প্রকাশ : ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২২: ৫১ (2026-09-17 22:51)
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নবাব নওয়াব আলী চৌধুরী সিনেট ভবন মিলনায়তনে যৌথভাবে ‘ইউএস কনস্টিটিউশন ডে’ বা আমেরিকান সংবিধান দিবস উদযাপন করেছে বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন অনুষদ ও ঢাকাস্থ মার্কিন দূতাবাস। বৃহস্পতিবার আয়োজিত এ অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের সাংবিধানিক অভিজ্ঞতা, ক্ষমতার পৃথকীকরণ, আইনের শাসন, মৌলিক অধিকার এবং বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেন আমন্ত্রিত অতিথিরা।
অনুষ্ঠানের উদ্বোধনী পর্বে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান। বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রো-ভাইস চ্যান্সেলর (শিক্ষা) অধ্যাপক ড. আবদুস সালাম এবং গেস্ট অব অনার হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত ব্রেন্ট টি. ক্রিসটেনসন। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন আইন অনুষদের ডিন অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ ইকরামুল হক।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধান গণতন্ত্র, স্বাধীনতা ও আইনের শাসনের গুরুত্বপূর্ণ নীতিগুলোকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিয়েছে, যা পরবর্তী সময়ে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সাংবিধানিক কাঠামো ও আইনি ব্যবস্থাকে প্রভাবিত করেছে। তিনি আরও বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধানের সঙ্গে বাংলাদেশের সংবিধানের বিচারিক পর্যালোচনা, ক্ষমতার পৃথকীকরণ, মৌলিক অধিকার ও রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার ওপর সাংবিধানিক নিয়ন্ত্রণের মতো গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রগুলোর তুলনামূলক আলোচনা করা যেতে পারে। সংবিধান ও নাগরিক অধিকার সম্পর্কে জনগণের সচেতনতা বাড়াতে এ ধরনের একাডেমিক আলোচনার পাশাপাশি দুই দেশের মধ্যে আইন, গণতন্ত্র ও সাংবিধানিক চর্চার অভিজ্ঞতা বিনিময়ের ওপর জোর দেন তিনি।
বিশেষ অতিথির বক্তব্যে অধ্যাপক ড. আবদুস সালাম বলেন, আধুনিক সাংবিধানিক ইতিহাসে যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধান একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দলিল। ক্ষমতার পৃথকীকরণ, ক্ষমতার ভারসাম্য ও নিয়ন্ত্রণ, আইনের শাসন এবং নাগরিকের মৌলিক অধিকার সুরক্ষার মতো নীতিগুলো বিশ্বব্যাপী সাংবিধানিক চিন্তায় প্রভাব ফেলেছে। বাংলাদেশের নিজস্ব ইতিহাস, মুক্তিসংগ্রাম ও জনগণের আকাঙ্ক্ষা থেকে গড়ে ওঠা সংবিধানের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, আমাদের সংবিধানেও গণতন্ত্র, মানবাধিকার, আইনের শাসন ও রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার সীমাবদ্ধতাকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। ফলে দুই দেশের সাংবিধানিক অভিজ্ঞতার পারস্পরিক সংলাপ অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। তিনি আরও যোগ করেন, সংবিধান কেবল একটি তাত্ত্বিক বিষয় নয়, এটি একটি জীবন্ত প্রাতিষ্ঠানিক চর্চা। আইন বিভাগের শিক্ষার্থীদের জন্য এই ধারণার প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা অর্জনের সুযোগ তৈরি করা অত্যন্ত জরুরি।
বাংলাদেশে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত ব্রেন্ট টি. ক্রিসটেনসন তাঁর বক্তব্যে উল্লেখ করেন, যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধানের সূচনা হয়েছে ‘We the People’ (আমরা জনগণ) নামক সরল কিন্তু অর্থবহ বাক্য দিয়ে। ১৭৮৭ সালের গ্রীষ্মে ফিলাডেলফিয়ায় সংবিধান প্রণয়নের সময় প্রতিনিধিদের মধ্যে নানা মতপার্থক্য থাকলেও তারা ক্ষমতার পৃথকীকরণ ও পারস্পরিক নিয়ন্ত্রণের এমন এক ব্যবস্থা গড়ে তোলেন, যাতে কোনো একক ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান পূর্ণ ক্ষমতা কুক্ষিগত করতে না পারে। প্রতি বছর ১৭ সেপ্টেম্বর পালিত হওয়া এ দিবসটি যুক্তরাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ নিয়ে ভাবনার সুযোগ করে দেয় উল্লেখ করে তিনি বলেন, পরিবর্তিত পরিস্থিতির সঙ্গে মিল রেখে এই সংবিধান বিভিন্ন সময়ে সংশোধিত হয়েছে।
মার্কিন রাষ্ট্রদূত আরও বলেন, সাংবিধানিক শাসন, আইনের শাসন ও জনগণের অংশগ্রহণ সব সমাজের জন্যই সমান গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশের সংবিধান প্রণয়ন ও চর্চার প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, স্বাধীনতার পর বাংলাদেশও একটি নতুন রাষ্ট্রের সাংবিধানিক কাঠামো গড়ে তোলার গুরুত্বপূর্ণ প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে গেছে। ক্ষমতার পৃথকীকরণ, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, ধর্মীয় স্বাধীনতা এবং বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি ঐকমত্যের মতো বিষয়গুলো বাংলাদেশেও গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক প্রশ্ন হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে।
উদ্বোধনী পর্বের সমাপ্তির পর ‘ইউএস কনস্টিটিউশন’ বিষয়ে একটি প্যানেল আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। এই আলোচনায় বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের সাংবিধানিক ব্যবস্থার তুলনামূলক বিভিন্ন দিক নিয়ে শিক্ষক, গবেষক, আইনজীবী ও শিক্ষার্থীরা অংশ নেন। অনুষ্ঠানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন অনুষদের শিক্ষক, গবেষক, শিক্ষার্থী এবং আইন ও বিচার অঙ্গনের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।

