কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) প্রযুক্তির অপব্যবহার করে প্রবীণদের ফাঁদে ফেলার প্রবণতা বিশ্বজুড়ে আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে। এর ফলে চরম মানসিক ও আর্থিক সংকটে পড়ছেন তাদের সন্তানরা, বিশেষ করে যারা একই সাথে নিজেদের সন্তান এবং বয়োবৃদ্ধ বাবা-মায়ের দেখাশোনা করছেন। সমাজবিজ্ঞানের ভাষায় এই শ্রেণীকে বলা হয় ‘স্যান্ডউইচ জেনারেশন’। এআই প্রযুক্তির কারণে প্রতারণার ধরন এত নিখুঁত হচ্ছে যে তা খালি চোখে ধরা কঠিন হয়ে পড়ছে, যার ফলে প্রবীণদের আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সন্তানদের প্রতিনিয়ত উদ্বেগ ও চাপের মধ্যে থাকতে হচ্ছে।
কলার আইডি এবং স্প্যাম ব্লকিং অ্যাপ ‘ট্রুকলার’ (Truecaller)-এর সিনিয়র এক্সিকিউটিভ স্পোকসপারসন ক্লেটন লিয়া ব্রাটেন সম্প্রতি ঘটে যাওয়া একটি দুঃখজনক ঘটনার কথা জানান। এক ব্যক্তি তার কাছে সাহায্য চেয়ে ফোন করেছিলেন, যার বিধবা মা এক প্রতারক চক্রের খপ্পরে পড়ে ৭,০০০ ডলারের বেশি খুইয়েছেন। প্রতারকরা ওই নারীকে বিশ্বাস করিয়েছিল যে তারা তার প্রয়াত স্বামীর কর ফাঁকির তথ্য গোপন করার জন্য কাজ করেছিল এবং উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া অবশিষ্ট অর্থ রক্ষা করতে তাকে অবিলম্বে টাকা পরিশোধ করতে হবে। কিন্তু যখন তার সন্তান বিষয়টি জানতে পারেন, ততক্ষণে অনেক দেরি হয়ে গেছে।
লিয়া ব্রাটেন বলেন, প্রতারকরা এখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে বিভিন্ন শোকসংবাদ (obituaries) বিশ্লেষণ করে এবং প্রবীণদের দুর্বল দিকগুলো খুঁজে বের করে। যদিও ওই পরিবারের হারানো টাকা উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি, তবে তারা ব্যাংক অ্যাকাউন্টগুলো এমনভাবে লক করে দিয়েছেন যাতে এখন ওই নারী কোনো টাকা লেনদেন করতে গেলে সন্তানদের অনুমোদনের প্রয়োজন হয়।
প্রযুক্তির এই অপব্যবহারের ফলে অনেক সন্তানকেই এখন তাদের বাবা-মায়ের ব্যাংক অ্যাকাউন্টের অভিভাবক হতে হচ্ছে। এফবিআই (FBI)-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে ৬০ বছর বা তার বেশি বয়সী প্রবীণদের কাছ থেকে ২ লাখেরও বেশি সাইবার অপরাধের অভিযোগ জমা পড়েছে, যেখানে আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ ছিল প্রায় ৮ বিলিয়ন ডলার। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, লোকলজ্জার ভয়ে অনেকেই অভিযোগ করেন না বিধায় প্রকৃত ক্ষতির পরিমাণ এর চেয়েও অনেক বেশি।
