লিণ্ডসে ক্ল্যান্সি হত্যা মামলা: যে প্রশ্নের ওপর নির্ভর করছে আদালতের রায়

ম্যাসাচুসেটসের একটি বহুল আলোচিত হত্যা মামলার মূল বিষয়বস্তু এটি নয় যে এক মা তার তিন সন্তানকে হত্যা করেছেন কি না, বরং প্রশ্ন হচ্ছে মানসিক অসুস্থতার কারণে তাকে এই অপরাধের জন্য আইনত দায়ী করা যায় কি না। ৩৬ বছর বয়সী লিণ্ডসে ক্ল্যান্সির বিরুদ্ধে ২০২৩ সালের ২৪ জানুয়ারি তার তিন সন্তান—৫ বছর বয়সী কোরা, ৩ বছর বয়সী ডসন এবং ৮ মাস বয়সী ক্যালান ক্ল্যান্সিকে হত্যার অভিযোগ রয়েছে। প্রসিকিউশনের দাবি, লিণ্ডসে অত্যন্ত পরিকল্পিতভাবে এই হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছেন। তিনি তার স্বামী প্যাট্রিক ক্ল্যান্সিকে ঘরের বাইরে কোনো কাজে পাঠিয়ে ম্যাসাচুসেটসের ডাক্সবেরিতে তাদের বাড়ির বেসমেন্টে ব্যায়ামের ব্যান্ড দিয়ে শ্বাসরোধ করে সন্তানদের হত্যা করেন।

লিণ্ডসে স্বীকার করেছেন যে তিনি তার তিন সন্তানকে শ্বাসরোধ করে হত্যা করেছিলেন। এরপর তিনি নিজের গলা ও ঘাড় কেটে দোতলার জানালা দিয়ে লাফিয়ে পড়েন, যার ফলে তিনি স্থায়ীভাবে পক্ষাঘাতগ্রস্ত হয়ে যান। তার আইনজীবী কেভিন রেডিংটনের যুক্তি, লিণ্ডসে এই হত্যাকাণ্ডের জন্য দায়ী নন কারণ তিনি প্রসবোত্তর মানসিক রোগ (পোস্টপার্টাম সাইকোসিস) এবং অতিরিক্ত ওষুধ সেবনের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার কারণে মানসিক ভারসাম্যহীনতার শিকার হয়েছিলেন।

এসেক্স কাউন্টির সাবেক প্রসিকিউটর এবং বোস্টন কলেজের আইনের অধ্যাপক ও লেখক মার্গারেট ম্যাকলিন ইউএসএ টুডে নেটওয়ার্কের অংশ ‘প্যাট্রিয়ট লেজার’-কে বলেন, এই মামলাটি আসলে একটি মাত্র প্রশ্নের ওপর দাঁড়িয়ে আছে। ম্যাকলিনের ভাষায়, প্রশ্নটি হলো—এই নারী, অর্থাৎ লিণ্ডসে ক্ল্যান্সি কি মানসিকভাবে আইনত দায়ী ছিলেন?

বিচারক উইলিয়াম সালিভানের আদালতে পঠিত সংজ্ঞা অনুযায়ী, কোনো অভিযুক্ত ব্যক্তি যদি মানসিক রোগ বা ত্রুটির কারণে তার আচরণের অপরাধমূলক বা অন্যায় দিকটি বুঝতে ব্যর্থ হন অথবা আইনের প্রয়োজনীয়তা অনুযায়ী নিজের আচরণ নিয়ন্ত্রণ করতে অক্ষম হন, তবে তাকে তার কাজের জন্য আইনত দায়ী করা যায় না।

