যুক্তরাষ্ট্রের নিউ ইয়র্ক অঙ্গরাজ্যের অ্যালবানিতে অবস্থিত স্টেট ক্যাপিটল ভবনে বড় ধরনের সন্ত্রাসী হামলার পরিকল্পনা নস্যাৎ করেছে এফবিআই। এই ষড়যন্ত্রের অভিযোগে জেসিকা বোভি (৩৫) নামে এক নারীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। নিউ ইয়র্কের নর্দার্ন ডিস্ট্রিক্টের ফেডারেল প্রসিকিউটররা জেসিকার বিরুদ্ধে বিদেশি সন্ত্রাসী সংগঠনকে বস্তুগত সহায়তা দেওয়ার চেষ্টার অভিযোগ এনেছেন। দোষী সাব্যস্ত হলে তাঁর সর্বোচ্চ ২০ বছরের কারাদণ্ড এবং আড়াই লাখ ডলার জরিমানা হতে পারে।
তদন্তকারীদের দাবি, চলতি বছরের ১৬ জুলাই থেকে ১৭ আগস্টের মধ্যে ক্যাপিটল ভবনে বিস্ফোরক দিয়ে হামলার পরিকল্পনা করেছিলেন অ্যালবানির বাসিন্দা জেসিকা। এফবিআইয়ের ছদ্মবেশী কর্মকর্তাদের সহায়তায় তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়। জেসিকা মূলত ক্যাপিটল ভবন ও সেখানে কর্মরত সিনেটরদের লক্ষ্য করে হামলা চালাতে চেয়েছিলেন।
ফার্স্ট অ্যাসিস্ট্যান্ট ইউএস অ্যাটর্নি জন সারকোন বলেন, "জেসিকা বোভি বিস্ফোরক ডিভাইস ব্যবহার করে নিউ ইয়র্ক স্টেট ক্যাপিটল ও সিনেটরদের ওপর হামলার ছক কষেছিলেন। এই অভিযোগ অত্যন্ত উদ্বেগজনক। কেউ আমাদের জীবনযাত্রার প্রতি এমন বিদ্বেষ পোষণ করে ক্যাপিটল ও সিনেটরদের নিশানা করতে পারে—তা সরাসরি গণতন্ত্রের ওপর আঘাত, যা কোনোভাবেই বরদাশত করা হবে না।" সারকোন আরও অভিযোগ করেন, জেসিকা অনলাইনে উগ্রবাদে দীক্ষিত হন এবং মার্কিন জনগণের বিরুদ্ধে ঘৃণা ও সহিংসতার বার্তা ছড়াতেন।
আদালতের নথি অনুযায়ী, জেসিকা অন্তত পাঁচবার ক্যাপিটল ভবন রেকি করেন, যা নিরাপত্তা ক্যামেরায় ধরা পড়েছে। তিনি আইসিসের (ISIS) এক ছদ্মবেশী এফবিআই সূত্রের সাথে যোগাযোগ রাখছিলেন। জেসিকা ওই সূত্রকে লিখেছিলেন, "আমি স্টেট ক্যাপিটলকে লক্ষ্যবস্তু বানাতে চাই।" অন্য এক বার্তায় তিনি বলেন, "আমি ভবনের যতটা সম্ভব ধ্বংস করতে চাই এবং সিনেটররা যখন বৈঠকে থাকবেন তখন তাদের হত্যা করতে চাই… আমি চাই তারা যেন অনেক গুরুত্বপূর্ণ নথিপত্রও হারায়।" তিনি আরও যোগ করেন, "আমি চাই মার্কিন ব্যবস্থার ওপর এর একটি বড় প্রভাব পড়ুক।"
অভিযোগপত্রে জেসিকার একটি ছবি সংযুক্ত করা হয়েছে, যেখানে তাঁকে রেনসেলার হোম ডিপো থেকে হাতুড়ে বোমা তৈরির জন্য পেরেক ও অন্যান্য সরঞ্জাম কিনতে দেখা যায়। এফবিআইয়ের সূত্রগুলো তাঁকে এই কেনাকাটার জন্য ২০০ ডলার দিয়েছিল। জেসিকা হুমকি দিয়েছিলেন, তাঁর রুমমেট যদি এই পরিকল্পনার কথা জানতে পারে তবে তিনি তাকে হত্যা করবেন। তিনি একটি ডোরড্যাশ (DoorDash) ডেলিভারি ব্যাগে করে বোমাটি ক্যাপিটল ভবনে নিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা করেছিলেন এবং কমপক্ষে ১০০ জনকে হত্যার আশা করেছিলেন। এফবিআইয়ের স্পেশাল এজেন্ট ইন চার্জ ক্রেইগ ট্রেমারোলি জানান, জেসিকা বলেছিলেন, "আমি এই ঝুঁকি নিয়ে মাত্র দুই বা তিনজনকে মারতে চাই না, তাতে কী লাভ?"