আইডেন্টিটি থেফট প্রোটেকশন সার্ভিস ‘লাইফলক’ (LifeLock)-এর জেনারেল ম্যানেজার ইয়ান বেডনোভিটজ নিজেই এমন পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে গেছেন। ২০১৬ সালে তার মায়ের ঘরের একজন বেতনভুক্ত কেয়ারগিভার তার মায়ের পরিচয় চুরি করে জালিয়াতির মাধ্যমে ঋণ ও ক্রেডিট কার্ড নিয়েছিলেন। এরপর বেডনোভিটজ তার মায়ের ঘর থেকে সমস্ত সংবেদনশীল আর্থিক নথি সরিয়ে ফেলেন এবং সমস্ত চিঠি একটি থার্ড-পার্টি সাইটে রিডাইরেক্ট করেন যাতে সেগুলো স্ক্যান করে যাচাই করা যায়। এমনকি চিকিৎসকদেরও নির্দেশ দেন যেন কেয়ারগিভারদের হাতে কোনো কাগজের নথি না দেওয়া হয়। তিনি বলেন, বাবা-মায়ের যত্ন নেওয়ার আর্থিক ও শারীরিক চাপের পাশাপাশি এই ধরণের প্রতারণা ভয়াবহ মানসিক বিপর্যয় ডেকে আনে।
লিয়া ব্রাটেন উল্লেখ করেন, বর্তমানে প্রবীণরা আগের চেয়ে অনেক বেশি স্মার্টফোন ব্যবহার করছেন এবং শিশুদের মতোই অনলাইনে প্রচুর সময় কাটাচ্ছেন। ২০১৬ সালের পর থেকে এআই-এর উত্থানের কারণে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে। অধিকাংশ কেয়ারগিভারই তাদের বাবা-মায়ের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের দিকে এত বেশি মনোযোগ দেন যে সাইবার নিরাপত্তা এবং ডেটা প্রাইভেসি বা তথ্য সুরক্ষার বিষয়টি তালিকার সবার নিচে পড়ে থাকে। কিন্তু এটিকে অবহেলা করলে পরবর্তীতে আরও বড় বিপদ নেমে আসতে পারে।
সাইবার সিকিউরিটি বিশেষজ্ঞ ও লেখক প্যাট্রিক কফলিন বলেন, আর্থিক ক্ষতির চেয়েও প্রতারণার শিকার হওয়ার পর মানসিক আঘাত অনেক বেশি ক্ষতিকর হয়। অনেকে লজ্জায় এবং একাকীত্বে ভোগেন। সমাজে অনেকেই ভুক্তভোগীকে প্রশ্ন করেন, "তুমি কীভাবে এই ফাঁদে পা দিলে?"—এমন প্রশ্নের ভয়ে প্রবীণরা অনেক সময় প্রতারণার বিষয়টি সন্তানদের কাছে গোপন রাখেন, যা আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ আরও বাড়িয়ে দেয়।
এআই ব্যবহার করে সাইবার অপরাধীরা ভুক্তভোগীদের নিয়ে গবেষণা করে, নিখুঁত স্ক্রিপ্ট তৈরি করে এবং ডিপফেক ছবি, কণ্ঠস্বর বা ভিডিও তৈরি করে প্রতারণা চালায়। অনেক সময় প্রথম ফোনেই প্রতারণা করা হয় না, বরং পরবর্তী সময়ে বড় কোনো ফাঁদ পাতার জন্য ব্যক্তিগত তথ্য সংগ্রহ করা হয়। কফলিন বলেন, সাইবার অপরাধীরা তাদের কার্যক্রমকে কর্পোরেট ব্যবসার মতো পরিচালনা করছে এবং অনেক ক্ষেত্রে বৈধ মার্কিন ব্যবসার চেয়েও নিখুঁতভাবে এআই ব্যবহার করছে।
তবে আশার কথা হলো, বেশ কিছু অ্যান্টি-ফ্রড প্রতিষ্ঠান এআই ব্যবহার করেই এই অপরাধ রুখে দেওয়ার চেষ্টা করছে। 'কেয়ারফুল' (Carefull) বা কফলিনের 'স্যাভি সিকিউরিটি' (Savi Security)-র মতো অ্যাপগুলো কেয়ারগিভারদের তাদের প্রিয়জনদের অ্যাকাউন্টের অস্বাভাবিক লেনদেন পর্যবেক্ষণ করতে সাহায্য করে। বিশেষজ্ঞরা পরামর্শ দেন, কোনো প্রতারণার ঘটনা ঘটলে দ্রুত স্ক্রিনশট ও অন্যান্য প্রমাণ সংরক্ষণ করে অভিযোগ করতে হবে। তবে সবচেয়ে ভালো উপায় হলো প্রতিরোধ। বাবা-মায়ের শুধু শারীরিক বা মানসিক স্বাস্থ্যের যত্ন নিলেই হবে না, তাদের তথ্য সুরক্ষার বিষয়টিও আগে থেকেই নিশ্চিত করতে হবে।
