঠাঁই হয়েছে জামালের। তাঁর বড় ভাই সোহরাব আলী ক্ষোভ ও দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলেন, “ভাইকে আগেই সাবধান করেছিলাম শ্বশুরবাড়ির লোকজনকে অন্ধের মতো বিশ্বাস না করতে। আজ শুনতে পেলাম অসুস্থ অবস্থায় তাকে রাস্তায় ফেলে চলে গেছে। এর চেয়ে কষ্টের জীবন আর কী হতে পারে? ছোট ভাই জামাল এতই অসুস্থ যে কোনো কথা পর্যন্ত বলতে পারছে না।”
তবে অভিযোগ অস্বীকার করে জামালের সাবেক স্ত্রী রিনা আক্তার জানান, “আমার স্বামীকে আমি কয়েক মাস আগেই ডিভোর্স দিয়েছি। তাঁর সঙ্গে এখন আমার কোনো সম্পর্ক নেই। রাতের বেলায় তিনি কীভাবে ওই এলাকায় পৌঁছালেন, সে বিষয়ে আমি কিছুই জানি না।”
বিষয়টি সামাজিক মাধ্যমে ও এলাকায় ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করলে প্রশাসনের নজরে আসে। সখীপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আশরাফুল আলম জানান, ঘটনাটি অত্যন্ত মর্মান্তিক। ইতিমধ্যে উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তাকে বিষয়টির সার্বিক খোঁজখবর নিয়ে অসুস্থ প্রবাসীকে প্রয়োজনীয় সরকারি ও মানবিক সহায়তা প্রদানের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
