হলিউডের সাবেক শিশু তারকা হেইডেন প্যানেটিয়ারের অকাল মৃত্যুর পর শিশু শিল্পীদের সুরক্ষায় বড় ধরনের পরিবর্তনের দাবি তুলেছেন আরেক সাবেক শিশু তারকা মেলিসা গিলবার্ট। গত ২২ আগস্ট সাবস্ট্যাকে প্রকাশিত "এনাফ ইজ এনাফ" (যৌথভাবে যথেষ্ট হয়েছে) শীর্ষক এক আবেগঘন নিবন্ধে তিনি বিনোদন জগতে শিশু শিল্পীদের ওপর চলা শোষণ ও নির্যাতনের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়েছেন।
৩৬ বছর বয়সী হেইডেন প্যানেটিয়ারকে গত ১৬ আগস্ট সাউথ ক্যারোলিনার একটি অ্যাপার্টমেন্টে অচেতন অবস্থায় পাওয়া যায়, তবে তাঁর মৃত্যুর কারণ এখনও জানা যায়নি। হেইডেনের পাশাপাশি সম্প্রতি আরও দুই সাবেক নারী শিশু তারকার মৃত্যু নাড়া দিয়েছে মেলিসাকে। এঁদের মধ্যে মিশেল ট্র্যাচটেনবার্গ ২০২৫ সালে ৩৯ বছর বয়সে ডায়াবেটিস মেলিটাসের জটিলতায় এবং ডাভেইগ চেজ গত জুনে ৩৫ বছর বয়সে এইডসে আক্রান্ত হয়ে মারা যান।
শৈশবে "লিটল হাউস অন দ্য প্রেইরি" নাটকে লরা ইঙ্গলস চরিত্রে অভিনয় করা মেলিসা গিলবার্ট লিখেছেন, এই তিনজনের মৃত্যু তাঁর কাছে অত্যন্ত ব্যক্তিগত মনে হয়েছে কারণ একসময় তিনিও তাঁদের মতোই ছিলেন। গিলবার্ট বলেন, "আমরা সবাই সাবেক নারী শিশু শিল্পী নামের একই গোত্রের সদস্য। আমাদের একজনের মৃত্যু অন্য সবার ভেতর দিয়ে বৈদ্যুতিক তরঙ্গের মতো বয়ে যায়। এত কাছাকাছি সময়ে আমাদের তিনজনের মৃত্যু ইঙ্গিত করে যে কোথাও বড় ধরনের ভুল হচ্ছে।" তিনি অভিযোগ করেন, বিনোদন শিল্প তার সবচেয়ে কমবয়সী সদস্যদের ব্যবহার করে, নির্যাতন ও শোষণ করে এবং একসময় ছুঁড়ে ফেলে দেয়। স্মার্টফোনের যুগে এই সমস্যা আরও মারাত্মক রূপ নিয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, এখন সবাই পাপারাজ্জি হয়ে উঠেছে এবং একসময়ের ব্যক্তিগত বিষয়গুলো এখন বিক্রি ও অপব্যবহার করা হচ্ছে।
গিলবার্ট ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, প্রকৃত পরিবর্তনের জন্য কেউ যথেষ্ট গুরুত্ব দিচ্ছে না। তিনি বলেন, "যতক্ষণ না আরেকটি মৃত্যু ঘটে এবং সবাই দুঃখ প্রকাশ করে কিছু একটা করার কথা বলে, ততক্ষণ পর্যন্ত কেউ কিছু করে না। এরপর সবাই আবার তা ভুলে গিয়ে নিজের জীবনে ফিরে যায়।" নিজের অভিজ্ঞতার কথা জানিয়ে তিনি লেখেন, শিশু শিল্পীদের 'না' বলার অধিকার কেড়ে নেওয়া হয়, যা স্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ। তিনি নিজে অসুস্থতা ও আঘাত নিয়ে বহুবার কাজ করেছেন এবং জ্বরে আক্রান্ত হয়ে পারফর্ম করার পর একবার সেপসিসের (রক্তে সংক্রমণ) কাছাকাছি পৌঁছে গিয়েছিলেন।