ম্যাকলিন ব্যাখ্যা করেন, যুক্তরাষ্ট্রের বেশিরভাগ অঙ্গরাজ্যে আসামী পক্ষকে তাদের মানসিক ভারসাম্যহীনতা বা আইনত দায়ী না থাকার বিষয়টি প্রমাণ করতে হয়। তবে ম্যাসাচুসেটস অঙ্গরাজ্যের আইন অনুযায়ী এই প্রমাণের দায়ভার প্রসিকিউশনের ওপর বর্তায়। এর অর্থ হলো, প্রসিকিউশনকে আদালতের জুরিদের সামনে সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ করতে হবে যে হত্যাকাণ্ডের ঠিক সেই মুহূর্তে লিণ্ডসে দায়িত্বশীল সিদ্ধান্ত নিতে সক্ষম এবং আইনত সুস্থ মস্তিষ্কের ছিলেন। ম্যাকলিন বলেন, এই মামলায় সন্দেহাতীতভাবে এটি প্রমাণ করা প্রসিকিউশনের জন্য মাউন্ট এভারেস্ট জয় করার মতোই কঠিন হবে।

এই চ্যালেঞ্জ পার করতে প্রসিকিউশন পক্ষ গত ১৭ আগস্ট তাদের বক্তব্য শেষ করার আগে আদালতে ৭০ জনেরও বেশি সাক্ষী হাজির করেছে। সাক্ষীদের মধ্যে ছিলেন লিণ্ডসের স্বামী, পারিবারিক বন্ধু, প্রথম উদ্ধারকারী দল এবং চিকিৎসা পেশাজীবীরা। প্লাইমাউথ কাউন্টির সহকারী জেলা অ্যাটর্নি শ্যানন বাকিংহাম লিণ্ডসেকে একজন নিয়ন্ত্রণকামী, অতি-সতর্ক এবং চতুর মা হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তিনি দাবি করেন, লিণ্ডসে তার নিজের এবং পরিবারের জীবনের প্রতিটি ছোটখাটো বিষয় নিয়ন্ত্রণ করতে পারছিলেন না বলেই এই হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছেন।

হত্যাকাণ্ডের আগের মাসগুলোতে লিণ্ডসের মানসিক চিকিৎসা নিয়ে বাকিংহাম অভিযোগ করেন, তিনি বিষণ্ণতা ও উদ্বেগের শিকার হলে দ্রুত এবং সহজ সমাধানের আশায় তার চিকিৎসকদের প্রভাবিত বা ম্যানিপুলেট করার পথ বেছে নিয়েছিলেন। সহকারী জেলা অ্যাটর্নি বলেন, এটি নারীর মানসিক স্বাস্থ্য এবং চিকিৎসা ব্যবস্থা নারীদের সাথে কেমন আচরণ করে তা নিয়ে কোনো উন্মুক্ত বিতর্ক নয়। এই মামলাটি কেবল এই আসামি, লিণ্ডসে ক্ল্যান্সিকে নিয়ে।

হত্যাকাণ্ডের আগের মাসগুলোতে লিণ্ডসেকে চিকিৎসা দেওয়া মনোরোগ বিশেষজ্ঞ এবং সাইকিয়াট্রিক নার্সরা তাদের দেওয়া বিভিন্ন ওষুধ ও চিকিৎসার বিষয়ে আদালতে সাক্ষ্য দিয়েছেন। প্রসিকিউশন পক্ষ স্বামী প্যাট্রিক ক্ল্যান্সিকে লিণ্ডসের মানসিক চিকিৎসার চেষ্টা সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ করেছে এবং ২০২৩ সালের জানুয়ারিতে সন্তানদের নিথর দেহ খুঁজে পাওয়ার পর প্যাট্রিকের করা হৃদয়বিদারক ৯১১ কলটি এজলাসে বাজিয়ে শোনানো হয়।

কোন পক্ষের জন্য এই আইনি লড়াই বেশি কঠিন—এমন প্রশ্নের জবাবে ম্যাকলিন প্রসিকিউশন পক্ষের কথাই বলেন। তিনি বলেন, সব ভয়াবহ তথ্য-প্রমাণ থাকা সত্ত্বেও প্রসিকিউশনকে প্রমাণ করতে হবে যে অপরাধ সংঘটনের ঠিক সেই মুহূর্তে লিণ্ডসে ক্ল্যান্সি আইনত সুস্থ ও দায়ী ছিলেন।

