বিখ্যাত লেখকদের মৃত্যুর পর তাদের অপ্রকাশিত পাণ্ডুলিপি বা চিত্রকর্ম খুঁজে পেয়ে তা বই আকারে প্রকাশ করার প্রবণতা বিশ্বজুড়ে বাড়ছে। সম্প্রতি 'বেরেনস্টেইন বিয়ার্স'-এর স্রষ্টা স্ট্যান ও জান বেরেনস্টেইন এবং কালজয়ী শিশুসাহিত্যিক ড. সুস (থিওডোর গিসেল)-এর মতো লেখকদের নতুন বই এভাবে আলোর মুখ দেখছে। তবে এই মরণোত্তর প্রকাশনা একদিকে যেমন পাঠকদের মধ্যে নস্টালজিয়া তৈরি করছে, অন্যদিকে তা প্রকাশনা শিল্পের মন্দা কাটানোর ব্যবসায়িক কৌশল কি না এবং এতে নৈতিকতা বজায় থাকছে কি না, তা নিয়ে তৈরি হয়েছে বিতর্ক।
স্ট্যান এবং জান বেরেনস্টেইন তাদের জীবদ্দশায় শত শত 'বেরেনস্টেইন বিয়ার্স' বই লিখেছেন ও ছবি এঁকেছেন। তবে নিজেদের কাজ গুছিয়ে রাখার ব্যাপারে তারা বেশ উদাসীন ছিলেন। খাম, ড্রয়ার কিংবা বেসমেন্টে এলোমেলোভাবে পড়ে থাকত তাদের পাণ্ডুলিপি। এমনকি একবার তেল চালিত চুল্লি ঠিকমতো পরিষ্কার না করায় তাদের আঁকা ছবি ঝুলকালিতে ঢেকে গিয়েছিল। ১৯৮০-এর দশকের শেষভাগ থেকে বাবা-মার সঙ্গে কাজ করা তাদের সন্তান মাইক বেরেনস্টেইন যখন এই ফ্র্যাঞ্চাইজির উত্তরাধিকার পান, তখন এই বিশৃঙ্খলাও তার কাঁধেই বর্তায়। ঘর পরিষ্কার ও তালিকাভুক্ত করতে গিয়ে তিনি বেশ কিছু অপ্রকাশিত বইয়ের সন্ধান পান।
এর মধ্যে ১৯৬০-এর দশকের একটি বইয়ের সন্ধান মেলে, যা সম্ভবত এই দম্পতি বিগিনার বুকস-এ থিওডোর গিসেলের (ড. সুস) অধীনে কাজ করার সময় লিখেছিলেন। ড. সুস ছিলেন বেশ কড়া ও উচ্চমানের সম্পাদক। সে সময় তার মনঃপূত না হওয়ায় বইটি প্রকাশিত হয়নি। তবে দীর্ঘ কয়েক দশক পর আগামী ৬ অক্টোবর র্যান্ডম হাউস বুকস ফর ইয়াং রিডার্স থেকে 'টু লুজ, টু টাইট, জাস্ট রাইট' (Too Loose, Too Tight, Just Right) নামে বইটি প্রকাশিত হতে যাচ্ছে।
মজার বিষয় হলো, যে গিসেলের কারণে বেরেনস্টেইন দম্পতির বইটির কপালে ড্রয়ারে বন্দি থাকার ভাগ্য জুটেছিল, তার নিজেরও একটি অপ্রকাশিত বই বাজারে এসেছে। গত জুনে ড. সুসের খুঁজে পাওয়া পাণ্ডুলিপি নিয়ে প্রকাশিত হয়েছে 'সিং দ্য ৫০ ইউনাইটেড স্টেটস!' (Sing the 50 United States!)