ট্রাম্পের সঙ্গে আলোচনা বর্জন কার্নির, চরম বাণিজ্য যুদ্ধে জড়াল যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডা

দীর্ঘদিনের মিত্র ও অর্থনৈতিক অংশীদার যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডা এখন এক অভূতপূর্ব পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছে। দশকের পর দশক ধরে অবাধ বাণিজ্য উপভোগ করা এই দুই প্রতিবেশী দেশ এখন এমন এক ক্রমবর্ধমান বাণিজ্য যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েছে, যা থেকে সহজে বেরিয়ে আসার কোনো পথ দেখা যাচ্ছে না।

হোয়াইট হাউসের সাথে চলমান আলোচনা টেবিল থেকে প্রথম কোনো বিশ্বনেতা হিসেবে নিজেকে প্রত্যাহার করে নিয়েছেন কানাডার প্রধানমন্ত্রী কার্নি। তাঁর এই সিদ্ধান্তের ফলে যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে আরও ছাড় পাওয়ার জন্য কানাডাবাসী কতটা অর্থনৈতিক ক্ষতি মেনে নিতে প্রস্তুত, তা এখন বড় পরীক্ষার মুখে পড়বে।

শনিবার এক বক্তব্যে কার্নি তাঁর এই পদক্ষেপের পক্ষে জোরালো অবস্থান নিয়ে বলেন, "আমরা অত্যন্ত আত্মবিশ্বাসের সাথে এই পদক্ষেপ নিয়েছি যে এটি কানাডার সর্বোত্তম স্বার্থ রক্ষা করবে।" একই সঙ্গে তিনি শেষ মুহূর্তে চুক্তিতে বড় পরিবর্তনের চেষ্টা করার জন্য যুক্তরাষ্ট্রকে অভিযুক্ত করে একে তাদের "ক্ষমতার খেলা" বলে অভিহিত করেন। দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য যুদ্ধ শুরু হয়েছে কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি সরাসরি বলেন, "যখন আপনার ওপর হামলা হয়, তখন আপনি যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েন—আমাদের ওপর হামলা চালানো হয়েছে।" এরপর ফরাসিতে দেওয়া বক্তব্যে তিনি যোগ করেন, এই অনাকাঙ্ক্ষিত বাণিজ্য বিরোধ তাদের পছন্দ ছিল না। তিনি বলেন, "কানাডা শক্তিশালী, কানাডা প্রস্তুত এবং কানাডা ঐক্যবদ্ধ।"

এই বাণিজ্য যুদ্ধের আঁচ সীমান্তের উভয় পাশেই লাগবে এবং মার্কিন শুল্ক ও কানাডার পাল্টা শুল্কের কারণে ব্যবসা-বাণিজ্য ব্যাপক চাপের মুখে পড়বে। কানাডা তার মোট রপ্তানির প্রায় ৭০ শতাংশই যুক্তরাষ্ট্রে পাঠিয়ে থাকে। অন্য দিকে, মিশিগান, কেনটাকি, ইন্ডিয়ানা এবং ওহাইও-সহ বেশ কয়েকটি মার্কিন অঙ্গরাজ্যের শীর্ষ বাণিজ্য অংশীদার হলো কানাডা, যার ফলে এই রাজ্যগুলো সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে।

ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতির অর্থনৈতিক চাপের মুখে কানাডার স্বার্থ রক্ষায় কার্নি শুরু থেকেই আগ্রাসী অবস্থান নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছিলেন। আইস হকি খেলার পরিভাষা ব্যবহার করে তিনি একে ‘এলবোস আপ’ (কনুই উঁচিয়ে আগ্রাসী হওয়া) হিসেবে বর্ণনা করেছিলেন। জনমত জরিপ অনুযায়ী, বহু কানাডিয়ানও এই লড়াইয়ে সরকারের পাশে দাঁড়াতে প্রস্তুত। ‘অ্যাবাকাস ডেটা’র সাম্প্রতিক এক জরিপে দেখা গেছে, প্রায় ৩৬ শতাংশ কানাডিয়ান মার্কিন শুল্কের বিরুদ্ধে পাল্টা ব্যবস্থা নেওয়ার পক্ষে। অন্যদিকে, ‘লেজার’ নামক আরেকটি জরিপ বলছে, ৫৬ শতাংশ কানাডিয়ান চান সরকার কোনো ধরনের ছাড় না দিয়ে কঠোর অবস্থান বজায় রাখুক।