ভ্যান্ডারবিল্ট ইউনিভার্সিটির ক্রিমিনাল জাস্টিস প্রোগ্রামের পরিচালক এবং মনোরোগবিদ্যার সহযোগী অধ্যাপক ক্রিস স্লোবোজিনও একমত যে প্রসিকিউশনের ওপর দায়ভার বেশি। তবে তিনি ইউএসএ টুডে-কে বলেন, লিণ্ডসের আইনজীবীর জন্যও মানসিক ভারসাম্যহীনতার যুক্তি দিয়ে জয়ী হওয়া সহজ হবে না। স্লোবোজিনের মতে, জুরিরা সাধারণত এই ধরণের আত্মপক্ষ সমর্থনের বিষয়ে অত্যন্ত সন্দিহান থাকেন। পূর্ববর্তী গবেষণাগুলোতে দেখা গেছে, মাত্র ২৫ শতাংশ মামলায় এই যুক্তি কার্যকর হয়। তিনি আরও বলেন, প্রমাণের দায়ভার প্রসিকিউশনের ওপর স্থানান্তরিত হলেই যে ফলাফলে বড় পার্থক্য তৈরি হয়, বিষয়টি তেমন নয়।

আইনজীবী রেডিংটন তার উদ্বোধনী বক্তব্যে জুরিদের সামনে প্রসবোত্তর বিষণ্ণতা, উদ্বেগ এবং সাইকোসিসের সাথে লিণ্ডসের লড়াইয়ের বিস্তারিত বিবরণ তুলে ধরেন। তিনি অভিযোগ করেন, লিণ্ডসে একটি পুরুষ কণ্ঠস্বর শুনতে পেয়েছিলেন যা তাকে এই হত্যাকাণ্ড ঘটাতে নির্দেশ দিয়েছিল। তিনি লিণ্ডসেকে একজন স্নেহময়ী মা হিসেবে বর্ণনা করেন যিনি সুস্থ হওয়ার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করেছিলেন। রেডিংটন বলেন, এই শিশুরা তার কাছ থেকে ভালোবাসা, স্নেহ এবং যত্ন পেয়েছিল। সরকারের দাবি অনুযায়ী নিজের স্বার্থপর জীবনের জন্য তিনি সন্তানদের হাত থেকে মুক্তি পেতে চাননি। মৃত্যুর আগ মুহূর্ত পর্যন্ত তিনি তার সন্তানদের ভালোবাসতেন।

আসামী পক্ষের সাক্ষীদের মধ্যে ছিলেন লিণ্ডসের মা ও বোন, যারা হত্যাকাণ্ডের আগে তার ভেঙে পড়া মানসিক স্বাস্থ্যের বিষয়ে সাক্ষ্য দিয়েছেন। রেডিংটন লিণ্ডসের সাবেক সহকর্মী, একজন জরুরি বিভাগের চিকিৎসক এবং একজন মনোবিজ্ঞানীর সাক্ষ্য গ্রহণ করেন। মনোবিজ্ঞানী পল জাইজেল আদালতে সাক্ষ্য দিয়ে বলেন, ঘটনার সময় লিণ্ডসে সাইকোসিসের শিকার ছিলেন এবং নিজের কাজের অপরাধ বা ভুল বোঝার মতো কোনো মানসিক অবস্থা তার ছিল না।

ম্যাকলিনের মতে, রেডিংটনকে বিশেষজ্ঞ সাক্ষ্যের মাধ্যমে জুরিদের বোঝাতে হবে যে মানসিক রোগ এবং ভুল ওষুধের কারণে ২০২৩ সালের ২৪ জানুয়ারি লিণ্ডসের মানসিক বিপর্যয় ঘটেছিল, যার ফলে তাকে আইনত দায়ী করা যায় না। ম্যাকলিন বলেন, রেডিংটন যুক্তি দেবেন যে সন্তানদের হত্যার ঠিক পূর্ব মুহূর্তে তিনি মানসিক নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছিলেন। তবে ঠিক কোন মুহূর্তে এটি ঘটেছিল তা সুনির্দিষ্টভাবে ব্যাখ্যা করা তার জন্য বেশ কঠিন হবে।

