ভারতের বিতর্কিত সন্ত্রাসবিরোধী আইনে দীর্ঘ দিন বন্দি থাকার পর জামিনে মুক্তি পেয়েছেন কাশ্মীরের বিশিষ্ট মানবাধিকার কর্মী খুররম পারভেজ এবং স্বাধীন সাংবাদিক ইরফান মেহরাজ। তবে মুক্তি পেলেও তাদের ওপর কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে, যার মধ্যে অন্যতম হলো তারা নিজেদের জন্মভূমি কাশ্মীরে ফিরতে পারবেন না।
বুধবার রাতে নয়াদিল্লির একটি কারাগার থেকে তারা মুক্তি পান। ভারতের কেন্দ্রীয় তদন্ত সংস্থা ন্যাশনাল ইনভেস্টিগেশন এজেন্সি (এনআইএ) তাদের জামিন বাতিলের চেষ্টা করলেও আদালত তা নাকচ করে দেয়। তবে দিল্লির হাইকোর্ট তাদের চলাচলের ওপর কঠোর নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে। আদালতের নির্দেশ অনুযায়ী, মামলার বিচার চলাকালীন তাদের ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লিতেই অবস্থান করতে হবে এবং তারা জম্মু-কাশ্মীরে ভ্রমণ করতে পারবেন না।
মানবাধিকার কর্মী খুররম পারভেজ ২০২১ সাল থেকে দীর্ঘ ১,৭০৩ দিন এবং সাংবাদিক ইরফান মেহরাজ ২০২৩ সাল থেকে ১,২১৯ দিন ভারতীয় হেফাজতে অতিবাহিত করেছেন। মানবাধিকার সংস্থাগুলোর দাবি, রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত এবং সাজানো "সন্ত্রাসবাদে অর্থায়ন" এর মামলায় তাদের গ্রেফতার করা হয়েছিল।
জাতিসংঘের মানবাধিকার সংস্থাসহ আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংগঠন দীর্ঘদিন ধরে তাদের মুক্তির দাবি জানিয়ে আসছিল। ২০২৩ সালে জাতিসংঘের ‘আর্বিট্রারি ডিটেনশন’ বিষয়ক ওয়ার্কিং গ্রুপ জানিয়েছিল, খুররম পারভেজের গ্রেফতারি ছিল মূলত তার মানবাধিকার কাজের বিরুদ্ধে একটি প্রতিশোধমূলক পদক্ষেপ এবং কাশ্মীরের সুশীল সমাজকে স্তব্ধ করার চেষ্টা।
খুররম পারভেজ দীর্ঘদিন ধরে জম্মু অ্যান্ড কাশ্মীর কোয়ালিশন অব সিভিল সোসাইটি (জেকেসিসিএস) নামক মানবাধিকার সংগঠনের সাথে যুক্ত। ইরফান মেহরাজও এই সংস্থায় গবেষক হিসেবে কাজ করেছেন। খুররম এশিয়ান ফেডারেশন এগেইনস্ট ইনভলান্টারি ডিসঅ্যাপিয়ারেন্সেস (এএফএডি)-এর চেয়ারম্যান এবং আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা এফআইডিএইচ-এর ডেপুটি সেক্রেটারি-জেনারেল হিসেবেও দায়িত্ব পালন করছেন। ২০২৩ সালে তিনি মর্যাদাপূর্ণ মার্টিন এনালস পুরস্কারে ভূষিত হন। অন্যদিকে, ইরফান মেহরাজ একজন সুপরিচিত স্বাধীন সাংবাদিক, যিনি কাশ্মীরি, ভারতীয় ও আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে কাজ করেছেন। তিনি ‘ওয়ান্দে ম্যাগাজিন’ প্রতিষ্ঠা করেন এবং ‘টুসার্কেলস ডট নেট’-এর সম্পাদক হিসেবে যুক্ত আছেন।
এনআইএ অভিযোগ করেছে যে, এই দুই ব্যক্তি জেকেসিসিএস-এর মাধ্যমে বিদ্রোহী কর্মকাণ্ডে অর্থায়ন এবং স্বাধীনতা-পন্থী প্রচারণায় লিপ্ত ছিলেন। তবে খুররম ও ইরফান উভয়েই এই অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। জেকেসিসিএস কাশ্মীরে ভারতীয় বাহিনীর নির্যাতন এবং সীমান্ত এলাকায় হাজার হাজার অচিহ্নিত গণকবরের বিষয়ে সোচ্চার ভূমিকা পালন করে আসছিল।
প্যারিসভিত্তিক ইন্টারন্যাশনাল ফেডারেশন ফর হিউম্যান রাইটস এবং ওয়ার্ল্ড অর্গানাইজেশন এগেইনস্ট টর্চার তাদের মুক্তির পর এক যৌথ বিবৃতিতে বলেছে, তাদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগগুলো সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন এবং রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। তারা ভারতীয় কর্তৃপক্ষের কাছে সমস্ত অভিযোগ প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছে।
২০১৯ সালের আগস্টে জম্মু-কাশ্মীরের বিশেষ মর্যাদা বাতিল এবং অঞ্চলটিকে সরাসরি দিল্লির শাসনে নেওয়ার পর থেকে সেখানে সাংবাদিক ও অধিকারকর্মীদের ওপর দমন-পীড়ন তীব্র হয়েছে। সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০১৯ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে কাশ্মীরে ৩,৬০০ জনেরও বেশি মানুষকে সন্ত্রাসবিরোধী আইনে গ্রেফতার করা হয়েছে, যাদের অর্ধেকেরও বেশি এখনো কারাগারে বন্দি রয়েছেন। কাশ্মীর নিয়ে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে দীর্ঘদিনের বিরোধ রয়েছে এবং ১৯৮৯ সাল থেকে সেখানে স্বাধীনতার দাবিতে সশস্ত্র লড়াই চলছে। বর্তমানে অঞ্চলটিতে ৫ লাখের বেশি ভারতীয় সেনা মোতায়েন রয়েছে, যা এটিকে বিশ্বের অন্যতম সামরিকায়িত অঞ্চলে পরিণত করেছে।

