স্লোভেনিয়ার রাজধানী লুব্লিয়ানার পুরোনো শহরের কেন্দ্রস্থলে গড়ে উঠেছে এক ব্যতিক্রমী জাদুঘর, যার নাম ‘বুলশিট মিউজিয়াম’। সাবেক যুগোস্লাভিয়ার বৈচিত্র্যময় ও অনেক সময় পরস্পরবিরোধী রসিকতা বা রসবোধকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে এই উচ্চাভিলাষী প্রকল্প। গত মে মাসে চালু হওয়া এই জাদুঘরের প্রবেশদ্বারে মাথায় বালতি পরা একটি ম্যানিকুইন দর্শনার্থীদের স্বাগত জানায়।
জাদুঘরটির মূল থিম বা সংযোগকারী সূত্র হলো বলকান অঞ্চলের একটি বহুল ব্যবহৃত শব্দ ‘ইয়েবিগা’ (Yebiga)। সাধারণ অর্থে এর অনুবাদ করা যায় ‘ধুর ছাই’ বা ‘যাক গে’। জাদুঘরের প্রতিষ্ঠাতা বরুত কোকেলি নিজেই একটি টি-শার্ট পরে থাকেন, যাতে লেখা— “ইয়েবিগা শব্দের কোন অংশটি আপনি বুঝতে পারেননি?” পাঁচটি ছোট কক্ষ নিয়ে গঠিত এই জাদুঘরটি অদ্ভুত সব অনুষঙ্গ পরিহিত ম্যানিকুইন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) দিয়ে তৈরি হাস্যোজ্জ্বল চরিত্রের ছবি এবং কার্ডবোর্ডের স্ক্রিনে প্রদর্শিত বিভিন্ন কৌতুকের দৃশ্য দিয়ে সাজানো হয়েছে।
প্রতিষ্ঠাতা বরুত কোকেলি বলেন, “যখন কোনো টাকা-পয়সা থাকে না, চাকরি থাকে না, কোনো কিছুই ঠিকঠাক চলে না, তখনও সবকিছুই হাস্যরসের মাধ্যমে সমাধান করা সম্ভব। আর এটি কাজ করার জন্য হাস্যরসের কোনো ফিল্টার বা সেন্সরশিপ থাকা চলবে না।”
যদিও এটি নিজেকে ‘বলকান’ রসবোধের কেন্দ্র হিসেবে পরিচয় দেয়, তবে জাদুঘরটি মূলত সাবেক যুগোস্লাভিয়ার কৌতুক সংস্কৃতির ওপর ভিত্তি করে তৈরি। এই সমাজতান্ত্রিক ফেডারেশনের মধ্যে ছিল বর্তমানের স্লোভেনিয়া, ক্রোয়েশিয়া, সার্বিয়া, মন্টিনিগ্রো, বসনিয়া ও হার্জেগোভিনা এবং কসোভো। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের ধ্বংসস্তূপ থেকে জন্ম নেওয়া যুগোস্লাভিয়া ছিল মূলত একটি সাধারণ পরিচয় ও ভাষার (যা তখন দাপ্তরিকভাবে সার্বো-ক্রোয়েশিয়ান নামে পরিচিত ছিল) অধীনে দক্ষিণ স্লাভ এবং কিছু অ-স্লাভিক সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীকে একত্রিত করার একটি রাজনৈতিক প্রকল্প। তবে ১৯৯০-এর দশকের শুরুতে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মাধ্যমে যুগোস্লাভিয়ার পতনের পর স্পষ্ট হয়ে যায় যে, একক যুগোস্লাভ জাতিসত্তার ভিত্তি তেমন গভীর ছিল না। এরপর থেকে এই অঞ্চলের বিভিন্ন জাতি নিজেদের আলাদা ধর্মীয় পরিচয় (যেমন ক্যাথলিক, অর্থোডক্স ও ইসলাম) এবং পৃথক উপভাষা ও ভাষার মাধ্যমে সংজ্ঞায়িত করে আসছে।