মার্কিন শুল্কের ওপর ক্ষুব্ধ হয়ে অনেক কানাডিয়ান ইতিমধ্যেই যুক্তরাষ্ট্রে ভ্রমণ বর্জন শুরু করেছেন। এই বর্জনের কারণে গত বছর যুক্তরাষ্ট্র প্রায় ৩.৩ বিলিয়ন কানাডিয়ান ডলার (২.৩৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বা ১.৭৫ বিলিয়ন পাউন্ড) ভ্রমণ রাজস্ব হারিয়েছে। এছাড়া কানাডার অধিকাংশ প্রদেশে দোকানপাট থেকে মার্কিন অ্যালকোহল বা মদ সরিয়ে ফেলার সিদ্ধান্ত মার্কিন পানীয় খাতকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। মার্কিন সরকারের বাণিজ্য তথ্য অনুযায়ী, কানাডায় মার্কিন ওয়াইন রপ্তানি আগের বছরের তুলনায় ৭৮ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে, যার আর্থিক মূল্য প্রায় ৩৫৭ মিলিয়ন ডলার। মার্কিন ডিস্টিলার অ্যাসোসিয়েশনও একই ধরনের তথ্য দিয়ে জানিয়েছে, প্রাদেশিক নিষেধাজ্ঞার কারণে মার্কিন স্পিরিট বা অ্যালকোহল রপ্তানি ৭০ শতাংশের বেশি কমে গেছে, যা ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য বড় ক্ষোভের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

এই পরিস্থিতিতে প্রধানমন্ত্রী কার্নিকে এখন সেই সব প্রদেশকেও বোঝাতে হবে যারা এই বাণিজ্য বিরোধে তুলনামূলকভাবে কম ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। আলোচনা থেকে সরে আসার এই ঝুঁকি নেওয়া কেন জরুরি, তা ব্যাখ্যা করতে শনিবার তিনি প্রাদেশিক নেতাদের সাথে এক বৈঠকে বসেন।

শেষ মুহূর্তে আলোচনা কীভাবে ভেঙে গেল তা এখনও পুরোপুরি স্পষ্ট নয়। তবে ট্রাম্প প্রশাসনের ওপর ক্ষোভ উগরে দিয়ে কার্নি একটি তীক্ষ্ণ মন্তব্য করেন, "আমরা বুঝি যে মাঝেমধ্যে তাদের স্বাক্ষর পেনসিল দিয়ে লেখা হয়।" অন্যদিকে, মার্কিন বাণিজ্য প্রতিনিধি জেমিসন গ্রিয়ার কানাডার বিরুদ্ধে "নতুন দাবি উত্থাপন এবং আগের প্রতিশ্রুতি থেকে সরে আসার" অভিযোগ এনেছেন। শুক্রবার যুক্তরাষ্ট্রের ‘ডিস্টিল্ড স্পিরিটস কাউন্সিল’ এক বিবৃতিতে ইঙ্গিত দেয় যে, কানাডার প্রদেশগুলো দোকানপাটে মার্কিন স্পিরিট ফিরিয়ে নিতে অস্বীকৃতি জানানোই এই পরিণতির জন্য দায়ী। ওন্টারিও এবং কুইবেক প্রদেশ এখনও মার্কিন মদ বর্জনের সিদ্ধান্ত প্রত্যাহারের বিষয়ে কোনো সবুজ সংকেত দেয়নি।

