অ্যান কারসনের সাহিত্যকর্ম নিয়ে একটি সংক্ষিপ্ত নিবন্ধ লেখার অনুরোধ গ্রহণ করাটা ছিল এক অসম্ভব চ্যালেঞ্জ। এটি অনেকটা গণিতের শূন্যকে শূন্য দিয়ে ভাগ করার মতো একটি জটিল ও অবাস্তব কাজ। কারসনের কাজ নিয়ে লিখতে গিয়ে প্রতিটি শব্দই যেন অপর্যাপ্ত মনে হয়, বিশেষ করে যখন কেউ জীবনের চরমতম শোক বা ব্যক্তিগত ক্ষতির মধ্য দিয়ে যান। আমার ক্ষেত্রেও বিষয়টি তেমনই, যেখানে আমার সন্তানদের হারানোর মতো গভীর বেদনা রয়েছে।
কারসনের রচনার শক্তির উৎস হলো শব্দের ওপর তাঁর নিয়ন্ত্রণহীন স্বাধীনতা। তিনি শব্দের ওপর কোনো প্রভুত্ব কায়েম করতে চান না, বরং শব্দগুলোকে তাদের নিজস্ব ইচ্ছায় ছেড়ে দেন। কারসনের রচনায় শব্দগুলো যেন যন্ত্রণায় আর্তনাদ করে, আবার কখনো রহস্যময় হাসিতে ধাঁধা তৈরি করে। তিনি প্রাচীন গ্রিক লেখকদের কাজকে অবিস্মরণীয় ইংরেজিতে অনুবাদ করেছেন, যা তাঁর নিজস্ব রচনার মতোই অনন্য।
বিশ্বের সব মানুষকে যদি শব্দের সমষ্টি হিসেবে কল্পনা করা হয়, তবে অ্যান কারসনের লেখাগুলো সেই ভিড়ে অনায়াসেই আলাদা করা সম্ভব। তাঁর লেখায় নিয়মের সীমাবদ্ধতা ভেঙে এক নতুন জগতের সৃষ্টি হয়েছে। তাঁর প্রতিটি লাইন পাঠককে নিজেকে নতুন করে বুঝতে সাহায্য করে। আমি গত ২০ বছর ধরে শিক্ষার্থীদের কারসনের কাজ পড়াচ্ছি, কিন্তু তাঁকে শেখানো সম্ভব নয়। আমি কেবল তাঁর কাজগুলো নতুন প্রজন্মের হাতে তুলে দিই, এই বিশ্বাসে যে, তাদের মধ্যে কেউ না কেউ তাঁর কাজের সঙ্গে একাত্ম হতে পারবে।
অ্যান কারসন যে নোবেল বিজয়ী হয়েছেন, সেই খবরটি পাওয়ার পর আমি আমার বইয়ের তাক থেকে তাঁর বইগুলো ডেস্কে নিয়ে আসি। তখনই খেয়াল করলাম, আমার জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বইটি সেখানে নেই—'গ্রিফ লেসনস', যেখানে তিনি ইউরিপিদিসের চারটি নাটক অনুবাদ করেছেন। ২০১৭ সালে আমার বড় ছেলে ভিনসেন্টের মৃত্যুর পর এবং পরে ছোট ছেলে জেমসের মৃত্যুর পর সেই বইটিই আমার বেঁচে থাকার শক্তি জুগিয়েছিল। কারসনের শব্দগুলো কেবল সাহিত্য নয়, বরং জীবন টিকিয়ে রাখার এক মাধ্যম।
অ্যান কারসনের নোবেল প্রাপ্তি এক আনন্দদায়ক সংবাদ। এটি সঠিক ও ন্যায়সঙ্গত স্বীকৃতি। এই পুরস্কার তাঁর অসীম প্রতিভাকে নতুন করে সামনে নিয়ে এসেছে, তবে তাঁর সেই প্রতিভার প্রকৃত গভীরতা বুঝতে হলে কেবল তাঁর যেকোনো বইয়ের একটি পৃষ্ঠা উল্টে দেখাই যথেষ্ট।

