গত ১৬ আগস্ট মাত্র ৩৬ বছর বয়সে মারা যান হলিউড অভিনেত্রী হেইডেন প্যানেটিয়ার। বেঁচে থাকলে ২১ আগস্ট শুক্রবার তিনি ৩৭ বছরে পা দিতেন। তাঁর এই জন্মদিনের ক্ষণটি ভক্ত ও শুভাকাঙ্ক্ষীদের জন্য অত্যন্ত আবেগঘন এক মুহূর্ত নিয়ে এসেছে, যা একই সঙ্গে তাঁর বর্ণাঢ্য অভিনয় জীবন এবং পর্দার পেছনের মানবিক কাজগুলোকে স্মরণ করার একটি বড় সুযোগ করে দিয়েছে।
শিশুশিল্পী হিসেবে যাত্রা শুরু করা হেইডেন প্যানেটিয়ার ছিলেন তাঁর প্রজন্মের এক উজ্জ্বল নক্ষত্র। "হিরোস", "আইস প্রিন্সেস", "রিমেম্বার দ্য টাইটানস" এবং "ন্যাশভিল"-এর মতো জনপ্রিয় কাজগুলোর মাধ্যমে তিনি দর্শকদের হৃদয়ে জায়গা করে নিয়েছিলেন। স্পটলাইটের নিচে বড় হওয়ার নানা চড়াই-উতরাই সত্ত্বেও অভিনয়কেই তিনি নিজের মানসিক শান্তি পাওয়ার একমাত্র উপায় হিসেবে দেখতেন। গত মে মাসে ‘ই! নিউজ’-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছিলেন, "অভিনয় আমার আবেগ প্রকাশের পথ, এটি আমার খুব প্রয়োজন।"
২০০৫ সালে মুক্তি পাওয়া বয়ঃসন্ধিকালের গল্প নিয়ে নির্মিত ছবি "আইস প্রিন্সেস" তরুণী দর্শকদের জন্য অত্যন্ত অনুপ্রেরণাদায়ক ছিল। এই ছবিতে তাঁর সহশিল্পী মিশেল ট্র্যাচেনবার্গও মাত্র দেড় বছর আগে ৩৯ বছর বয়সে মারা যান। ছবিটির চিত্রনাট্যকার হ্যাডলি ডেভিস সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে বলেন, "আইস প্রিন্সেস-এর মূল কথা ছিল মা-বাবার স্বপ্নের বাইরে গিয়ে নিজের জন্য আলাদা স্বপ্ন দেখা। এটি একটি চিরন্তন ও সর্বজনীন বিষয়। এই দুই অভিনেত্রীর অকাল প্রস্থান আমাদের মনে করিয়ে দেয় হলিউডের গল্পগুলো মানুষের মনে কতটা গভীর প্রভাব ফেলে।"
মাত্র এক বছর বয়স হওয়ার আগেই বিনোদন জগতে পা রাখা প্যানেটিয়ার পরবর্তী সময়ে হলিউডে কাজের পরিবেশ বদলানোর স্বপ্ন দেখতেন। গত মে মাসে তাঁর স্মৃতিকথা "দিস ইজ মি: আ রেকনিং"-এর প্রচারণামূলক অনুষ্ঠানে তিনি বলেছিলেন, "আমি পরিচালনা করতে চাই এবং এমন একটি নিরাপদ পরিবেশ তৈরি করতে চাই যেখানে অভিনেতারা স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করবেন। তরুণ অভিনেতাদের কাছ থেকে মানসিকভাবে কী প্রত্যাশা করা হচ্ছে, তা অনেকেই পুরোপুরি বুঝতে পারেন না।"
পর্দার বাইরেও প্যানেটিয়ারের সক্রিয় ভূমিকা ছিল প্রশংসনীয়। তিনি সামুদ্রিক প্রাণীর সংরক্ষণ, কিশোরী বয়সে গর্ভধারণ প্রতিরোধ এবং পারিবারিক সহিংসতার বিরুদ্ধে সোচ্চার ছিলেন। ২০১৩ সালে তৎকালীন বাগদত্তা ভ্লাদিমির ক্লিচকোকে সঙ্গে নিয়ে ইউক্রেনের কিয়েভে ইউরোমাইদান বিক্ষোভে অংশ নিয়েছিলেন তিনি। তাঁর মৃত্যুর পরপরই পশু অধিকার সংস্থা পেটা (PETA) একটি প্রচারণামূলক ভিডিও প্রকাশ করে, যেখানে প্যানেটিয়ারকে সামুদ্রিক পার্কগুলো বয়কট করার আহ্বান জানাতে দেখা যায়।
নিজের মাদকাসক্তি এবং প্রসবোত্তর বিষণ্নতা নিয়ে সবসময়ই খোলামেলা কথা বলতেন এই অভিনেত্রী। গত জুলাই মাসে ‘মোমে’ ম্যাগাজিনকে তিনি বলেছিলেন, "আমি একজন যোদ্ধা। আমি এমন অনেক ট্রমার মধ্য দিয়ে গেছি যা কখনো ভাবিনি, কিন্তু আমি ঘুরে দাঁড়িয়েছি। আমি প্রতিনিয়ত নিজেকে উন্নত করার চেষ্টা করছি এবং প্রতিদিন নিজের সেরাটা দেওয়ার চেষ্টা করছি।"
তারকারাদের এভাবে প্রকাশ্যে কথা বলার চল তৈরি হওয়ার অনেক আগেই হেইডেন একটি কঠিন সত্য বুঝতে পেরেছিলেন। তাঁর বন্ধু ও অভিনেত্রী অ্যালিসা মিলানো ইনস্টাগ্রামে এক শ্রদ্ধাজ্ঞাপনে লিখেছেন, "হেইডেন বুঝতে পেরেছিলেন যে পরিচিতি বা জনপ্রিয়তা কেবল নিজের পাওয়ার বিষয় নয়, একে অন্যের কল্যাণে বিলিয়ে দেওয়া যায়। তিনি বারবার নিজের পরিচিতিকে বৃহত্তর স্বার্থে ব্যবহার করেছেন।" আর প্যানেটিয়ার নিজেও বিশ্বাস করতেন এই লড়াইয়ের মূল্য আছে। তিনি বলেছিলেন, "আমি আশা করি যাওয়ার আগে এই পৃথিবীকে আগের চেয়ে কিছুটা হলেও সুন্দর করে রেখে যেতে পারব।"