। এছাড়া ২০২৭ সালে মরণোত্তর বই নিয়ে ফিরছেন আরেক জনপ্রিয় লেখক লিও লিওনি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, মৃত লেখকদের বই প্রকাশ তাদের ঐতিহ্য ধরে রাখার এবং নতুন প্রজন্মের কাছে চরিত্রগুলোকে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার দারুণ এক মাধ্যম। তবে প্রকাশনা শিল্পের কঠিন সময়েরও ইঙ্গিত দেয় এটি, যেখানে পরিচিত নামের ওপর ভর করে নতুন আয়ের খোঁজে মরিয়া প্রকাশকেরা। ২০২৫ সালে টানা দ্বিতীয় বছরের মতো প্রিন্ট বইয়ের বিক্রি বাড়লেও, আমেরিকানদের মধ্যে কমতে থাকা সাক্ষরতার হার এবং অবসর সময়ে বই পড়ার অভ্যাসের ঘাটতি প্রকাশকদের নতুন করে ভাবিয়ে তুলছে।
এই বাজারে নস্টালজিয়া বা স্মৃতিকাতরতা দারুণ বিক্রি হয়। র্যান্ডম হাউস চিলড্রেনস বুকসের তথ্য অনুযায়ী, ড. সুসের জনপ্রিয় বই 'ওহ, দ্য প্লেসেস ইউ’ল গো!' (Oh, the Places You’ll Go!) প্রতি বছর ১০ লাখেরও বেশি কপি বিক্রি হয়। ইতিহাসবিদ লিওনার্ড মার্কাস বলেন, সুপারশপগুলোতে সুপরিচিত বইগুলোই বেশি চলে, তাই প্রকাশকেরা সবসময় একটি ভালো 'মার্কেটিং হুক' বা বিপণন কৌশলের খোঁজ করেন। যেমন, 'হোয়ার দ্য ওয়াইল্ড থিংস আর'-এর লেখকের নতুন বই বাজারে আসছে—এমন একটি ঘোষণাই প্রকাশনা জগতের জন্য দারুণ লাভজনক। র্যান্ডম হাউস চিলড্রেনস বুকসের প্রেসিডেন্ট ও প্রকাশক ম্যালরি লোয়ার জানান, পুরোনো জনপ্রিয় বইগুলোর (ব্যাকলিস্ট) নতুন সংস্করণ বা নতুন ডিজাইন নিয়ে আসা অত্যন্ত জরুরি। তিনি বলেন, "মানুষকে বারবার ফিরিয়ে আনতে নতুন কিছু নিয়ে আসতে হবে। একই সঙ্গে নতুন প্রজন্মের অভিভাবকেরা কী খুঁজছেন, তাও আমাদের মাথায় রাখতে হয়।"
বিশ্বজুড়ে ড. সুসের বই বিক্রি হয়েছে ৮০ কোটিরও বেশি, এবং প্রতি বছর প্রায় ১ কোটি বই বিক্রি হয়। গ্রিঞ্চ বা ক্যাট ইন দ্য হ্যাট-এর মতো চরিত্রগুলো পপ কালচার, মেমে বা হ্যালোইন উৎসবে এখনো সমান জনপ্রিয়। লোয়ার বলেন, "পৃথিবী আমাদের বলছে যে তারা এখনো এগুলো নিয়ে দারুণ উত্তেজিত ও আগ্রহী।" ড. সুসের আর্কাইভ থেকে যখন 'সিং দ্য ৫০ ইউনাইটেড স্টেটস!'-এর সম্পূর্ণ কিন্তু অপ্রকাশিত পাণ্ডুলিপি পাওয়া যায়, তখন তার হয়ে কে অলঙ্করণ করবেন এবং কী ধরনের রঙ ব্যবহার করা হবে, তা নিয়ে সূক্ষ্ম সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছিল। ড. সুসের স্ত্রী অড্রে গিসেল (যিনি ২০১৮ সালে মারা যান) এর আগে 'হোয়াট পেট শুড আই গেট?' এবং 'হর্স মিউজিয়াম'-এর মতো মরণোত্তর বই প্রকাশের বিষয়টি তদারকি করেছিলেন। তবে এবার তার অনুপস্থিতিতেও সুসের দীর্ঘদিনের আর্ট ডিরেক্টর ক্যাথি গোল্ডস্মিথ বলেন, "আমরা দেখছি সেখানে ঠিক কী রয়েছে। টেড গিসেলের দৃষ্টিভঙ্গি ফুটিয়ে তোলার মতো যথেষ্ট নির্দেশনা কি আছে? তার মূল লক্ষ্য—পড়াকে সহজ ও আনন্দদায়ক করা—আমরা তাকে ছাড়া কতটা নিখুঁতভাবে করতে পারছি, সেটাই আমাদের দেখার বিষয়।"