লিণ্ডসে ক্ল্যান্সির বিরুদ্ধে তিনটি প্রথম-ডিগ্রি হত্যার অভিযোগ রয়েছে, যার জন্য ম্যাসাচুসেটস আইনে প্যারোল ছাড়া যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের বিধান রয়েছে। ম্যাসাচুসেটসের আইন অনুযায়ী, কোনো অভিযুক্ত যদি মানসিক ত্রুটির কারণে নির্দোষ বা আইনত দায়ী নন বলে প্রমাণিত হন, তবে তাকে সাধারণত চিকিৎসার জন্য রাষ্ট্রীয় মানসিক হাসপাতালে পাঠানো হয়। ২০২৩ সালের মে মাস থেকে আদালতের নির্দেশে লিণ্ডসেকে ম্যাসাচুসেটসের তিউকসবরি হাসপাতালে রেখে মানসিক চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। শেষ পর্যন্ত জুরিদের সর্বসম্মত সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে হবে। ম্যাকলিন মনে করেন, মামলার সংবেদনশীলতার কারণে ১২ জন জুরির পক্ষে একমত হওয়া বেশ কঠিন হবে এবং জুরি রুমে এটি নিয়ে বড় ধরনের বিতর্ক তৈরি হতে পারে।

শিরোনাম :
বিমানের জরুরি পরিস্থিতি কি নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক ভাগ্য বদলাতে পারবে? টাইম ১০০ তালিকায় জাপানের প্রথম মাতৃত্বকালীন ছুটিতে যাওয়া মেয়র ব্রাজিলে ফ্যাসিবাদ রুখতে আমিই একমাত্র ভরসা: রিওতে লুলার বিশাল সমাবেশ বাংলাদেশ জাতীয় দলের সহকারী কোচ হলেন মালিবাংওয়ে মাকেতা ভিসা জটিলতায় সাংবাদিকতা প্রোগ্রামে ভর্তি স্থগিত করল কলাম্বিয়া ইউনিভার্সিটি স্পেনে আটক মিয়ানমার আমেরিকান চেম্বারের সাবেক বোর্ড সদস্য চলতি মাসেই খুলছে মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার, শুরু হয়েছে চাহিদাপত্র পাওয়ার প্রক্রিয়া রোমান রেইন্সের মুখোমুখি হওয়ার আগে নিজের মানসিক প্রস্তুতি জানালেন এলএ নাইট মেম কয়েন ইভেন্টে ট্রাম্পের নৈশভোজ, থাকছে স্বর্ণের ঘড়িসহ বিশেষ উপহার ভোটার তালিকা নিয়ে বিতর্ক: ভারতে ফের পথে ‘ককরোচ’ আন্দোলন বিমানের জরুরি পরিস্থিতি কি নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক ভাগ্য বদলাতে পারবে? টাইম ১০০ তালিকায় জাপানের প্রথম মাতৃত্বকালীন ছুটিতে যাওয়া মেয়র ব্রাজিলে ফ্যাসিবাদ রুখতে আমিই একমাত্র ভরসা: রিওতে লুলার বিশাল সমাবেশ বাংলাদেশ জাতীয় দলের সহকারী কোচ হলেন মালিবাংওয়ে মাকেতা ভিসা জটিলতায় সাংবাদিকতা প্রোগ্রামে ভর্তি স্থগিত করল কলাম্বিয়া ইউনিভার্সিটি স্পেনে আটক মিয়ানমার আমেরিকান চেম্বারের সাবেক বোর্ড সদস্য চলতি মাসেই খুলছে মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার, শুরু হয়েছে চাহিদাপত্র পাওয়ার প্রক্রিয়া রোমান রেইন্সের মুখোমুখি হওয়ার আগে নিজের মানসিক প্রস্তুতি জানালেন এলএ নাইট মেম কয়েন ইভেন্টে ট্রাম্পের নৈশভোজ, থাকছে স্বর্ণের ঘড়িসহ বিশেষ উপহার ভোটার তালিকা নিয়ে বিতর্ক: ভারতে ফের পথে ‘ককরোচ’ আন্দোলন