গত সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে একটি অন্তর্বর্তীকালীন বাণিজ্য চুক্তির বিস্তারিত তথ্য ফাঁসের পর কিছু প্রাদেশিক নেতা, শিল্প গোষ্ঠী এবং রাজনৈতিক বিরোধীরা আশঙ্কা প্রকাশ করেছিলেন যে প্রধানমন্ত্রী তাঁর প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী লড়াই করতে পারছেন না। তবে শনিবার কার্নির আলোচনা থেকে সরে আসার সিদ্ধান্তকে সমর্থন জানিয়ে ফোর্ড বলেন, "কানাডা এমন একতরফা শুল্ক মেনে নিতে পারে না যা আমাদের দেশকে শিল্পহীন করে তুলবে।" ওন্টারিও প্রদেশটি তাদের বৃহৎ উৎপাদন ও মোটরযান খাতের কারণে এই বাণিজ্য বিরোধে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। আলোচনা ভেঙে যাওয়ার পর ফোর্ড আরও বলেন, "একটি জোরালো জবাবের জন্য প্রধানমন্ত্রীর প্রতি আমার পূর্ণ সমর্থন রয়েছে—শুল্কের বিপরীতে শুল্ক, ডলারের বিপরীতে ডলার।"

এই চুক্তি ভেস্তে যাওয়ার ফলে যুক্তরাষ্ট্র-মেক্সিকো-কানাডা মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (ইউএসএমসিএ) পর্যালোচনাসহ ভবিষ্যৎ আলোচনার ভাগ্য এখন অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে। এখন কার্নি ও পুরো কানাডাকে অপেক্ষা করতে হবে ট্রাম্প এই পদক্ষেপের কী জবাব দেন তা দেখার জন্য।

শিরোনাম :
বিমানের জরুরি পরিস্থিতি কি নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক ভাগ্য বদলাতে পারবে? টাইম ১০০ তালিকায় জাপানের প্রথম মাতৃত্বকালীন ছুটিতে যাওয়া মেয়র ব্রাজিলে ফ্যাসিবাদ রুখতে আমিই একমাত্র ভরসা: রিওতে লুলার বিশাল সমাবেশ বাংলাদেশ জাতীয় দলের সহকারী কোচ হলেন মালিবাংওয়ে মাকেতা ভিসা জটিলতায় সাংবাদিকতা প্রোগ্রামে ভর্তি স্থগিত করল কলাম্বিয়া ইউনিভার্সিটি স্পেনে আটক মিয়ানমার আমেরিকান চেম্বারের সাবেক বোর্ড সদস্য চলতি মাসেই খুলছে মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার, শুরু হয়েছে চাহিদাপত্র পাওয়ার প্রক্রিয়া রোমান রেইন্সের মুখোমুখি হওয়ার আগে নিজের মানসিক প্রস্তুতি জানালেন এলএ নাইট মেম কয়েন ইভেন্টে ট্রাম্পের নৈশভোজ, থাকছে স্বর্ণের ঘড়িসহ বিশেষ উপহার ভোটার তালিকা নিয়ে বিতর্ক: ভারতে ফের পথে ‘ককরোচ’ আন্দোলন বিমানের জরুরি পরিস্থিতি কি নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক ভাগ্য বদলাতে পারবে? টাইম ১০০ তালিকায় জাপানের প্রথম মাতৃত্বকালীন ছুটিতে যাওয়া মেয়র ব্রাজিলে ফ্যাসিবাদ রুখতে আমিই একমাত্র ভরসা: রিওতে লুলার বিশাল সমাবেশ বাংলাদেশ জাতীয় দলের সহকারী কোচ হলেন মালিবাংওয়ে মাকেতা ভিসা জটিলতায় সাংবাদিকতা প্রোগ্রামে ভর্তি স্থগিত করল কলাম্বিয়া ইউনিভার্সিটি স্পেনে আটক মিয়ানমার আমেরিকান চেম্বারের সাবেক বোর্ড সদস্য চলতি মাসেই খুলছে মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার, শুরু হয়েছে চাহিদাপত্র পাওয়ার প্রক্রিয়া রোমান রেইন্সের মুখোমুখি হওয়ার আগে নিজের মানসিক প্রস্তুতি জানালেন এলএ নাইট মেম কয়েন ইভেন্টে ট্রাম্পের নৈশভোজ, থাকছে স্বর্ণের ঘড়িসহ বিশেষ উপহার ভোটার তালিকা নিয়ে বিতর্ক: ভারতে ফের পথে ‘ককরোচ’ আন্দোলন