পঞ্চম শ্রেণীর প্রথম দিনে ১০ বছর বয়সী শার্লটের বাবা ম্যাথিউ ল্যাঞ্জ-গাইস তার মেয়েকে খাইয়ে-দাইয়ে বাসের জন্য তৈরি করছিলেন। শার্লট কথা বলতে পারে না, তবে স্কুল বাসটি যখন সামনে এসে দাঁড়াল, তখন তার মুখে আনন্দের আভা ফুটে উঠল। শার্লটকে ম্যারিল্যান্ডের বেথেসদা এলিমেন্টারি স্কুলের বাসে তুলে দেওয়ার সময় ম্যাথিউ আশা করছিলেন দিনটি যেন ভালো কাটে। শার্লটের মতো বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুদের জন্য একটি ভালো দিন মানে কোনো ক্ষোভ বা আচরণগত সমস্যা না থাকা এবং সহপাঠীদের সাথে ইতিবাচক যোগাযোগ। তবে এই হাসিমুখের আড়ালে রয়েছে এক দীর্ঘ ও ক্লান্তিকর লড়াইয়ের গল্প। শার্লটের মতো যুক্তরাষ্ট্রের লাখ লাখ বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুর পরিবার এখন উপযুক্ত স্কুলের খোঁজে চরম সংকটের মুখোমুখি হচ্ছে।
শার্লট ওগডেন সিন্ড্রোম নামের একটি বিরল রোগে আক্রান্ত, যা মারাত্মক মানসিক ও শারীরিক বিকাশজনিত প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে। একই সাথে তার 'পাইকা' নামের একটি খাওয়ার ব্যাধি রয়েছে, যার ফলে সে খাবার নয় এমন যেকোনো বস্তু মুখে দেওয়ার চেষ্টা করে। চিকিৎসকদের মতে, শার্লটের মানসিক বয়স বর্তমানে ১২ থেকে ১৮ মাস বয়সী শিশুর সমান এবং সারাজীবন এমনই থাকবে। তার সার্বক্ষণিক তদারকি প্রয়োজন। ম্যারিল্যান্ডের স্থানীয় পাবলিক স্কুল ডিস্ট্রিক্ট কয়েক মাস আগেই শার্লটকে একটি বেসরকারি আবাসিক বিশেষায়িত স্কুলে পাঠানোর পরামর্শ দিয়েছিল। কিন্তু তার বাবা-মা ক্রিস্টিনা হার্টম্যান ও ম্যাথিউ ল্যাঞ্জ-গাইস উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় সাতটি আবাসিক স্কুলের সাথে যোগাযোগ করেও কোনো আসন পাননি। কর্মী সংকট এবং আসন খালি না থাকায় সব স্কুলই শার্লটকে ফিরিয়ে দিয়েছে।
ন্যাশনাল সেন্টার ফর এডুকেশন স্ট্যাটিস্টিকসের তথ্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রে প্রায় ৭৫ লাখ বিশেষ শিক্ষা গ্রহণকারী শিক্ষার্থী রয়েছে। এদের বেশিরভাগই সাধারণ স্কুলে পড়াশোনা করলেও, শার্লটের মতো গুরুতর জটিলতায় আক্রান্ত শিশুদের জন্য বিশেষায়িত আবাসিক স্কুল অত্যন্ত প্রয়োজন। তবে দেশটিতে এ ধরনের প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা অত্যন্ত সীমিত। বেসরকারি বিশেষায়িত স্কুল পরিচালনাকারী সংস্থা মেলমার্ক-এর প্রধান নির্বাহী রিতা গার্ডনার জানান, এই স্কুলগুলোতে সাধারণ স্কুলের মতো নিয়মিত শিক্ষার্থীরা পাস করে বের হয় না, ফলে নতুন আসন খালি হওয়া খুবই কঠিন। কোনো কোনো পরিবারকে মেলমার্কের একটি আসনের জন্য সাত বছর পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়েছে।
