‘একটি ইহুদি জীবনের মূল্য ১ কোটি ফিলিস্তিনি’: বিবিসিকে ইসরায়েলি বসতিস্থাপনকারী

অধিকৃত পশ্চিম তীরের একটি অবৈধ ইসরায়েলি বসতি (আউটপোস্ট) থেকে এক চরমপন্থী ইসরায়েলি বসতিস্থাপনকারী বিবিসিকে দেওয়া এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে ফিলিস্তিনিদের ওপর হামলাকে প্রতিশোধ হিসেবে যৌক্তিক বলে দাবি করেছেন। শুধু তাই নয়, তিনি একটি ইহুদি জীবনের মূল্য এক কোটি ফিলিস্তিনির সমান বলে মন্তব্য করেছেন এবং ফিলিস্তিনিদের নিজ ভূমি থেকে তাড়িয়ে দেওয়া অথবা হত্যা করার হুমকি দিয়েছেন।

পশ্চিম তীরের পাহাড়ের চূড়ায় ছড়িয়ে থাকা ‘হাভাত গিলাদ’ নামের এই অবৈধ ইসরায়েলি বসতিটি আশপাশের ফিলিস্তিনি গ্রামগুলো থেকে স্পষ্টভাবে দেখা যায়। গত সপ্তাহে এই এলাকায় ফিলিস্তিনি ও ইসরায়েলিদের মধ্যে এক সংঘর্ষে হাভাত গিলাদের এক ইসরায়েলি নিরাপত্তা রক্ষী নিহত হওয়ার পর আশপাশের ফিলিস্তিনি গ্রামগুলোতে ব্যাপক হামলা চালায় ইসরায়েলি বসতিস্থাপনকারীরা। ওই সংঘর্ষে চার ফিলিস্তিনি এবং একজন ইসরায়েলি সেনাও নিহত হন, যদিও ঘটনার মূল সূত্রপাত নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে বিতর্ক রয়েছে।

এই সহিংসতার পর বিবিসির একটি দল হাভাত গিলাদ বসতিতে প্রবেশ করে সেখানকার বাসিন্দা ইহুদা শিমনের সাক্ষাৎকার নেয়। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের জন্য এসব অবৈধ বসতিতে প্রবেশের অনুমতি পাওয়া অত্যন্ত বিরল। শিমন পেশায় একজন আইনজীবী, যিনি ফিলিস্তিনিদের ওপর সহিংসতা চালানোর অভিযোগে গ্রেপ্তার হওয়া ইসরায়েলিদের আইনি সহায়তা প্রদানকারী একটি সংস্থার সাথে যুক্ত।

সাক্ষাৎকারে শিমন দাবি করেন, নিরাপত্তা রক্ষী নিহতের প্রতিশোধ হিসেবে ফিলিস্তিনি গ্রামগুলোতে হামলা চালানো সম্পূর্ণ যৌক্তিক। তিনি বলেন, "আমি মনে করি, তারা একজন ইসরায়েলিকে হত্যা করার পর এখন আমাদের তাল ও সারা, এমনকি জিত ও ফারাটা গ্রামের সব মানুষকে হত্যা করা উচিত।" যখন তাকে প্রশ্ন করা হয় যে তিনি একটি ইহুদি জীবনের সাথে হাজার হাজার ফিলিস্তিনির জীবনকে সমান করছেন কি না, তখন তিনি উত্তর দেন, "না, লাখ লাখ। একটি ইহুদি জীবন মানে এক কোটি ফিলিস্তিনি।" তার এই বর্ণবাদী বক্তব্যের বিষয়ে চ্যালেঞ্জ করা হলে তিনি তা অস্বীকার না করে বলেন, "হ্যাঁ, আমি জানি। কিন্তু এটাই সত্য, কারণ ঈশ্বর আমাদের বেছে নিয়েছেন এবং এ কারণেই আপনারা ঈর্ষান্বিত।"

