মরণঘাতী মোটর নিউরন ব্যাধি এএলএস (অ্যামায়োট্রফিক ল্যাটারাল স্ক্লেরোসিস) কেড়ে নিয়েছে তাঁর কথা বলার শক্তি, শরীরকেও করে ফেলেছে প্রায় অচল। তবে এই কঠিন পরিস্থিতিতেও বেঁচে থাকার এবং লড়াই চালিয়ে যাওয়ার শক্তি পাচ্ছেন সন্তানদের কাছ থেকে। টেনিসি টাইটান্সের সাবেক তারকা এবং এনএফএল কিংবদন্তি ক্রিস জনসন তাঁর সন্তানদের উদ্দেশ্যে লিখেছেন এক আবেগঘন খোলা চিঠি। গত ১০ সেপ্টেম্বর (বৃহস্পতিবার) ‘প্লেয়ার্স ট্রিবউন’-এ চিঠিটি প্রকাশিত হয়। চিঠিতে জনসন তাঁর এই রোগ ধরা পড়ার পর থেকে গত ১৮ মাসের শারীরিক ও মানসিক লড়াইয়ের অভিজ্ঞতা তুলে ধরেছেন।
সাবেক এই রানিং ব্যাক জানান, ২০২৫ সালের মার্চ মাসে একটি সড়ক ভ্রমণের সময় প্রথমবার তিনি শারীরিক সমস্যা টের পান। সে সময় একটি পানির বোতল তাঁর কাছে অস্বাভাবিক রকমের ভারী মনে হয়েছিল। এরপর একাধিক চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়ার পর তাঁর এএলএস রোগটি শনাক্ত হয়। এই অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ নিয়ে তিনি এবং তাঁর স্ত্রী কতটা আতঙ্কিত ছিলেন, চিঠিতে সেই স্মৃতিও রোমন্থন করেছেন জনসন। এই রোগটি 'লাউ গেহরিগস ডিজিজ' নামেও পরিচিত।
২০২৬ সালের ২৯ জুন এবিসির ‘গুড মর্নিং আমেরিকা’ অনুষ্ঠানে সাবেক এনএফএল তারকা মাইকেল স্ট্রাহানের সঙ্গে সাক্ষাৎকারে নিজের এই রোগের কথা প্রথম প্রকাশ করেন জনসন। ততদিনে তিনি কথা বলার শক্তি পুরোপুরি হারিয়ে ফেলেছিলেন। সাক্ষাৎকারে কথা বলার জন্য তাঁকে চোখের ইশারায় নিয়ন্ত্রিত একটি বিশেষ কম্পিউটার প্রোগ্রাম ব্যবহার করতে হয়েছিল, যা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তির সাহায্যে তাঁর নিজস্ব কণ্ঠস্বর তৈরি করে কথা বলে।
চিঠিতে জনসন লিখেছেন, "এই মুহূর্তে আমার জীবনের প্রায় প্রতিটি অংশই বদলে গেছে। তোমরা প্রতিদিন তা দেখতে পাচ্ছ। তবে অনেক কিছু এখনো আগের মতোই আছে এবং সেগুলোর দিকে মনোযোগ দেওয়াই আমাকে মানসিকভাবে শক্ত রাখছে। আমার আসল পরিচয় কিন্তু বদলে যায়নি। এএলএস আমাকে অনুধাবন করতে বাধ্য করেছে যে, আমার শরীর যা করতে পারে, আমার পরিচয় তার চেয়ে অনেক বড়। একজন মানুষ হিসেবে আমার মূল্য সেখানেই, যে ব্যক্তিত্ব নিয়ে আমি প্রতিদিন সকালে ঘুম থেকে উঠি।"