মরণোত্তর প্রকাশনা নিয়ে লেখক ও সমালোচকদের মধ্যে নৈতিকতার বিতর্ক দীর্ঘদিনের। লোয়ার মনে করেন, লেখকের এস্টেট বা উত্তরাধিকারীদের ইচ্ছা অনুসরণ করাই শ্রেয়। তিনি বলেন, "কেউ একজন এটি প্রকাশ করেননি ঠিকই, কিন্তু তারা এটি পুড়িয়েও ফেলেননি কিংবা ‘দয়া করে এটি প্রকাশ করবেন না’ এমন কোনো নির্দেশনাও দিয়ে যাননি।" তবে ইতিহাসবিদ মার্কাস মনে করেন, অনেক সময় জীবিত অবস্থায় লেখকেরা নিজেদের কাজের সঠিক মূল্যায়ন করতে পারেন না। তাই চমৎকার কোনো সৃষ্টি যেন হারিয়ে না যায়, সেজন্য কিছুটা নমনীয়তা থাকা প্রয়োজন। তবে ড. সুসের জীবনীকার ফিলিপ নেল এই নতুন বই নিয়ে কিছুটা সংশয় প্রকাশ করেছেন। তার মতে, শিল্পী হিসেবে সুস ছিলেন একজন নিখুঁতবাদী (পারফেকশনিস্ট)। তিনি কখনোই নিম্নমানের কিছু প্রকাশ করতে চাইতেন না, তাই সম্ভবত তিনি এই মরণোত্তর প্রকাশনা অনুমোদন করতেন না।
অন্যদিকে, অনেক পরিবারের জন্য এটি প্রয়াত প্রিয়জনদের স্মৃতির সঙ্গে যুক্ত হওয়ার এক আবেগময় মাধ্যম। ইতিহাসবিদ মার্কাস তার প্রয়াত স্ত্রী ও লেখক অ্যামি শোয়ার্টজের অপ্রকাশিত বই '১০০ থিংস আই লাভ অ্যাবাউট স্কুল' ড্রয়ার থেকে বের করে প্রকাশে সাহায্য করেছিলেন। একইভাবে মাইক বেরেনস্টেইন জানান, বাবা-মায়ের ফেলে যাওয়া কাজ শেষ করা তাকে তার শৈশবের দিনগুলোতে ফিরিয়ে নিয়ে যায়। তিনি বলেন, "আমি শুধু চেষ্টা করি কাজটা যেন খুব বেশি নষ্ট না হয়ে যায়… এর মূল উদ্দেশ্য, মূল্যবোধ, শিল্পশৈলী, লেখার মান এবং এর ভেতরের রসবোধ বজায় রেখে আগের ধারাটি বজায় রাখার চেষ্টা করি।"
চারবার ক্যালডেকট অনার জয়ী লিও লিওনির নাতনি অ্যানি লিওনিও একই দায়িত্ব পালন করছেন। লিওনি মারা যাওয়ার প্রায় এক বছর আগে অ্যানিকে একটি খসড়া দিয়েছিলেন। প্রায় ৩০ বছর পর, ২০২৭ সালের শরতে ইলাস্ট্রেটর ওগে মোরার সহায়তায় প্রকাশিত হতে যাচ্ছে 'হাউ টু মেক পেপার মাইস' (How to Make Paper Mice)। ১৯৯৯ সালে মৃত্যুর আগে লিওনি তার নাতনিকে তার কাজ রক্ষা ও প্রচারের দায়িত্ব দিয়ে যান। অ্যানি নিজেকে 'এলভিস প্রিসলির ম্যানেজারের একটি ভালো সংস্করণ' হিসেবে বর্ণনা করে বলেন, এই দীর্ঘ পথচলায় তিনি অনেক কিছু শিখছেন এবং প্রয়াত দাদার ঐতিহ্যকে পরম যত্নে আগলে রাখছেন।