এই চরমপন্থী মনোভাব কেবল শিমনের একার নয়, বরং পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি বসতি সম্প্রসারণ এবং ফিলিস্তিনিদের ওপর ক্রমবর্ধমান সহিংসতা বোঝার জন্য এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। হাভাত গিলাদের মতো অনুমোদনহীন বসতি স্থাপনকারীরা বিশ্বাস করেন যে, এই ভূমি ঈশ্বর ইহুদিদের দিয়েছেন। অথচ আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী ইসরায়েলের সব ধরনের বসতি ও আউটপোস্ট সম্পূর্ণ অবৈধ। ২০ বছরেরও বেশি সময় আগে ফিলিস্তিনিদের হাতে নিহত এক ইসরায়েলি কর্মকর্তার স্মরণে এই হাভাত গিলাদ বসতিটি গড়ে তোলা হয়েছিল।

বিবিসি প্রতিনিধিরা যখন বসতিটিতে যান, তখন প্রবেশদ্বারের কাছে পুড়ে যাওয়া কিছু ঘরবাড়ি দেখতে পান। শিমন দাবি করেন, ফিলিস্তিনিরা সেখানে অগ্নিসংযোগ করেছে। তবে ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পুলিশ এই আগুনকে দুর্ঘটনাজনিত বলে মনে করছে, যা গাড়ি থেকে ফেলে দেওয়া সিগারেটের টুকরো থেকে লেগে থাকতে পারে। ইসরায়েলি সরকার পূর্বে এই বসতিটিকে বৈধতা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিলেও, বসতি পর্যবেক্ষণকারী ইসরায়েলি সংস্থা ‘পিস নাও’ জানিয়েছে যে, ফিলিস্তিনিদের ব্যক্তিগত মালিকানাধীন জমিতে এটি গড়ে ওঠায় সরকার তা করতে পারেনি। এর পরিবর্তে সরকার দক্ষিণের কিছু জমিকে ‘রাষ্ট্রীয় ভূমি’ ঘোষণা করে বসতিস্থাপনকারীদের সেখানে নতুন বাড়ি তৈরির সুযোগ করে দিচ্ছে।

শিমন আন্তর্জাতিক আইনকে পুরোপুরি প্রত্যাখ্যান করে বলেন, বাইবেল ইহুদিদের এই জমির অধিকার দিয়েছে। তিনি ইসরায়েলি সরকার ও সেনাবাহিনীর সমালোচনা করে বলেন যে তারা ইহুদিদের দাবিকে যথেষ্ট জোরালোভাবে সমর্থন করছে না। তিনি সেনাবাহিনীকে ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে পর্যাপ্ত প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহার না করার জন্যও অভিযুক্ত করেন। তার মতে, "ইসরায়েল সরকার এবং সেনাবাহিনী জাতিসংঘের মতো আচরণ করে—তারা ফিলিস্তিনিদের হত্যা না করে কেবল দুই পক্ষকে আলাদা করে দেয়। এর ফলে ফিলিস্তিনিরা পরে আমাদের হত্যা করার সুযোগ পায়।"

তবে জাতিসংঘের মানবিক বিষয়ক সমন্বয় কার্যালয় (ওসিএইচএ)-এর তথ্য শিমনের এই দাবির সম্পূর্ণ বিপরীত চিত্র তুলে ধরে। ওসিএইচএ-এর হিসাব অনুযায়ী, চলতি বছরের শুরু থেকে ২০ জুলাই পর্যন্ত পশ্চিম তীরে ৬৪ জন ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন, যার মধ্যে ১৮ জন নিহত হয়েছেন বসতিস্থাপনকারীদের হামলায়। অন্যদিকে, একই সময়ে মাত্র একজন ইসরায়েলি নিহত হয়েছেন। চলতি বছর বসতিস্থাপনকারীদের হামলায় ফিলিস্তিনিদের আহত হওয়ার হার প্রতিদিন গড়ে তিনজনের বেশি। সম্প্রতি পশ্চিম তীরে দায়িত্ব পালন করা এক ইসরায়েলি সেনা বিবিসিকে বলেছেন, তিনি সেখানে কেবল ফিলিস্তিনিদের চোখেই ভয় দেখেছেন, কোনো ইহুদির চোখে কখনো ভয় দেখেননি।