জাদুঘরটির মতে, ‘বলকান’ রসবোধই হয়তো যুগোস্লাভিয়ার এই সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যকে একসঙ্গে ধরে রাখার আঠা হিসেবে কাজ করেছিল। এখানকার প্রদর্শনীতে থাকা কিছু কৌতুক সরাসরি ভাষার বৈচিত্র্য নিয়ে তৈরি। প্রবেশদ্বারের একটি বড় পোস্টারে সিরিলিক ও ল্যাটিন উভয় হরফ ব্যবহার করে লেখা রয়েছে, “একজন বোকা মানুষ সিরিলিক এবং ল্যাটিন উভয় বর্ণমালাতেই বোকা।” উল্লেখ্য, সিরিলিক হরফ সার্ব এবং অর্থোডক্স খ্রিস্টানদের সাথে সম্পৃক্ত, অন্যদিকে ল্যাটিন বর্ণমালা বিলুপ্ত রাষ্ট্রের অন্যান্য প্রধানত অ-অর্থোডক্স জাতিগুলো ব্যবহার করে।
এই অঞ্চলের সশস্ত্র সংঘাতের প্রভাবও পরোক্ষভাবে প্রদর্শনীতে ফুটে উঠেছে। ১৯৯৬ সালের বিতর্কিত সার্বিয়ান ড্রামা ‘লেপা সেলা লেপো গোরে’ (যার অর্থ ‘সুন্দর গ্রামগুলো সুন্দরভাবেই পুড়ে যায়’)—যা ছিল বসনিয়ান যুদ্ধের সময় অবরুদ্ধ সার্ব সৈন্যদের নিয়ে তৈরি—তার নাম বদলে এখানে একটি অদ্ভুত লাইন করা হয়েছে: ‘লেপা জেলা লেপো গোয়ে’ (যার অর্থ ‘ভালো খাবার আপনাকে ভালোভাবে মোটা করে’)।
সমাজে নারীর ভূমিকা এবং ক্ষমতাও এখানে একটি ঐক্যবদ্ধ করার উপাদান হিসেবে দেখা গেছে। ‘স্টারলেটা’ (Starleta) শব্দটির একটি চমৎকার রসাত্মক সংজ্ঞা দিয়ে লেখা হয়েছে, “স্টারলেটা হলো বলকান অঞ্চলের প্রথম পৌরাণিক জীব, যার শরীর নারীর কিন্তু মাথা টার্কি মুরগির মতো।” মূলত যেসব নারী কেবল তাদের কৃত্রিম উপায়ে বর্ধিত সৌন্দর্যের মাধ্যমে খ্যাতি ও সম্পদ অর্জন করতে চান, তাদের ক্ষেত্রে এটি ব্যবহৃত হয়। আরেকটি কৌতুক বলছে, “সে একজন রাজপুত্রকে বিয়ে করতে চেয়েছিল, কিন্তু একটি ঘোড়ার কাছে বেশি টাকা ছিল।” এখানে ‘কনজ’ (ঘোড়া) শব্দটি ব্যবহার করা হয়েছে, যা সাবেক যুগোস্লাভিয়ার অনেক দেশে ‘পুরুষ’ বোঝাতে ব্যবহৃত হয়।
কোকেলি গত কয়েক বছর ধরে এই অঞ্চলের প্রায় ২৫,০০০ কৌতুক সংগ্রহ করেছেন। তবে রাজনৈতিকভাবে সংবেদনশীল কৌতুকগুলো প্রদর্শনীতে রাখা থেকে তিনি নিজেকে বিরত রেখেছেন। তিনি স্বীকার করেন, “আমরা যদি প্রকৃত সব ‘বলকান’ কৌতুক প্রদর্শন করতাম, তবে হয়তো জাদুঘরটি খোলাই সম্ভব হতো না।” এখানে ধর্ম, জাতিগত পরিচয় বা জাতীয় প্রতীককে সরাসরি আঘাত করে এমন কৌতুক এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে।
