ইংল্যান্ডের বিপক্ষে লর্ডসে সিরিজ হারের পর পাকিস্তান ক্রিকেট বোর্ড (পিসিবি) বড় ধরনের রদবদল করেছে। প্রধান কোচ সরফরাজ আহমেদকে অব্যাহতি দেওয়ার পাশাপাশি কোচিং স্টাফদের ঢেলে সাজানো হয়েছে এবং সাতজন খেলোয়াড়কে দল থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে। সাবেক টেস্ট কোচ জেসন গিলেস্পিসহ অনেকের মতে, বারবার সিদ্ধান্ত পরিবর্তন এবং দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনার অভাব পাকিস্তান ক্রিকেটের জন্য বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে। ব্যক্তিগত নৈপুণ্য থাকলেও দল হিসেবে ধারাবাহিক সাফল্য পেতে পাকিস্তান বারবার ব্যর্থ হচ্ছে।
২০২১ সালের আগস্ট থেকে শুরু হওয়া দ্বিতীয় বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের (ডব্লিউটিসি) পর থেকে পাকিস্তান দলে ধারাবাহিকতার অভাব প্রকট। এই সময়ে ৩৭টি টেস্টে তারা মাত্র তিনবার অপরিবর্তিত একাদশ নিয়ে মাঠে নেমেছে। এই তিন ম্যাচেই তারা জয় পেয়েছে। অথচ এই ৩৭ টেস্টে তারা ৪৩ জন খেলোয়াড় ব্যবহার করেছে, যেখানে প্রথম ১১ জনের বাইরে আরও ৩২ জন নতুন মুখ এসেছে। দক্ষিণ আফ্রিকার পরেই খেলোয়াড় পরিবর্তনের দিক থেকে পাকিস্তান তালিকার শীর্ষে।
খেলোয়াড়দের পাশাপাশি কোচিং স্টাফ ও অধিনায়কত্বের ক্ষেত্রেও অস্থিরতা চরমে। গত পাঁচ বছরে ১১ বার কোচিং স্টাফ পরিবর্তন করা হয়েছে এবং গত তিন বছরে সাতজন ভিন্ন টেস্ট কোচ দায়িত্ব পালন করেছেন। মিসবাহ-উল-হক ও ওয়াকার ইউনুসের পদত্যাগের পর সাকলাইন মুশতাক, গ্রান্ট ব্র্যাডবার্ন, মিকি আর্থার ও মোহাম্মদ হাফিজের মতো কোচেরা দায়িত্ব সামলেছেন। ২০২৪ সালে জেসন গিলেস্পি ও গ্যারি কার্স্টেনকে আলাদা ফরম্যাটে দায়িত্ব দেওয়া হলেও কয়েক মাসের মধ্যেই তারা বিদায় নেন। সর্বশেষ সরফরাজ আহমেদকে লাল বলের কোচ করা হলেও ইংল্যান্ড সিরিজের ব্যর্থতায় তাকে দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে এবং এখন মাইক হেসন টেস্ট দলের দায়িত্ব নিয়েছেন।
পরিসংখ্যান বলছে, পাকিস্তানের টেস্ট ক্রিকেট ভয়াবহ সংকটে। ডব্লিউটিসির প্রথম চক্রে তারা সপ্তম, দ্বিতীয় চক্রে নবম স্থানে ছিল এবং বর্তমান চক্রে তারা পয়েন্ট তালিকার তলানিতে অবস্থান করছে। ১৯৮৭ সালের পর প্রথমবারের মতো পাকিস্তানের টেস্ট জয়ের হার ১-এর নিচে নেমে এসেছে। বিশেষ করে ঘরের মাঠেও তাদের আধিপত্য হারিয়ে গেছে। ২০২১-২৩ চক্র থেকে ঘরের মাঠে ১৭ টেস্টে মাত্র চারটি জয় পেয়েছে তারা, যা জিম্বাবুয়ের চেয়ে কিছুটা ভালো হলেও ওয়েস্ট ইন্ডিজ বা বাংলাদেশের চেয়েও খারাপ। এছাড়া ২০১৮ সাল থেকে সেন (SENA) দেশগুলোতে ১৯ টেস্ট খেলে একটিতেও জয় পায়নি তারা।
ব্যাটিংয়ের দৈন্যদশা আরও স্পষ্ট। ২০২১-২৩ চক্র থেকে ৩৭ টেস্টের ৩২ ইনিংসে তারা ২৫০ রানের নিচে অলআউট হয়েছে। বাবর আজমসহ শীর্ষ ব্যাটারদের টানা ব্যর্থতা এবং সেঞ্চুরির অভাব দলের ব্যাটিং লাইনআপকে ভঙ্গুর করে তুলেছে। বোলিংয়ের ক্ষেত্রেও ঐতিহ্যবাহী পেস আক্রমণ এখন আর আগের মতো কার্যকর নয়। পেসারদের গড় ও স্ট্রাইক রেট এখন বিশ্ব ক্রিকেটে অন্যতম দুর্বল। বিপরীতে, জয় পাওয়া ম্যাচগুলোতে স্পিনারদের ভূমিকা ছিল প্রধান। যখনই স্পিনাররা জ্বলে উঠেছে, তখনই পাকিস্তান জয় পেয়েছে। দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনার অভাবে এবং বারবার পরিবর্তনের সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসতে না পারলে পাকিস্তানের টেস্ট ক্রিকেটের এই সংকট কাটানো কঠিন বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

