বিশ্বখ্যাত অ্যাকশন তারকা, সাবেক রেসলার ও সাংস্কৃতিক আইকন মিস্টার টি (Mr T) তার জীবন নিয়ে নির্মিত নেটফ্লিক্সের নতুন প্রামাণ্যচিত্র ‘আন্টোল্ড মিস্টার টি: আই পিটি দ্য ফুল’ (Untold Mr T: I Pity the Fool) নিয়ে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। ৭৪ বছর বয়সী এই তারকা সাধারণত খুব একটা সাক্ষাৎকার দেন না। তবে সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে তিনি প্রামাণ্যচিত্রটির সমালোচনা করে এটিকে ‘আবর্জনা’ বলে অভিহিত করেছেন। তার অভিযোগ, চলচ্চিত্রটিতে তার জীবনের আসল আধ্যাত্মিক ও মানবিক দিকগুলো বাদ দিয়ে কেবল ‘হার্ডম্যান’ বা হিংস্র ইমেজকে বড় করে দেখানো হয়েছে।
মিস্টার টি-এর আসল নাম লরেন্স ট্যুরিয়াড (Lawrence Tureaud)। তিনি শিকাগোর সাউথ সাইডের অত্যন্ত দরিদ্র এক কৃষ্ণাঙ্গ পরিবারে বেড়ে ওঠেন। তার বয়স যখন মাত্র পাঁচ বছর, তখন তার যাজক বাবা পরিবার ছেড়ে চলে যান। এরপর তার মা উইলি (Willie) একাই তাদের ১২ সন্তানকে বড় করে তোলেন। বিত্তশালীদের ঘরের মেঝে মুছে এবং সরকারি সাহায্যের (ওয়েলফেয়ার) ওপর নির্ভর করে তাদের সংসার চলত। লরেন্স তার ভাইবোনদের কাছে ‘লিটল টি’ নামে পরিচিত ছিলেন। শৈশবে তাকে প্রতিনিয়ত বর্ণবাদের মুখোমুখি হতে হয়েছে। শ্বেতাঙ্গদের দ্বারা তার পরিবারের প্রতি অসম্মানজনক আচরণ তাকে গভীরভাবে ব্যথিত করত।
১৮ বছর বয়সে তিনি নিজের নাম পরিবর্তন করে ‘মিস্টার টি’ রাখেন। এর পেছনের কারণ ব্যাখ্যা করে তিনি বলেন, শৈশবে তিনি দেখেছেন তার বাবা ও চাচাকে শ্বেতাঙ্গরা ‘বয়’ (Boy) বলে ডাকত। এমনকি তার এক ভাই যখন মেরিন সেনা হিসেবে ভিয়েতনাম যুদ্ধ থেকে বীরের বেশে ফিরে এলেন, তাকেও শ্বেতাঙ্গরা ‘বয়’ বলে সম্বোধন করেছিল। তাই ১৮ বছর বয়সে যখন দেশের জন্য যুদ্ধ করার উপযুক্ত হলেন, তখন তিনি সিদ্ধান্ত নেন যে একজন মানুষ হিসেবে সম্মান পাওয়ার অধিকার তার আছে। তাই তিনি নিজের নাম পরিবর্তন করে ‘মিস্টার টি’ রাখেন, যাতে সবার মুখ থেকে বের হওয়া প্রথম শব্দটিই হয় ‘মিস্টার’।
হাইস্কুলে পড়ার সময় মিস্টার টি দর্শন ও ধর্মতত্ত্ব নিয়ে পড়াশোনা করেছিলেন। যদিও সে সময় এক শিক্ষক তাকে বলেছিলেন যে এই বিষয়ে কোনো টাকা নেই, কিন্তু মিস্টার টি-এর কাছে টাকা কখনোই মুখ্য ছিল না। ১৫ বছর বয়সে তিনি একজন নামকরা অ্যাথলেট ছিলেন, কিন্তু পড়াশোনায় মন দেওয়ার কারণে এবং মায়ের কথা শোনার কারণে এলাকার বখাটেরা তাকে ‘মেয়েলি’ বা ‘কাপুরুষ’ (sissy) বলে উপহাস করত। তবে তিনি সেই উপহাসের তোয়াক্কা না করে মায়ের স্বপ্ন পূরণ করতে পড়াশোনা চালিয়ে যান।