এই তথ্যের মুখোমুখি হয়ে শিমন বিশ্ব গণমাধ্যমের বিরুদ্ধে ফিলিস্তিনিদের প্রচারণায় প্রভাবিত হওয়ার অভিযোগ তোলেন। তিনি দাবি করেন, এই অঞ্চলের প্রতিটি ফিলিস্তিনির কাছে দুটি করে বন্দুক রয়েছে এবং তারা ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের মতো আরেকটি হামলার প্রস্তুতি নিচ্ছে। তিনি বলেন, "আমরা যদি এখনই জেগে না উঠি এবং তাদের এই এলাকা থেকে, ইসরায়েলের সব এলাকা, এমনকি গাজা থেকেও তাড়িয়ে না দিই, তবে তারা বারবার ফিরে আসবে।" তিনি ফিলিস্তিনিদের জন্য তিনটি বিকল্প তুলে ধরেন: ইসরায়েলি শাসনের অধীনে শান্তভাবে বসবাস করা, স্বেচ্ছায় অন্য কোনো আরব বা মুসলিম দেশে চলে যাওয়া, অথবা "তোমরা যদি আমাদের সাথে শান্তি বজায় রেখে না চলো এবং চলে যেতে না চাও, তবে আমার আর কোনো উপায় থাকবে না: আমাকে তোমাদের হত্যা করতে হবে এবং আমি তোমাদের সবাইকে হত্যা করব।"

শিমনের এই চরমপন্থী দৃষ্টিভঙ্গি ইসরায়েলের বর্তমান অর্থমন্ত্রী বেজালেল স্মোট্রিচের ২০১৭ সালের একটি পরিকল্পনার সাথে হুবহু মিলে যায়। স্মোট্রিচও ফিলিস্তিনিদের ইসরায়েলি শাসনের অধীনে শান্তভাবে থাকার অথবা চলে যাওয়ার প্রস্তাব দিয়েছিলেন, অন্যথায় তাদের সামরিক বাহিনী দিয়ে হত্যা করার কথা বলেছিলেন। সম্প্রতি তিনি গাজা থেকে ফিলিস্তিনিদের "স্বেচ্ছায় অভিবাসন" এবং সেখানে ইসরায়েলিদের পুনর্বাসনের পক্ষেও জোর সওয়াল করেছেন।

পশ্চিম তীরের এই সংঘাত কোনো সমান লড়াই নয়। ১৯৬৭ সালের যুদ্ধের পর থেকে ইসরায়েল এই অঞ্চল দখল করে রেখেছে এবং সেখানে বর্তমানে পাঁচ লাখেরও বেশি ইহুদি বসবাস করছে। এই বসতিস্থাপনকারীরা ইসরায়েলের শক্তিশালী সেনাবাহিনী এবং নিজস্ব সশস্ত্র নিরাপত্তা ইউনিট দ্বারা সুরক্ষিত। ইসরায়েলিরা বেসামরিক আইনের অধীনে সমস্ত সুযোগ-সুবিধা ভোগ করলেও, ফিলিস্তিনিদের সামরিক আইন, চেকপয়েন্ট এবং কঠোর বিধিনিষেধের মধ্যে বাস করতে হয়—যাকে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলো "অপারথাইড" বা বর্ণবাদ বলে বর্ণনা করেছে, যদিও ইসরায়েল এই তকমাকে "অযৌক্তিক ও বিকৃত" বলে প্রত্যাখ্যান করেছে।