জনসন তাঁর চার সন্তানের প্রত্যেকের জন্য আলাদা বার্তা রেখে গেছেন এবং তাদের নিজেদের মতো করে ‘ফুটবল যাত্রা’ গড়ে তুলতে উৎসাহিত করেছেন। কঠিন এই সময়ে পরিবার হিসেবে সবাইকে একসঙ্গে থাকার গুরুত্ব মনে করিয়ে দিয়ে তিনি আশা প্রকাশ করেন, সন্তানদের শিক্ষা সমাপন, বিয়ে এবং তাদের নিজেদের পরিবার গড়ে তোলার মতো জীবনের বড় মাইলফলকগুলো দেখার জন্য তিনি দীর্ঘদিন বেঁচে থাকবেন। প্রতিকূলতার মধ্যেও তাঁর সন্তানরা যেভাবে স্বাভাবিক আচরণ বজায় রেখেছে, সেজন্য তাদের প্রতি গভীর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন সাবেক এই গতিদানব, যিনি একসময় ৪০-ইয়ার্ড ড্যাশের রেকর্ডধারী ছিলেন। তিনি লিখেছেন, "সেই ছোট ছোট মুহূর্তগুলোতে আমি বাকি সব ভুলে যেতে পারি, কারণ আমার মনে হয় তোমরা এএলএস-কে পাত্তাই দিচ্ছ না।"
নিজের রোগ নিয়ে জনসন বলেন, "আমি চাই মানুষ জানুক যে আমি এখনো আগের মতোই আছি। এএলএস আমার শরীরের ক্ষমতা বদলে দিয়েছে, কিন্তু আমার সত্ত্বাকে নয়। আমার গল্প যদি একজনকে দ্রুত রোগ শনাক্ত করতে সাহায্য করে, গবেষণায় অনুপ্রেরণা জোগায় কিংবা কোনো পরিবারকে আশার আলো দেখায়, তবেই আমার এই প্রচেষ্টা সার্থক।" রোগটি জনসমক্ষে প্রকাশের পরপরই তিনি ম্যাসাচুসেটস জেনারেল হাসপাতালের 'শন এম হিলি অ্যান্ড এএমজি সেন্টার ফর এএলএস'-এর তহবিল সংগ্রহের জন্য একসময়ের ভাইরাল 'এএলএস আইস বাকেট চ্যালেঞ্জ' পুনরায় চালুর উদ্যোগ নেন। ১০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত তাঁর এই প্রচারণার মাধ্যমে ২ লাখ ৩৮ হাজার মার্কিন ডলারের বেশি অর্থ সংগ্রহ করা হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব হেলথ (এনআইএইচ) এবং ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরোলজিক্যাল ডিসঅর্ডারস অ্যান্ড স্ট্রোকের তথ্য অনুযায়ী, এএলএস একটি ক্ষয়জনিত রোগ যা মস্তিষ্ক এবং মেরুদণ্ডের মোটর নিউরন বা স্নায়ুকোষগুলোকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। এই কোষগুলোই মানুষের পেশির স্বেচ্ছাধীন চলাচল এবং শ্বাস-প্রশ্বাস নিয়ন্ত্রণ করে। এএলএস-এর কারণে পেশিগুলো ধীরে ধীরে দুর্বল হতে থাকে এবং একপর্যায়ে কথা বলা, খাওয়া ও শ্বাস নেওয়ার ক্ষমতা নষ্ট হয়ে যায়, যা রোগটিকে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেয়। বর্তমানে এই রোগের কোনো নিরাময় নেই, তবে কিছু চিকিৎসা এর গতি ধীর করতে পারে। আক্রান্তদের বেশিরভাগই প্রথম লক্ষণ প্রকাশের ৩ থেকে ৫ বছরের মধ্যে মারা যান, আর প্রতি ১০ জনের মধ্যে মাত্র একজন ১০ বছরের বেশি সময় বেঁচে থাকেন।
এদিকে, গত ৮ জুলাই 'ইক্লিনিক্যালমেডিসিন' সাময়িকীতে প্রকাশিত একটি গবেষণায় দেখা গেছে, সাবেক এনএফএল খেলোয়াড়দের স্নায়ুক্ষয়জনিত রোগে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুর ঝুঁকি সাধারণ মানুষের চেয়ে প্রায় চার গুণ বেশি।
