আফগানিস্তান ক্রিকেট বোর্ডের (এসিবি) নবনিযুক্ত হাই পারফরম্যান্স সেন্টারের (এইচপিসি) ম্যানেজার দৌলত আহমাদজাই দেশটির হাই-পারফরম্যান্স ব্যবস্থার বিকেন্দ্রীকরণকে তার সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। কাবুলের বাইরে আঞ্চলিক এইচপিসি কেন্দ্র স্থাপন করাই এখন তার মূল লক্ষ্য। এত দিন কাবুলে অবস্থিত এইচপিসি মূলত খেলোয়াড়দের অনুশীলন ক্যাম্প এবং দক্ষতা উন্নয়নের কাজ করত, তবে সাবেক এই আফগান অলরাউন্ডার এখন এই সুযোগ-সুবিধা রাজধানীর বাইরে সারা দেশে ছড়িয়ে দিতে চান।
ক্রিকবাজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে দৌলত আহমাদজাই বলেন, এইচপিসির দায়িত্ব নেওয়ার পর তার প্রথম অগ্রাধিকার ছিল একটি স্পষ্ট, পেশাদার এবং টেকসই হাই-পারফরম্যান্স ব্যবস্থা গড়ে তোলা। গত ২৬ বছর ধরে আফগানিস্তান ক্রিকেটের বিভিন্ন দায়িত্বে কাজ করার সুবাদে তিনি এই ক্রিকেটকে ভেতর থেকে খুব ভালোভাবে বোঝেন। সেই অভিজ্ঞতার ওপর ভিত্তি করেই তিনি শীর্ষ ম্যানেজমেন্টের কাছে প্রস্তাব দিয়েছেন যেন এইচপিসিকে কেবল একটি সাধারণ অনুশীলন কেন্দ্র হিসেবে না রেখে খেলোয়াড় তৈরির একটি সুগঠিত প্রক্রিয়ার মূল অংশ করা হয়।
দৌলত আহমাদজাই মনে করেন, শুধু প্রতিভা থাকাই যথেষ্ট নয়। তিনি বলেন, আফগানিস্তানে প্রচুর প্রতিভা রয়েছে, কিন্তু শুধু প্রতিভা দিয়ে কিছু হয় না। এমন একটি ব্যবস্থার প্রয়োজন যা শুরুতেই প্রতিভাকে চিহ্নিত করবে, খেলোয়াড়দের ব্যক্তিগত প্রয়োজন অনুযায়ী তাদের গড়ে তুলবে, প্রতিনিয়ত তাদের উন্নতির ওপর নজর রাখবে, চোটের সঠিক ব্যবস্থাপনা করবে এবং আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের শারীরিক, প্রযুক্তিগত, কৌশলগত ও মানসিক চাহিদার জন্য তাদের প্রস্তুত করবে।
তার পরিকল্পনার সবচেয়ে বড় পরিবর্তন হলো আঞ্চলিক এইচপিসি কেন্দ্রগুলোর মাধ্যমে সুযোগ-সুবিধা খেলোয়াড়দের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেওয়া। দৌলত বলেন, আফগানিস্তানের বিভিন্ন অঞ্চলে প্রতিভা ছড়িয়ে আছে। কোচিং, এসঅ্যান্ডসি (স্ট্রেন্থ অ্যান্ড কন্ডিশনিং), স্পোর্টস সায়েন্স, মেডিকেল সাপোর্ট এবং পারফরম্যান্স অ্যানালিসিসের মতো উচ্চমানের সুযোগ-সুবিধাগুলো খেলোয়াড়দের কাছাকাছি নিয়ে যেতে হবে। এটি আঞ্চলিক পর্যায়কে শক্তিশালী করবে এবং দীর্ঘমেয়াদে খেলোয়াড়দের একটি বড় ও টেকসই দল তৈরি করবে।
