ফিলিপাইনের পর্যটন এলাকা করনের কাছাকাছি একটি যাত্রীবাহী ফেরিতে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় অন্তত পাঁচজনের মৃত্যু হয়েছে। এছাড়া এখনও নিখোঁজ রয়েছেন আরও ৮৬ জন। দেশটির কোস্টগার্ডের বরাত দিয়ে এই তথ্য জানা গেছে।
এমভি জুন অ্যাস্টার (MV June Aster) নামের ফেরিটি ১১৭ জন যাত্রী ও ১৭ জন ক্রু নিয়ে ম্যানিলা থেকে রওনা হয়েছিল। এটি যখন তার গন্তব্যস্থল পালাওয়ানের জনপ্রিয় পর্যটন কেন্দ্র করনের কাছাকাছি পৌঁছায়, তখনই এতে আগুন ধরে যায়। বুধবার স্থানীয় সময় সন্ধ্যা ৬:৪৫ মিনিটে (জিএমটি ১০:৪৫) ফেরিটিতে আগুন লাগে এবং বৃহস্পতিবার বেলা ১১টা পর্যন্ত তা জ্বলছিল। কোস্টগার্ড জানিয়েছে, তীব্র স্রোত এবং ঘন ধোঁয়ার কারণে আগুন নেভানোর কাজ ব্যাহত হচ্ছে।
দুর্ঘটনার পর এ পর্যন্ত ৪৩ জনকে জীবিত উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে, তবে কতজন আহত হয়েছেন তা এখনও স্পষ্ট নয়। উদ্ধার পাওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে সাতজনকে পার্শ্ববর্তী বড় দ্বীপ কুলিয়নের (Culion) একটি হাসপাতালে নেওয়া হয়েছে, যেখানে উন্নত চিকিৎসার ব্যবস্থা রয়েছে। বাকিদের মার্সিলার ঠিক উত্তরে অবস্থিত বারাঙ্গে টুর্ডা (Barangay Turda) এলাকার একটি আশ্রয়কেন্দ্রে নিয়ে যাওয়া হয়েছে।
উদ্ধার হওয়াদের একজন রোল্যান্ড লারমা (Roland Lerma) বিবিসিকে বলেন, তিনি প্রায় দুই ঘণ্টা সাগরে ভেসেছিলেন। তিনি বলেন, "পানি অনেক ঠান্ডা ছিল। উদ্ধার করতে দেরি হলে আমি নিশ্চিতভাবেই মারা যেতাম।" উদ্ধারকাজে অংশ নেওয়া একজন প্রথম সাড়াদানকারী জানান, করন এলাকায় এমন বিপর্যয় তিনি আগে কখনো দেখেননি। তিনি এটিকে অত্যন্ত হৃদয়বিদারক বলে বর্ণনা করেন এবং জানান যে ফেরিটি তার গন্তব্য থেকে মাত্র এক ঘণ্টা দূরত্বে ছিল। কোস্টগার্ডের শেয়ার করা ভিডিওতে দেখা গেছে, ফেরিটি দাউ দাউ করে জ্বলছে এবং মানুষকে পানি থেকে উদ্ধার করে নৌকায় তোলা হচ্ছে।
কোস্টগার্ড জানিয়েছে, আগুন লাগার কারণ এখনও তদন্তাধীন। তবে বেঁচে যাওয়া ব্যক্তিদের প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে জানা গেছে, ফেরির কার্গো হোল্ড (পণ্য রাখার স্থান) থেকে আগুনের সূত্রপাত হতে পারে। এছাড়া অনেক যাত্রীর গায়ে লাইফ ভেস্ট ছিল না বলেও কোস্টগার্ড উল্লেখ করেছে।
এদিকে নিখোঁজদের স্বজনরা তীব্র উদ্বেগের মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন। রাই গার্সিয়া (Rai Garcia) নামের এক ব্যক্তির তিন পারিবারিক বন্ধু এই ফেরিতে নিখোঁজ রয়েছেন। তারা হলেন মে লরেন গ্যালেরা-নাভোয়া (Mae Lorraine Galera-Navoa), তাঁর স্বামী ইলাইজার নাভোয়া (Elyzer Navoa) এবং তাঁদের তিন বছর বয়সী মেয়ে হিরায়া জয় (Hiraya Joy)। মে লরেন তাঁর বাবার শেষকৃত্যে অংশ নিতে লুজানে গিয়েছিলেন এবং সেখান থেকে পালাওয়ানের এল নিডোতে নিজেদের বাড়িতে ফিরছিলেন। গার্সিয়ার পরিবার নিখোঁজদের সন্ধানে একটি পোস্টার তৈরি করেছে। এছাড়া ফিলিপাইন কোস্টগার্ডের ফেসবুক পেজেও অনেকে নিখোঁজ স্বজনদের খোঁজে আকুতি জানাচ্ছেন।
ফিলিপাইনে প্রায়ই নৌ-দুর্ঘটনা ঘটে থাকে। ৭,১০০টি দ্বীপের এই দ্বীপরাষ্ট্রে এক দ্বীপ থেকে অন্য দ্বীপে যাতায়াতের জন্য ফেরি অত্যন্ত সস্তা মাধ্যম। তবে প্রতিকূল আবহাওয়া, মৌসুমি বৃষ্টিপাত এবং টাইফুনের কারণে প্রায়ই এখানে দুর্ঘটনা ঘটে। দেশটিতে প্রতি বছর গড়ে ২০টি টাইফুন আঘাত হানে। এছাড়া দুর্বল রক্ষণাবেক্ষণ এবং নিরাপত্তা আইনের সঠিক প্রয়োগ না হওয়াকেও এসব দুর্ঘটনার জন্য দায়ী করা হয়। গত ২০২৩ সালেও দেশটির দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে এমভি লেডি মেরি জয় ৩ নামের একটি ফেরিতে আগুনে ৩১ জনের মৃত্যু হয়েছিল। তবে ৮৬ জন নিখোঁজ থাকায় এবারের দুর্ঘটনাটি সাম্প্রতিক বছরগুলোর মধ্যে অন্যতম ভয়াবহ দুর্যোগে পরিণত হতে পারে।

