মার্কিন নৌবাহিনীর যুদ্ধজাহাজ এবং তাদের নিকটবর্তী সরবরাহ কেন্দ্রের মধ্যকার দূরত্ব ২,১০০ মাইলে গিয়ে ঠেকেছে। সরবরাহ ঘাঁটির এই পরিবর্তনের ফলে পারস্য উপসাগরে মোতায়েন থাকা মার্কিন বিমানবাহী রণতরী ‘ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন’ (CVN-72)-এর ক্রুদের মানসিক স্বাস্থ্য এবং রসদ সরবরাহ নিয়ে তীব্র উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
ইরানের বিরুদ্ধে মার্কিন যুদ্ধ ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’র অংশ হিসেবে আরব সাগরে ব্যাপক বিমান হামলার একটি ভাসমান ঘাঁটি হিসেবে কাজ করছিল এই রণতরীটি। নিউ ইয়র্ক টাইমসের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চলতি বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধের শুরুতেই ইরান পারস্য উপসাগরের বাহরাইন দ্বীপে অবস্থিত মার্কিন নৌবাহিনীর অন্যতম প্রধান লজিস্টিক ঘাঁটি ‘নেভাল সাপোর্ট অ্যাক্টিভিটি বাহরাইন’-এ হামলা চালিয়ে ব্যাপক ক্ষতিসাধন করে। এর পর থেকেই মূলত রণতরীটির সরবরাহ সমস্যা শুরু হয়।
বাহরাইন ঘাঁটির বিকল্প হিসেবে মার্কিন নৌবাহিনী ব্রিটিশ নিয়ন্ত্রিত ডিয়েগো গার্সিয়া দ্বীপে অবস্থিত ইউএস-পরিচালিত ‘নেভাল সাপোর্ট ফ্যাসিলিটি ডিয়েগো গার্সিয়া’কে বেছে নেয়। মালদ্বীপের দক্ষিণে অবস্থিত এই দ্বীপটি ওমান উপসাগরে অবস্থানরত মার্কিন নৌবাহিনী থেকে প্রায় ২,১০০ মাইল দূরে। অথচ আগের বাহরাইন ঘাঁটিটি ওমান উপসাগরের কেন্দ্রস্থল থেকে মাত্র ৮৭০ মাইল দূরে ছিল।
দূরত্বের এই বিশাল ব্যবধানের কারণে রণতরীটি তার ‘লিবার্টি পোর্ট’ বা অবকাশ যাপনের বন্দর সুবিধা হারিয়েছে। সাধারণত এই বন্দরগুলোতে নোঙর করে ক্রু সদস্যরা জাহাজ থেকে নেমে বিশ্রাম নেওয়া, পরিবারের সাথে যোগাযোগ করা এবং বিনোদনের সুযোগ পান। একই সাথে জাহাজে নতুন করে রসদ সরবরাহ এবং প্রয়োজনীয় মেরামতও করা হয়। কিন্তু কোনো পোর্ট কল বা বন্দরে নোঙর করার সুযোগ ছাড়াই আব্রাহাম লিংকনের ক্রুরা টানা ২৬০ দিনেরও বেশি সময় ধরে সমুদ্রে কাটাচ্ছেন। গত বছরের ডিসেম্বর থেকে জাহাজটি কোনো বন্দরে ভেড়েনি।
এর আগে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় কিছু মার্কিন যুদ্ধজাহাজকে দীর্ঘ সময় সমুদ্রে কাটাতে হয়েছিল। তবে সাম্প্রতিক ইতিহাসে ২০২০ সালে কোভিড মহামারির সময়ে ‘ইউএসএস ডোয়াইট ডি. আইজেনহাওয়ার’ কোনো বন্দরে না ভিড়ে একটানা ২০৬ দিন সমুদ্রে কাটিয়েছিল, যা লিংকনের চেয়ে কম।
টানা সমুদ্রে থাকার কারণে আব্রাহাম লিংকনের ক্রুদের মানসিক স্বাস্থ্যের অবনতি নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন তাদের পরিবারের সদস্যরা। এর আগে গত এপ্রিল মাসে জাহাজটিতে খাবার সংকটের বিষয়েও প্রতিবেদন প্রকাশ করেছিল ইউএসএ টুডে। এ নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনেও বিতর্ক শুরু হয়েছে। ডেমোক্রেটিক সিনেটর জন অসফ এবং মার্ক কেলি ট্রাম্প প্রশাসনের তীব্র সমালোচনা করে আব্রাহাম লিংকনের ভেতরের জীবনযাত্রার মান নিয়ে তদন্তের দাবি জানিয়েছেন। তবে রিপাবলিকান আইনপ্রণেতারা এ বিষয়ে অনেকটাই নীরব ভূমিকা পালন করছেন—তারা প্রশাসনের সমালোচনাও করছেন না, আবার রক্ষাও করছেন না।
অবশ্য নৌবাহিনী, ইউএস সেন্ট্রাল কমান্ড এবং যুদ্ধ সচিব পিট হেগসেথ ক্রুদের সংকটের বিষয়টি অস্বীকার করেছেন। তাদের দাবি, জাহাজের ভেতরের পরিস্থিতি সম্পূর্ণ ভুলভাবে উপস্থাপন করা হচ্ছে। তবে নৌবাহিনী এক বিবৃতিতে স্বীকার করেছে যে, সরবরাহ ঘাঁটির পরিবর্তনের কারণে লজিস্টিক চেইনে টান পড়েছে এবং জাহাজে চিঠি ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় সামগ্রীর ঘাটতি দেখা দিয়েছিল। বিবৃতিতে বলা হয়েছে, “কর্তৃপক্ষ মিশন-গুরুত্বপূর্ণ সরবরাহগুলোকে অগ্রাধিকার দিয়েছিল: প্রথমে খাবার, তারপর স্বাস্থ্য সুরক্ষাসামগ্রী এবং সবশেষে চিঠি।” বর্তমানে ক্রুদের জন্য বিশুদ্ধ পানি ও “স্বাস্থ্যকর খাবারের বিকল্প” রয়েছে বলেও দাবি করেছে নৌবাহিনী।
অবশেষে দীর্ঘ এই সমুদ্রযাত্রার অবসান ঘটতে চলেছে। ‘ইউএসএস জর্জ ওয়াশিংটন’ (CVN-73) রণতরীটি আব্রাহাম লিংকনের স্থলাভিষিক্ত হতে যাচ্ছে। দায়িত্ব হস্তান্তর শেষে আব্রাহাম লিংকন তার নিজ বন্দর সান ডিয়েগোর উদ্দেশ্যে রওনা হবে বলে আশা করা হচ্ছে।