অনুরূপ সংকটের মুখোমুখি হয়েছে ১২ বছর বয়সী টনির পরিবারও। টনি 'সিনগ্যাপ১' (SYNGAP1) নামের রোগে আক্রান্ত, যার ফলে তার তীব্র খিঁচুনি ও আচরণগত সমস্যা দেখা দেয়। টনির বাবা অ্যান্থনি গ্রাগলিয়া ও মা অ্যাশলে ইভান্স জানান, আগ্রাসী আচরণের কারণে স্থানীয় একটি বিশেষায়িত ডে-স্কুল টনিকে বাদ দিয়ে দেয়। এরপর দীর্ঘ সময় টনি ঘরেই ছিল। চাকরিজীবী বাবা-মার পক্ষে তার সার্বক্ষণিক যত্ন নেওয়া কঠিন হয়ে পড়েছিল। অবশেষে একজন বিশেষজ্ঞের পরামর্শে তারা যুক্তরাষ্ট্রের কানসাসের একটি মানসিক আবাসিক চিকিৎসা কেন্দ্রে টনির জন্য আসন পান, যা তাদের বাড়ি থেকে প্রায় ১,৮০০ মাইল দূরে অবস্থিত। ২০২৬ সালের এপ্রিলে টনি সেখানে ভর্তি হয়। তবে এত ছোট শিশুকে বাড়ি থেকে দূরে রেখে আসা তাদের জন্য অত্যন্ত বেদনাদায়ক ছিল। টনির বাবা জানান, ২০২৬-২৭ শিক্ষাবর্ষের শেষ পর্যন্ত টনিকে সেখানে রাখার পরিকল্পনা করছেন তারা, যাতে তার আচরণের উন্নতি হলে বাড়ির কাছাকাছি কোনো স্কুলে আনা যায়।
শার্লটের ক্ষেত্রে মূল অগ্রাধিকার হলো নিরাপত্তা। শার্লটের স্পিচ ল্যাঙ্গুয়েজ প্যাথলজিস্ট জেসমিন প্রিচেট জানান, শার্লট সবকিছু মুখে দেওয়ার চেষ্টা করায় তার সার্বক্ষণিক নজরদারি প্রয়োজন। শার্লটের বাবা-মা জানান, তারা তাদের মেয়েকে ঘরের বাইরে রেখে অন্য কোথাও পাঠাতে চাননি। কিন্তু স্থানীয় কোনো বিশেষায়িত ডে-স্কুলে তারা জায়গা পাননি। মন্টগোমারি কাউন্টি পাবলিক স্কুলস কর্তৃপক্ষ ফেডারেল শিক্ষা অধিকার ও গোপনীয়তা আইনের কারণে শার্লটের বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হয়নি। ২০১৫ সালের শেষের দিকে শার্লটের দীর্ঘদিনের কেয়ারগিভার চলে যাওয়ার পর নতুন দক্ষ কর্মী পাওয়া তাদের জন্য দুঃস্বপ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে। ২৩ বছর বয়সী হ্যাথওয়ে প্যাকার্ড ২০২৫ সালের নভেম্বরে শার্লটের সাথে কাজ শুরু করেন। তিনি জানান, শার্লটের আচরণ সামলানো অত্যন্ত চ্যলেঞ্জিং, কারণ সে কথা বলে নিজের মনের ভাব প্রকাশ করতে পারে না।
যুক্তরাষ্ট্রের এই বিশেষ যত্ন ব্যবস্থার বড় একটি দুর্বলতা হলো এর বিক্ষিপ্ত অর্থায়ন ও লাইসেন্সিং প্রক্রিয়া। শৈশব থেকে শুরু করে প্রাপ্তবয়স্ক হওয়া পর্যন্ত প্রতিটি স্তরের সেবামূলক কার্যক্রম ভিন্ন ভিন্ন নিয়মে পরিচালিত হয়। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শৈশবেই সঠিক শিক্ষা ও যত্ন না পেলে এই শিশুরা পরবর্তীতে আরও বেশি পরনির্ভরশীল হয়ে পড়ে, যা সমাজের ওপর দীর্ঘমেয়াদে বড় অর্থনৈতিক চাপ সৃষ্টি করে। শার্লট ও টনির মতো শিশুদের ভবিষ্যৎ নিয়ে তাদের বাবা-মায়েরা প্রতিনিয়ত শঙ্কিত থাকেন। শার্লটের মা ক্রিস্টিনা হার্টম্যান বলেন, "আমি শুধু জানতে চাই, আমরা যখন থাকব না, তখন তার যত্ন কে নেবে? সে তো মানসিকভাবে আর বড় হবে না।" টনির বাবাও একই শঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, তাদের ৮ বছর বয়সী ছোট ছেলে এখনই জানে যে তাকে সারাজীবন তার ভাইয়ের যত্ন নিতে হবে। আর্থিক সামর্থ্য থাকার পরও এই সংকটের সমাধান না হওয়াকে যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ শিক্ষা ব্যবস্থার একটি বড় ব্যর্থতা হিসেবে দেখছেন ভুক্তভোগী পরিবারগুলো।