হাভাত গিলাদের কাছাকাছি থাকা ফিলিস্তিনিরা সবসময় চরম আতঙ্কে দিন কাটান। এক ফিলিস্তিনি নারী জানান, বসতিস্থাপনকারীদের সম্ভাব্য হামলার আশঙ্কায় তিনি সবসময় জানালা দিয়ে ওই পাহাড়ের দিকে নজর রাখেন। অনেক ফিলিস্তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় তাদের সম্পূর্ণ পরিত্যাগ করেছে। এক স্থানীয় বাসিন্দা বলেন, "পরিস্থিতি খুবই খারাপ। ইউরোপ ব্যস্ত, আমেরিকা ইরানকে নিয়ে ব্যস্ত, চীনের কোনো মাথাব্যথা নেই, রাশিয়া ইউক্রেনের সাথে যুদ্ধ করছে, জাতিসংঘ শেষ এবং আরব দেশগুলোর নিজস্ব অভ্যন্তরীণ সমস্যা রয়েছে। আমরা জানি না আমাদের এখন কী করা উচিত।"

শিরোনাম :
‘কখনো মাদক বিক্রি করতে চাইনি’ জুভেন্টাসে যোগ দিচ্ছেন কোলো মুয়ানি, পিএসজিকে দিতে হবে ৫০ মিলিয়ন ইউরো ‘দ্য সোপ্রানোস’ তারকা ভিনসেন্ট পাস্তোর আর নেই, বয়স হয়েছিল ৮০ বিশ্বজুড়ে স্থূলতা রোধে বাধা দিচ্ছে প্রক্রিয়াজাত খাদ্য কোম্পানিগুলো: ডব্লিউএইচও ‘একটি ইহুদি জীবনের মূল্য ১ কোটি ফিলিস্তিনি’: বিবিসিকে ইসরায়েলি বসতিস্থাপনকারী পেরুতে পর্যটকবাহী বিমান বিধ্বস্ত, নিহত ১৩ দানিউবের পানি রেকর্ড কমায় হাঙ্গেরির পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র বন্ধের শঙ্কা দক্ষিণখানে চিকিৎসক হত্যা: জুতার ছাপের সূত্র ধরে স্বামী গ্রেপ্তার সোফি কানিংহামের মন্তব্য নিয়ে কেটি নোলানের সমালোচনা, পাল্টা তোপ আউটকিকের দিলীপ ট্রফিতে সেন্ট্রাল জোনের নেতৃত্বে রজত পাতিদার ‘কখনো মাদক বিক্রি করতে চাইনি’ জুভেন্টাসে যোগ দিচ্ছেন কোলো মুয়ানি, পিএসজিকে দিতে হবে ৫০ মিলিয়ন ইউরো ‘দ্য সোপ্রানোস’ তারকা ভিনসেন্ট পাস্তোর আর নেই, বয়স হয়েছিল ৮০ বিশ্বজুড়ে স্থূলতা রোধে বাধা দিচ্ছে প্রক্রিয়াজাত খাদ্য কোম্পানিগুলো: ডব্লিউএইচও ‘একটি ইহুদি জীবনের মূল্য ১ কোটি ফিলিস্তিনি’: বিবিসিকে ইসরায়েলি বসতিস্থাপনকারী পেরুতে পর্যটকবাহী বিমান বিধ্বস্ত, নিহত ১৩ দানিউবের পানি রেকর্ড কমায় হাঙ্গেরির পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র বন্ধের শঙ্কা দক্ষিণখানে চিকিৎসক হত্যা: জুতার ছাপের সূত্র ধরে স্বামী গ্রেপ্তার সোফি কানিংহামের মন্তব্য নিয়ে কেটি নোলানের সমালোচনা, পাল্টা তোপ আউটকিকের দিলীপ ট্রফিতে সেন্ট্রাল জোনের নেতৃত্বে রজত পাতিদার