ইমাম হোসাইন (রা.) ছিলেন রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর অত্যন্ত প্রিয় নাতি। নবীজির ইন্তেকালের মাত্র ৫০ বছর পর, এক অসম যুদ্ধে নানাজানের উম্মতের হাতেই তিনি নির্মমভাবে শাহাদত বরণ করেন। এই বিয়োগান্ত ঘটনা মুসলিম উম্মাহকে যুগে যুগে শোকাহত করে রেখেছে। বাংলা সাহিত্য ও কাব্যেও এই শোকের প্রতিধ্বনি প্রবল। নজরুল কাব্যে কারবালার বিয়োগান্ত ঘটনার উল্লেখ পাওয়া যায়, আবার মীর মশররফ হোসেনের 'বিষাদ সিন্ধু'র কারবালা প্রতি বছর মহররম এলে মানুষের মনে নতুন করে শোক জাগিয়ে তোলে।
প্রতি বছর ১০ মহররম জাতীয় ছুটির দিন হিসেবে পালিত হয়। বিভিন্ন মাধ্যমে জাতীয় নেতারা ইমাম হোসাইনের আত্মত্যাগের স্মরণে বাণী দেন। তাদের মতে, ইমাম হোসাইন সত্য ও ন্যায়ের জন্য নিজের জীবন উৎসর্গ করেছেন এবং কখনোই অসত্যের সামনে মাথা নত করেননি। মূলত ইরাকের ফোরাত নদীর তীরে কারবালা প্রান্তরে ইসলাম প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যেই তিনি শাহাদতের এই নজরানা পেশ করেছিলেন। মওলানা মুহাম্মদ আলি জরহরের উর্দু কবিতার সেই বিখ্যাত পঙক্তিটি আজও প্রাসঙ্গিক—'ইসলাম জিন্দা হোতা হে হার কারবালা কে বাদ', যার অর্থ প্রতিটি কারবালার পরেই ইসলাম নতুন প্রাণ ফিরে পায়।
ইসলামের ইতিহাসে প্রতিটি বিপর্যয়ের পরেই মুসলমানরা ঘুরে দাঁড়িয়েছে এবং নতুন শক্তির সঞ্চার হয়েছে। তবে ইমাম হোসাইনের শাহাদতের প্রেক্ষাপট নিয়ে গভীরভাবে ভাবার অবকাশ রয়েছে। সে সময় তো নামাজ, রোজা ও হজের মতো নিয়মিত ইবাদতগুলো যথাযথভাবে পালিত হতো। মক্কা, মদিনা, কুফা বা দামেস্কে প্রচলিত ইসলামের বিরুদ্ধে বড় কোনো সংকট ছিল না। এরপরও কেন তাকে মদিনা থেকে মক্কা এবং পরে কারবালায় যেতে হলো? কেন তার পবিত্র মাথা মোবারক অপমানের শিকার হলো? এই প্রশ্নগুলো সেই সত্য ও ন্যায়ের স্বরূপ উন্মোচনে গুরুত্বপূর্ণ, যার জন্য তিনি সপরিবারে জীবন দিয়েছিলেন।
প্রকৃতপক্ষে, ইমাম হোসাইন (রা.) ইসলামি রাষ্ট্র, খেলাফত এবং উম্মাহর ভবিষ্যৎ নিয়ে গভীরভাবে চিন্তিত ছিলেন। তিনি এমন এক বিপদের ঘনঘটা দেখতে পাচ্ছিলেন যা অন্যরা অনুধাবন করতে পারেননি। তার মূল উৎকণ্ঠা ছিল খেলাফতের মতো রাষ্ট্রীয় নেতৃত্ব কোনো পাপাচারী, অযোগ্য বা স্বৈরাচারীর হাতে ন্যস্ত হওয়া নিয়ে, যারা আল্লাহ ও রাসুলের নির্ধারিত হালাল-হারামের সীমারেখা লঙ্ঘন করতে দ্বিধাবোধ করত না।