জেসিকা অন্য দুই গোপন সূত্রের সাথেও সশরীরে দেখা করেছিলেন, যা গোপনে রেকর্ড করা হয়। সেখানে তিনি ভবিষ্যতে অন্যান্য হামলার ইচ্ছা প্রকাশ করেন। তিনি জানান, হোয়াইট হাউসে হামলা চালানো অত্যন্ত কঠিন, তাই তিনি পরে বিষয়টি ভেবে দেখবেন। তবে ক্যাপিটলের সিনেটরদের হত্যা নিশ্চিত করার পাশাপাশি সেখানকার অর্ধেক কর্মীকে শেষ করে দেওয়ার পরিকল্পনা ছিল তাঁর। পাঁচ বছর আগে ইসলাম ধর্মে দীক্ষিত হওয়া জেসিকা চলতি বছরের মে মাসে আনুষ্ঠানিকভাবে আইসিসের প্রতি আনুগত্যের শপথ (বায়াত) নেন এবং অনলাইনে ৯/১১-এর হামলার প্রশংসা করে পোস্ট দেন।
অভিযানের সময় পুলিশ যদি তাঁর কাছাকাছি চলে আসে, তবে যেন পাল্টা গুলি চালাতে পারেন, সেজন্য জেসিকা একটি বন্দুকও চেয়েছিলেন। তিনি এফবিআই সূত্রের কাছে বন্দুকের জন্য ১৫০ ডলার এবং বোমা প্রস্তুতকারকের জন্য ২০০ ডলার অনুদান দেন। চলতি সপ্তাহে জেসিকা যখন ছদ্মবেশী সূত্রের গাড়ি থেকে নামছিলেন, তখনই তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়। গ্রেপ্তারের সময় তাঁর কাছে একটি আগ্নেয়াস্ত্র, ম্যাগাজিন, গোলাবারুদ, একটি ভুয়ো বিস্ফোরক ডিভাইস, ছুরি এবং হাতে লেখা আনুগত্যের শপথনামা (বায়াত) পাওয়া যায়। ট্রেমারোলি বলেন, "জেসিকা এক সূত্রকে বলেছিলেন যে, ৯/১১-এর পর আমেরিকার পতাকা ওড়ানো এক ছোট্ট মেয়ে থেকে আজ তিনি টুইন টাওয়ার ভেঙে পড়ার স্টিকার বুকে নিয়ে ঘুরছেন।"
গ্রেপ্তারের পর জেসিকা স্বীকার করেন যে তিনি জানতেন তাঁর জেল হবে। তিনি এফবিআই এজেন্টদের বলেন, "আমাকে বাঁচানোর কোনো পথ নেই।" হামলার পর জেসিকা দেশ ছেড়ে পালিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা করেছিলেন, তবে ভবিষ্যতে কোনো এক ইংরেজি নববর্ষের প্রাক্কালে ফিরে এসে টাইমস স্কয়ারে হামলা চালানোর ইচ্ছা ছিল তাঁর।
নিউ ইয়র্কের গভর্নর ক্যাথি হোকুল এক বিবৃতিতে বলেন, "নিউ ইয়র্ক স্টেট ক্যাপিটলে হামলার পরিকল্পনাকারী এক ব্যক্তিকে গ্রেপ্তারের ঘোষণা দিয়েছে মার্কিন বিচার বিভাগ ও এফবিআই। এই তদন্তের নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য আমি এফবিআই এবং এই বিপজ্জনক ব্যক্তিকে গ্রেপ্তারে সহায়তার জন্য নিউ ইয়র্ক স্টেট পুলিশের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি। বছরের শুরুর দিকে রাজনৈতিক সহিংসতা ও সরকারি কর্মকর্তাদের প্রতি হুমকির আশঙ্কার মুখে আমরা স্টেট ক্যাপিটল এবং রাজ্য সরকার জুড়ে নিরাপত্তা জোরদার করার পদক্ষেপ নিয়েছিলাম।" গভর্নর আরও যোগ করেন, "এই মুহূর্তে কোনো তাৎক্ষণিক হুমকি নেই।"

