অধিকৃত পশ্চিম তীরের কাদিম বসতিতে পুনরায় ফিরে এসেছে এক নতুন প্রজন্মের ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারী। দুই দশক আগে তৎকালীন ইসরায়েলি সরকারের সিদ্ধান্তে এই এলাকাটি খালি করে দেওয়া হয়েছিল। আঞ্চলিক বসতি স্থাপনকারী কাউন্সিলের তথ্য অনুযায়ী, গত বৃহস্পতিবার তেল আবিব থেকে ত্রিশটি 'পাইওনিয়ার পরিবার' এই বসতিতে এসে পৌঁছেছে। ইসরায়েলি সরকারের বর্তমান নীতি ও ইহুদি জাতীয়তাবাদের ঢেউয়ের অংশ হিসেবেই তারা এখানে ফিরে এসেছে।
ছোট ছোট দলে বিভক্ত হয়ে আসা এই বসতি স্থাপনকারীদের গাড়িগুলোতে নীল-সাদা ইসরায়েলি পতাকা উড়ছিল। ফিলিস্তিনি গ্রাম ও কৃষিজমি পেরিয়ে আসার সময় তাদের অনেকের সঙ্গেই ছিল সামরিক পাহারা। অনেকে বিছানাপত্র, আসবাবপত্র এবং নির্মাণ সামগ্রীসহ ট্রেলার নিয়ে এসেছেন। জেনিন শহরের পার্শ্ববর্তী এলাকায় ইহুদি বসতি স্থাপনের ওপর থাকা ২০ বছরের নিষেধাজ্ঞা ইসরায়েল সরকার সম্প্রতি তুলে নিয়েছে, যা স্থানীয় ফিলিস্তিনিদের মধ্যে গভীর ভয়ের সঞ্চার করেছে। আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী, পশ্চিম তীরের সব ইসরায়েলি বসতি এবং আউটপোস্ট অবৈধ। আউটপোস্টগুলো ইসরায়েলি আইনের দৃষ্টিতেও অবৈধ, যদিও এগুলো প্রায়শই সরকারি পরিষেবা ও অর্থায়ন পেয়ে থাকে।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে ইসরায়েলের কট্টরপন্থী অর্থমন্ত্রী বেজালেল স্মোতরিচ বলেন, উত্তর সামারিয়া থেকে উচ্ছেদের ২১ বছর পর আমরা সেই অপরাধ সংশোধন করে কাদিম বসতিতে ফিরে এসেছি। অনুষ্ঠানে ইসরায়েলের বিচারমন্ত্রী, নেসেট স্পিকার এবং আঞ্চলিক বসতি স্থাপনকারী কাউন্সিলের প্রধান ইয়োসি দাগান উপস্থিত ছিলেন। ইয়োসি দাগান এ সময় ঘোষণা করেন যে, একদিন বসতি স্থাপনকারীরা গাজাতেও ফিরে যাবে।
২০০৫ সালে তৎকালীন ইসরায়েলি সরকারের একতরফা 'ডিসএ্যাঙ্গেজমেন্ট প্ল্যান'-এর অংশ হিসেবে কাদিম বসতিটি খালি করা হয়েছিল। ওই সময় গাজা থেকে সমস্ত ইহুদি বসতি ও সৈন্য প্রত্যাহার করা হয় এবং উত্তর পশ্চিম তীরের আরও তিনটি বসতি ভেঙে ফেলা হয়। তখন এই বসতিগুলোকে কৌশলগতভাবে গুরুত্বহীন এবং সুরক্ষার জন্য ব্যয়বহুল মনে করা হয়েছিল।
কাদিম ছাড়াও গনিম, সানুড় এবং হোমেস বসতিগুলোও আনুষ্ঠানিকভাবে খুলে দেওয়া হয়েছে এবং সেখানে পরিবারগুলো বসবাস শুরু করেছে। ২০২২ সালের শেষের দিকে ক্ষমতায় আসার পর থেকে বর্তমান ইসরায়েলি সরকার পশ্চিম তীরে ১০০টিরও বেশি নতুন বসতির অনুমোদন দিয়েছে। পিস নাউ-এর সেটলমেন্ট ওয়াচ প্রোগ্রামের পরিচালক হ্যাগিত ওফরান জানান, জেনিনে বসতি স্থাপনের এই দ্রুতগতি অক্টোবরের নির্বাচনের আগেই বসতি বিস্তারের এক বৃহত্তর প্রতিযোগিতার অংশ।
বসতি বিস্তারের পাশাপাশি পশ্চিম তীরে দুটি নতুন ইসরায়েলি সামরিক ঘাঁটি তৈরির কাজও দ্রুতগতিতে চলছে। এর মধ্যে জেনিন শরণার্থী শিবিরের পাশে দখলকৃত ফিলিস্তিনি জমিতে একটি সামরিক আউটপোস্ট তৈরি করা হচ্ছে। ১৯৯৩ সালের অসলো চুক্তির পর ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে থাকা কোনো জমিতে এটিই প্রথম ইসরায়েলি সামরিক ঘাঁটি। ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, জাবরিয়াতে এই আউটপোস্ট তৈরির নির্দেশ দেওয়া হয়েছে অপারেশনাল প্রয়োজনের ভিত্তিতে।
ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষ জেনিনের গভর্নর কামাল আবু আল-রুব উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, এই কর্মকাণ্ড জেনিনের হৃদপিণ্ডেও বসতি স্থাপনের ইঙ্গিত দেয়, যা শহরটিকে হেবরন বা জেরুজালেমের মতো বিভক্ত করে ফেলবে। তিনি গত দুই দশককে বসতিহীন 'স্বর্গ' হিসেবে বর্ণনা করে বলেন, এখন তারা তাদের দ্বারা পরিচালিত নরক ও হামলার মধ্যে বাস করছেন।
স্থানীয় এক ফিলিস্তিনি সবজি চাষি, যিনি ৫৩ বছর ধরে সেখানে বসবাস করছেন, জানান যে তার পরিবার ১৯৪৮ সালের আরব-ইসরায়েল যুদ্ধের সময় হাইফা থেকে পালিয়ে এসেছিল। তিনি জানান, বসতি স্থাপনকারীরা তার আত্মীয়দের সবজি ও লেবু বাগান থেকে তাড়িয়ে দিয়েছে। এছাড়া সম্প্রতি কাদিম থেকে ইসরায়েলগামী রাস্তার পাশের অনেক ফিলিস্তিনি দোকান ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ইসরায়েলি সেনাবাহিনী গুঁড়িয়ে দিয়েছে।
এমিক দোটান নামক আরেকটি নতুন বসতির পাশে বসবাসকারী শিক্ষক সামের জাবের জানান, বসতি স্থাপনকারীরা তাদের ঘরবাড়ির সামনে এসে ছবি তোলে এবং গভীর রাতে শক্তিশালী ফ্লাডলাইট দিয়ে জানালা দিয়ে আলো ফেলে। তিনি জানান, ইউরোপ, আমেরিকা, চীন ও রাশিয়ার মতো শক্তিগুলো এখন আর তাদের দিকে নজর দিচ্ছে না, যা তাকে হতাশ করেছে।