গিলবার্টের দাবি, শিশু শিল্পীদের শিশু হিসেবেই বাঁচতে দেওয়া উচিত এবং তাদের শারীরিক বা মানসিক কষ্ট সহ্য করে কাজ করতে বাধ্য করা কিংবা পুরো পরিবারের দায়িত্ব চাপানো বন্ধ করা উচিত। তিনি স্টুডিও ও নেটওয়ার্কগুলোর সাথে মিলে শিশু শিল্পীদের তরুণ বয়সে পদার্পণের সময় বিনামূল্যে মানসিক স্বাস্থ্য সহায়তার ব্যবস্থা করার দাবি জানান। উল্লেখ্য, গিলবার্টের স্বামী অভিনেতা টিমোথি বাসফিল্ড গত ফেব্রুয়ারিতে নিউ মেক্সিকোর একটি গ্র্যান্ড জুরি কর্তৃক শিশু যৌন নিপীড়নের অভিযোগে অভিযুক্ত হন। তবে বাসফিল্ড এই অভিযোগ অস্বীকার করে নিজেকে নির্দোষ দাবি করেছেন এবং গিলবার্টও তাঁর পাশে দাঁড়িয়েছেন।
গিলবার্টের এই দাবির সাথে একমত পোষণ করেছেন অস্কারজয়ী তারকা অ্যানা প্যাকুইন। মাত্র ১১ বছর বয়সে "দ্য পিয়ানো" ছবির জন্য অস্কার পাওয়া এই সাবেক শিশু শিল্পী ২১ আগস্ট ইনস্টাগ্রামে লিখেছেন, শৈশবেই যৌন আবেদনময়ী হিসেবে উপস্থাপিত হওয়া সাবেক নারী শিশু তারকাদের দুঃখজনক জীবন এবং অকাল মৃত্যুর বিষয়টি কোনো কাকতালীয় ঘটনা নয়। অন্যদিকে, "স্ক্রিম" ফ্র্যাঞ্চাইজিতে প্যানেটিয়ারের সহ-অভিনেত্রী রোজ ম্যাকগোয়ান শিশু অভিনয় সম্পূর্ণ বন্ধের দাবি জানিয়ে লিখেছেন, "বিনোদন জগতে বাচ্চাদের জড়াবেন না। এসবের কোনো কিছুই স্বাভাবিক নয়।"
মৃত্যুর মাত্র তিন মাস আগে প্রকাশিত হেইডেন প্যানেটিয়ারের স্মৃতিকথা "দিস ইজ মি: আ রেকনিং"-এ হলিউডে তাঁর যন্ত্রণাদায়ক অভিজ্ঞতার চিত্র উঠে এসেছে। সেখানে তিনি লিখেছিলেন, কিশোরী বয়সে হলিউডে তাঁকে "কল গার্ল"-এর মতো আচরণ করা হতো। পর্দায় কান্নার দৃশ্য ফুটিয়ে তুলতে শৈশবে তাঁকে ভয়াবহ সব বিষয় কল্পনা করতে বাধ্য করা হতো, যা তাঁর মস্তিষ্ক ও শরীরকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছিল। হেইডেন লিখেছিলেন, এই কৃত্রিম মানসিক চাপ তাঁর মস্তিষ্কের অ্যামিগডালা, হিপোক্যাম্পাস, হাইপোথ্যালামাস এবং প্রিফ্রন্টাল কর্টেক্সকে সক্রিয় করে তুলত, যা ভয় ও দুশ্চিন্তা প্রক্রিয়াজাত করে। ক্রমাগত কর্টিসল ও অ্যাড্রেনালিনের মতো স্ট্রেস হরমোনের নিঃসরণ তাঁর শরীরকে স্থায়ীভাবে দুর্বল করে দিয়েছিল।

