ফিলিস্তিন রাষ্ট্র গঠনের সম্ভাবনা চিরতরে নস্যাৎ করার লক্ষ্যে অধিকৃত পশ্চিম তীরের কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি এলাকায় ১,২০০টিরও বেশি নতুন বসতি নির্মাণের জন্য দরপত্র আহ্বান করেছে ইসরায়েল সরকার।
বিতর্কিত ‘ই১’ (E1) নামে পরিচিত এই এলাকায় আবাসন প্রকল্প গড়ে তোলার ইসরায়েলি পরিকল্পনার বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরে তীব্র আন্তর্জাতিক নিন্দা জানানো হচ্ছে।
পূর্ব জেরুজালেমের পূর্বে অবস্থিত প্রায় ১২ বর্গকিলোমিটার (৪.৬ বর্গমাইল) আয়তনের এই এলাকাটিতে বসতি স্থাপন করা হলে তা কার্যত পশ্চিম তীরকে দুই ভাগে বিভক্ত করে ফেলবে এবং পূর্ব জেরুজালেমকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন করে দেবে। বিরোধীরা সতর্ক করে বলেছেন, এই প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে পশ্চিম তীরের উত্তরাঞ্চল দক্ষিণাঞ্চল থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়বে।
এর ফলে রামাল্লাহ, পূর্ব জেরুজালেম ও বেথলেহেমকে সংযুক্ত করে একটি অবিচ্ছিন্ন ফিলিস্তিনি নগর অঞ্চল গড়ে তোলার সুযোগ নষ্ট হবে, যা একটি স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র গঠনের পথে বড় অন্তরায়।
দরপত্র জমা দেওয়ার শেষ সময় নির্ধারণ করা হয়েছে আগামী অক্টোবরে অনুষ্ঠিতব্য ইসরায়েলের সাধারণ নির্বাচনের মাত্র কয়েক দিন আগে। এর ফলে ভবিষ্যতে কোনো নতুন সরকার ক্ষমতায় এলেও এই দরপত্র বাতিল করা তাদের জন্য অত্যন্ত কঠিন হবে। ইসরায়েলি বসতিবিরোধী পর্যবেক্ষণ সংস্থা ‘পিস নাও’ (Peace Now) আদালতে এই পরিকল্পনার বিরুদ্ধে চ্যালেঞ্জ জানিয়েছিল।
সংস্থাটি জানিয়েছে, নির্বাচনের আগেই ঠিকাদারদের সাথে চুক্তি সম্পন্ন করার চেষ্টা করছে বর্তমান সরকার, যাতে পরবর্তী সরকার এই নির্মাণকাজ বাতিল করতে না পারে। আংশিক নির্মাণকাজও এই অঞ্চলের ভৌগোলিক ও কৌশলগত চরিত্রকে মৌলিকভাবে বদলে দেবে এবং দ্বি-রাষ্ট্রভিত্তিক শান্তি প্রক্রিয়া ধ্বংস করবে।
আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে ইসরায়েলি বসতি স্থাপন সম্পূর্ণ অবৈধ। ১৯৬৭ সালের মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের সময় পশ্চিম তীর ও পূর্ব জেরুজালেম দখল করার পর থেকে এ পর্যন্ত প্রায় ১৬০টি বসতি গড়ে তুলেছে ইসরায়েল, যেখানে বর্তমানে প্রায় ৭ লাখ ইহুদি বসবাস করছেন।
একই এলাকায় প্রায় ৩৩ লাখ ফিলিস্তিনির বসবাস। ফিলিস্তিনিরা তাদের ভবিষ্যৎ স্বাধীন রাষ্ট্রের জন্য গাজার পাশাপাশি এই অঞ্চলগুলো দাবি করে আসছে।
২০২২ সালের শেষের দিকে প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর নেতৃত্বে কট্টর ডানপন্থী ও বসতি-পন্থী জোট সরকার ক্ষমতায় আসার পর এবং ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের হামলার পর শুরু হওয়া গাজা যুদ্ধের মধ্যে বসতি সম্প্রসারণের গতি নাটকীয়ভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।
আন্তর্জাতিক চাপের মুখে কয়েক দশক ধরে ইসরায়েল ই১ এলাকায় নির্মাণকাজ স্থগিত রেখেছিল। তবে ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের ধারণাকে "মুছে ফেলার" প্রকাশ্য ঘোষণা দিয়ে এক বছর আগে বর্তমান সরকার এই প্রকল্পের অনুমোদন দেয়। উগ্র জাতীয়তাবাদী ও বসতি স্থাপনকারী ইসরায়েলি অর্থমন্ত্রী বেজালেল স্মোট্রিচ সে সময় বলেছিলেন, ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের ধারণাকে "মুছে ফেলা হচ্ছে"।
স্থানীয় বেদুইন ফিলিস্তিনি এবং ইসরায়েলি শান্তি গোষ্ঠীগুলোর আইনি চ্যালেঞ্জ সত্ত্বেও, দেশটির গৃহায়ন মন্ত্রণালয় গত আগস্টে অনুমোদিত ৩,৪০১টি আবাসন ইউনিটের মধ্যে ১,২৩৪টির জন্য দরপত্র জারি করেছে। এটি পূর্ব জেরুজালেম ও মালে আদুমিম (Maale Adumim) বসতির মধ্যবর্তী এলাকায় অবস্থিত।
এই প্রকল্প ফিলিস্তিনিদের ওপর বিপর্যয়কর প্রভাব ফেলবে বলে জানিয়েছেন জেরুজালেমের ফিলিস্তিনি অধিকারকর্মী জামাল জুমা। 'স্টপ দ্য ওয়াল' ক্যাম্পেইনের এই কর্মী বিবিসিকে বলেন, "এটি আমাদের সমাজ ও পরিবারগুলোকে ধ্বংস করে দেবে…
এটি একটি বড় বিপর্যয়।" তিনি জানান, এই প্রকল্পের কারণে ৪০টিরও বেশি বেদুইন সম্প্রদায় ক্ষতিগ্রস্ত হবে এবং তাদের নিজেদের বাসস্থান থেকে উচ্ছেদ করা হতে পারে।