সাবেক এই জাতীয় নির্বাচক আরও চান যে, জাতীয় দলের খেলোয়াড় নির্বাচন ও তাদের অগ্রগতির প্রক্রিয়ায় এইচপিসিকে আনুষ্ঠানিকভাবে যুক্ত করা হোক। তার মতে, নির্বাচন প্যানেলকে এইচপিসি থেকে খেলোয়াড়দের পারফরম্যান্সের লিখিত প্রতিবেদন দেওয়া উচিত, যাতে জানা যায় যে একজন খেলোয়াড় পরবর্তী স্তরে খেলার জন্য প্রস্তুত কি না, নাকি তার আরও উন্নতির প্রয়োজন রয়েছে বা তাকে মূল এইচপিসি কিংবা আঞ্চলিক কেন্দ্রে রেখে আরও প্রস্তুত করা দরকার।
এইচপিসি যাতে জাতীয় দল থেকে বিচ্ছিন্ন কোনো বিভাগ হিসেবে কাজ না করে, সে বিষয়ে জোর দিয়ে দৌলত বলেন, তার লক্ষ্য হলো এইচপিসি, জাতীয় দল এবং ঘরোয়া ক্রিকেট ব্যবস্থা যেন একটি সমন্বিত পারফরম্যান্স সিস্টেম হিসেবে কাজ করে, যেখানে থাকবে স্পষ্ট যোগাযোগ, যৌথ লক্ষ্য এবং সুনির্দিষ্ট দায়িত্ব। জাতীয় দলের কোচিং ও সাপোর্ট স্টাফদের সাথে নিয়মিত যোগাযোগ বাড়ানোর মাধ্যমে দলের বর্তমান ও ভবিষ্যতের চাহিদাগুলো বুঝতে চান তিনি। জাতীয় দলে কোনো নির্দিষ্ট পজিশন বা দক্ষতার খেলোয়াড়ের ঘাটতি থাকলে এইচপিসি যেন একটি সুনির্দিষ্ট উন্নয়ন কর্মসূচির মাধ্যমে তার সমাধান করতে পারে, সেটাই তার লক্ষ্য।
আফগানিস্তানের ক্রিকেট কাঠামোর ধারাবাহিকতা রক্ষা করাকেও আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হিসেবে দেখছেন দৌলত আহমাদজাই। তিনি বলেন, অনূর্ধ্ব-১৯, ঘরোয়া ক্রিকেট, আফগানিস্তান ‘এ’ দল এবং জাতীয় দলের মধ্যে একটি মজবুত সংযোগ থাকা জরুরি, যাতে একজন খেলোয়াড় এক স্তর থেকে অন্য স্তরে যাওয়ার সময় তার উন্নয়ন প্রক্রিয়া নতুন করে শুরু করতে না হয়। এর জন্য ঘরোয়া কাঠামোতে আরও বেশি বয়সভিত্তিক ক্রিকেট টুর্নামেন্ট আয়োজন এবং আঞ্চলিক পর্যায়ে হাই-পারফরম্যান্স সেন্টার গড়ে তোলার ওপর জোর দেন তিনি।
আগামী তিন থেকে পাঁচ বছরের মধ্যে এই পরিবর্তনগুলো বাস্তবায়নের স্বপ্ন দেখছেন দৌলত। তিনি বলেন, তিনি এমন একটি সংস্কৃতি গড়ে তুলতে চান যেখানে খেলোয়াড়রা নিজেদের পারফরম্যান্সের দায়িত্ব নিজেরা নেবে। এইচপিসি পরিবেশ, দক্ষতা, সম্পদ ও দিকনির্দেশনা দেবে, কিন্তু নিজেদের উন্নয়ন করা খেলোয়াড়দেরই দায়িত্ব। যদি তিন-পাঁচ বছর পর দেখা যায় যে অনেক খেলোয়াড় জাতীয় দলের দরজায় কড়া নাড়ছে, ঘরোয়া ও আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের মানের ব্যবধান কমে এসেছে এবং একটি টেকসই ব্যবস্থা গড়ে উঠেছে, তবেই তিনি একে বড় সাফল্য মনে করবেন।
দৌলত আহমাদজাইয়ের চূড়ান্ত লক্ষ্য কেবল কিছু জাতীয় দলের খেলোয়াড় তৈরি করা নয়, বরং এমন একটি স্থায়ী ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা যা স্বয়ংক্রিয়ভাবে আন্তর্জাতিক মানের ক্রিকেটার তৈরি করতে থাকবে।