কোনো নির্দিষ্ট গোষ্ঠীকে উপহাস করা বা নির্দিষ্ট জাতিগত চরিত্রের কৌতুকও এখানে বাদ দেওয়া হয়েছে। যেমন, মন্টিনিগ্রোবাসীদের তথাকথিত ‘অলসতা’ নিয়ে প্রচলিত কোনো কৌতুক এখানে নেই (যেমন একটি স্থানীয় ম্যাগাজিনে লেখা ছিল: “একজন মন্টিনিগ্রোবাসী ঘুমাতে যাওয়ার আগে কী বলে? ‘হে পৃথিবী, একটু ওপরে ওঠো যাতে আমি শুয়ে পড়তে পারি’)। তবে এআই-নির্মিত একটি ‘জাতিগত’ মেটা-কৌতুক দেখা গেছে, যা স্লোভেনীয়দের নিজেদের সবচেয়ে ‘মার্জিত’ এবং ‘ইউরোপীয়’ হিসেবে উপস্থাপন করার এবং বলকান অঞ্চলের বাকি অংশ থেকে দূরত্ব বজায় রাখার প্রবণতাকে ব্যঙ্গ করে। সেখানে একজন স্লোভেনীয় ভদ্রভাবে ‘তিনশ লোমশ ভালুক’-এর মতো নিরীহ গালি দেয়, যেখানে তার বলকান সমকক্ষটি রঙিন ও তীব্র গালিগালাজ করতে কোনো দ্বিধা করে না।
সামগ্রিকভাবে, বেশিরভাগ কৌতুকই দৈনন্দিন সমস্যা এবং জীবনের অসঙ্গতি নিয়ে তৈরি। যেমন একটিতে লেখা, “জীবন নেলপলিশও নয়, অ্যাসিটোনও নয়।” অন্যটিতে বলা হয়েছে, “আমাদের অবস্থা যখন ভালো ছিল তখনও আমরা অভিযোগ করেছি। এখন যখন অবস্থা খারাপ হচ্ছে, আমরা আবারও অভিযোগ করছি।” রোমান্টিক সম্পর্ক নিয়েও কৌতুক রয়েছে: “ভালোবাসা হলো এমন যখন আপনাকে দেখতে আলুর বস্তার মতো লাগে, কিন্তু সে আপনাকে ফ্রেঞ্চ ফ্রাই হিসেবে দেখে।” নিজেদের নিয়ে হাসার ক্ষমতাও আরেকটি অন্যতম বিষয়: “অপেশাদাররা ভুল করে, কিন্তু আমরা যারা অভিজ্ঞ, আমরা বিপর্যয় তৈরি করি।”
তবে পুরো প্রদর্শনীকে যে বিষয়টি এক সুতোয় বেঁধে রেখেছে তা হলো বলকান অঞ্চলের বিখ্যাত ফলের ব্র্যান্ডি ‘রাকিয়া’ (Rakija)। জাদুঘরে প্রবেশের সময় দর্শনার্থীদের এটি পরিবেশন করা হয় এবং একটি প্রদর্শনীতে এটিকে ‘প্রতিটি বলকান পরিবারের প্রাথমিক চিকিৎসা’ হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। এটি কুখ্যাত ‘ইয়েবিগা’ ধারণারও মূল অংশ, যা একটি প্রদর্শনীতে এভাবে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে: “বলকানদের বলার একটি উপায়: আপনি এখন কী করবেন? সর্বোচ্চ অনুভূতি, সর্বনিম্ন শক্তি। সাধারণত এটি রাকিয়া, একটি চুরুট এবং এমন একটি গানের সাথে যায় যা প্রয়োজনের চেয়ে বেশি আঘাত করে।”