নেটফ্লিক্সের প্রামাণ্যচিত্রে মিস্টার টি-এর কিশোর বয়সের একটি হিংস্র ঘটনার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে, যা নিয়ে তিনি বেশ ক্ষুব্ধ। সে সময় স্থানীয় কিছু বখাটে তার মায়ের ওয়েলফেয়ারের টাকা ছিনতাই করেছিল। এর জবাবে মিস্টার টি একটি রাইফেলের কুঁদো দিয়ে আঘাত করে তাদের দাঁত ভেঙে দিয়েছিলেন। এই প্রতিশোধের জন্য তিনি গর্বিত নন, কারণ এটি তার ধর্মীয় বিশ্বাসের পরিপন্থী ছিল। তবে তৎকালীন পরিস্থিতির কারণে তিনি এটি করতে বাধ্য হয়েছিলেন বলে জানান।
স্কুল শেষ করার পর তিনি টেক্সাসের প্রেইরি ভিউ এঅ্যান্ডএম ইউনিভার্সিটিতে (Prairie View A&M University) ফুটবলের জন্য বৃত্তি পান। সেখানে তিনি গণিত নিয়ে পড়াশোনা করেন এবং ফ্রেশম্যান ইয়ারের ডেপুটি প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। তবে ১৯৭১ সালে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রপত্রিকা ‘দ্য প্রেইরি ভিউ প্যান্থার’-এর সম্পাদককে বহিষ্কারের বিরুদ্ধে এক আন্দোলনে অংশ নেওয়ার কারণে তাকে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বহিষ্কার করা হয়। এরপর শিকাগোতে ফিরে তিনি ব্যাংক ঝাড়ুদার এবং হোটেলের হাউসকিপার হিসেবে কাজ করেন। ১৯৭৫ সালে তিনি মার্কিন সেনাবাহিনীর মিলিটারি পুলিশ কোরে যোগ দেন এবং ৬,০০০ রিক্রুটের মধ্যে সেরা প্রশিক্ষণার্থী নির্বাচিত হন। ১৯৭৮ সালে সম্মানজনকভাবে সেনাবাহিনী থেকে অব্যাহতি পাওয়ার পর, হাঁটুতে আঘাতের কারণে এনএফএল (NFL) খেলার স্বপ্ন ভেঙে গেলে তিনি বাউন্সার হিসেবে কাজ শুরু করেন।
শিকাগোর ‘ডিংবাটস’ (Dingbats) নাইটক্লাবে বাউন্সার হিসেবে কাজ করার সময় তিনি নিজের আইকনিক লুক তৈরি করেন। ক্লাবের মারামারির পর ফেলে যাওয়া বা হারিয়ে যাওয়া সোনার চেইনগুলো তিনি কুড়িয়ে নিয়ে পরা শুরু করেন। তিনি জানান, এই সোনার চেইন পরা ছিল তার পূর্বপুরুষদের দাসত্বের লোহার শিকলকে সোনার শিকলে রূপান্তর করে ইতিহাসকে পুনরুজ্জীবিত করার একটি প্রতীকী প্রয়াস। একই সাথে তিনি তার কানে সাতটি দুল পরার ধর্মীয় ও ঐতিহাসিক তাৎপর্য ব্যাখ্যা করেন। ডান কানের তিনটি দুল পিতা, পুত্র ও পবিত্র আত্মা এবং বাম কানের চারটি দুল চার ঋতু ও চার বাইবেল লেখকের প্রতীক, যা যোগ করলে মোট সাত হয়—যা বাইবেলে একটি পবিত্র সংখ্যা।
পরবর্তীতে তিনি মাইকেল জ্যাকসন, ডায়ানা রস, স্টিভ ম্যাককুইন এবং মোহাম্মদ আলীর মতো বিখ্যাত তারকাদের ব্যক্তিগত দেহরক্ষী হিসেবে কাজ করেন। ১৯৮০ সালে তিনি এনবিসি-র ‘আমেরিকাস টাফেস্ট বাউন্সার’ প্রতিযোগিতায় বিজয়ী হন। এই প্রতিযোগিতায় জেতা প্রাইজমানি দিয়ে তিনি গৃহহীনদের খাওয়ানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। এই শোতে কাস্টিং ডিরেক্টর রোন্ডা ইয়াং তাকে আবিষ্কার করেন এবং সিলভেস্টার স্ট্যালনের ‘রকি ৩’ (Rocky III) চলচ্চিত্রে খলনায়ক ‘ক্লাবার ল্যাং’ চরিত্রের জন্য সুপারিশ করেন। ১৯৮২ সালের এই ব্লকবাস্টার ছবিতেই তিনি তার বিখ্যাত সংলাপ ‘আই পিটি দ্য ফুল’ (I pity the fool) প্রথম ব্যবহার করেন।
১৯৮৩ সালে তিনি ‘দ্যা এ-টিম’ (The A-Team) টিভি সিরিজে ‘বিএ বারাকাস’ চরিত্রে অভিনয় করে বিশ্বজুড়ে তারকাখ্যাতি পান। তিনি এই সিরিজের সবচেয়ে বেশি পারিশ্রমিক পাওয়া অভিনেতা হয়ে ওঠেন, যা তার সহ-অভিনেতা জর্জ পেপার্ডের হিংসার কারণ হয়েছিল বলে জানা যায়। একই বছর তিনি হোয়াইট হাউসে ফার্স্ট লেডি ন্যান্সি রেগানের মাদকবিরোধী প্রচারণায় অংশ নেন। ১৯৮৫ সালে তিনি হাল্ক হোগান, লিবারেচি এবং মোহাম্মদ আলীর সাথে প্রথম রেসলম্যানিয়ায় অংশ নিয়ে আলোড়ন সৃষ্টি করেন।
নেটফ্লিক্সের প্রামাণ্যচিত্রের পরিচালক স্কট উইনট্রব (Scott Weintrob) এবং তার সাবেক এজেন্ট পিটার ইয়াং (Peter Young)-এর ওপর মিস্টার টি চরম ক্ষুব্ধ। পিটার ইয়াংয়ের বিরুদ্ধে মিস্টার টি অতীতে মামলা করেছিলেন, কারণ ইয়াং তার অজান্তেই বিভিন্ন চুক্তিতে তার নাম ব্যবহার করছিলেন। প্রামাণ্যচিত্রে পিটার ইয়াং দাবি করেন যে মিস্টার টি ক্যারিয়ারে ভুল সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন, যেমন ‘ফ্রিকড’ (Freaked) নামক একটি ছবিতে দাড়িওয়ালা নারীর চরিত্রে অভিনয় করা। তবে মিস্টার টি এই দাবি প্রত্যাখ্যান করে বলেন, ব্রুক শিল্ডস ও কিয়ানু রিভসের মতো তারকাদের সাথে সেই চলচ্চিত্রে অভিনয় করতে তার কোনো আপত্তি ছিল না। তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন যে, প্রামাণ্যচিত্রটিতে তার যাজকের দীর্ঘ সাক্ষাৎকার থেকে মাত্র ৩০ সেকেন্ড দেখানো হয়েছে এবং তার দাতব্য কাজ ও মেক-এ-উইশ (Make-A-Wish) ফাউন্ডেশনের শিশুদের সাথে কাজের বিষয়গুলো সম্পূর্ণ এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে।
১৯৯০-এর দশকে মিস্টার টি টি-সেল লিম্ফোমা (T-cell lymphoma) নামক ক্যান্সারে আক্রান্ত হন, যা তিনি সফলভাবে জয় করেন। ২০০৫ সালে হারিকেন ক্যাটরিনার পর দুর্গতদের সাহায্য করতে গিয়ে তিনি তার সমস্ত সোনার গয়না পরা বন্ধ করে দেন, কারণ মানুষের এই চরম বিপদের দিনে নিজের সম্পদ প্রদর্শন করাকে তিনি অসম্মানজনক মনে করেছিলেন।
ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে মিস্টার টি জানান, ১৯৮০-এর দশকের মাঝামাঝি সময়ে স্ত্রী ফিলিস ক্লার্কের (Phyllis Clark) সাথে বিবাহবিচ্ছেদের পর তিনি বর্তমানে আবার বিয়ে করতে যাচ্ছেন। তবে হবু স্ত্রীর নাম তিনি প্রকাশ করেননি। নতুন কোনো ‘রকি’ চলচ্চিত্রে অভিনয়ের প্রস্তাব এলেও তিনি তা ফিরিয়ে দেবেন বলে স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন। তিনি বলেন, “আমার জীবনের একমাত্র লক্ষ্য ছিল মায়ের জন্য একটি সুন্দর বাড়ি এবং সুন্দর পোশাক কেনা। ১৯৮০-এর দশকেই আমি তা সম্পন্ন করেছি। আমি এখন সম্পূর্ণ তৃপ্ত। ঈশ্বরের প্রতি আমার অগাধ বিশ্বাস রয়েছে এবং আমি যা চেয়েছিলাম তা পেয়েছি।”

