শ্রীলঙ্কার মাটিতে নিজের প্রথম অ্যাওয়ে টেস্ট খেলতে নেমে ঐতিহ্যবাহী বাঁহাতি স্পিনের দারুণ প্রদর্শনী দেখালেন ভারতের তরুণ স্পিনার মানব সুথার। সোমবার লঙ্কান ব্যাটারদের বিপক্ষে তাঁর নিয়ন্ত্রিত ও বুদ্ধিদীপ্ত বোলিং ক্রিকেটপ্রেমীদের অতীতে ফিরিয়ে নিয়ে গেছে। একই দিনে বল হাতে অসাধারণ পারফর্ম করেছেন অভিজ্ঞ রবীন্দ্র জাদেজাও, যিনি টেস্ট ক্রিকেটে ৩৫০ উইকেটের মাইলফলক স্পর্শ করেছেন।
গত জুনে আফগানিস্তানের বিপক্ষে অভিষেক হওয়া সুথার সোমবার শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে প্রথম বলটি ছুড়েই বুঝিয়ে দেন, তিনি আধুনিক যুগের প্রথাগত স্পিনারদের চেয়ে কিছুটা আলাদা। সাধারণত বর্তমান যুগের স্পিনাররা সোজা দৌড়ে এসে বল করেন, কিন্তু সুথার আম্পায়ার ও উইকেটের মাঝখান দিয়ে কোণাকুণি রান-আপ নিয়ে বল করেন, যা তাঁকে পুরোপুরি সাইড-অন পজিশনে যেতে সাহায্য করে। তাঁর হাই-আর্ম রিলিজ এবং বলের পেছনে আঙুলের নিখুঁত ব্যবহারে বাতাসে অতিরিক্ত ওভারস্পিন তৈরি হয়। এই কৌশলেই তিনি দিনেশ চান্ডিমালকে বোকা বানান। চান্ডিমালের চোখের সীমানার ওপর দিয়ে ঝুলিয়ে দেওয়া বলটি দ্রুত ডিপ করে উইকেটে পড়ে এবং চান্ডিমাল তা ডিফেন্ড করতে গিয়ে ঋষভ পন্থের হাতে ক্যাচ দিয়ে মাত্র ৪ রানে সাজঘরে ফেরেন। বলটির গতি ছিল ঘণ্টায় ৮৮.৩ কিলোমিটার।
লঙ্কান ইনিংসের অষ্টম ওভারে বল করতে এসে নিজের প্রথম স্পেলে ক্রমাগত ডিপ এবং বাউন্স আদায় করে নেন সুথার। এক পর্যায়ে টিভি গ্রাফিকে দেখা যায়, তিনি গড়ে ৬ ডিগ্রি টার্ন পাচ্ছিলেন, যা বর্তমান সময়ের যেকোনো ফিঙ্গার স্পিনারের জন্য বিরল। প্রথম স্পেলে তাঁর বোলিং ফিগার ছিল ৬-১-১৩-২। তাঁর দ্বিতীয় শিকার ছিলেন লাহিরু উদারা। সুথারের টার্নের মুখে শট খেলতে গিয়ে ভারসাম্য হারিয়ে ব্যাকওয়ার্ড পয়েন্টে ক্যাচ দেন উদারা। পুরো দিনে সুথার ৪টি উইকেট শিকার করেন।
২০০৭ সাল থেকে বল-ট্র্যাকিং ডেটা সংরক্ষণের পর থেকে দেখা গেছে, উইকেট-রাউন্ডে বল করার সময় সুথারের রিলিজ পয়েন্ট উইকেটের সবচেয়ে কাছাকাছি। বর্তমান যুগের বেশিরভাগ বাঁহাতি স্পিনার যেখানে উইকেট থেকে কিছুটা দূর থেকে বল রিলিজ করেন, সেখানে সুথারের এই কৌশল ডানহাতি ব্যাটারদের জন্য বড় হুমকি তৈরি করে। শ্রীলঙ্কার কন্ডিশনে তাঁর এই বোলিং শৈলী দারুণ কার্যকর প্রমাণিত হয়েছে। ঐতিহাসিক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ভারতের কিংবদন্তি স্পিনার রবিচন্দ্রন অশ্বিনের ঘরের মাঠে বোল্ড বা এলবিডব্লিউর হার ৪৬ শতাংশ হলেও শ্রীলঙ্কায় তা ছিল ৩৪ শতাংশ। তবে সেখানে অশ্বিন ২১.৫৭ গড়ে ৩৮টি উইকেট নিয়েছিলেন।
অবশ্য ম্যাচ যত গড়িয়েছে, বল পুরোনো হওয়ার সাথে সাথে সুথারের কিছু সীমাবদ্ধতাও প্রকাশ পেয়েছে। বিশেষ করে লঙ্কান দুই বাঁহাতি ব্যাটার সোনাল দিনুশা ও নিরোশান ডিকভেলা ষষ্ঠ উইকেটে ১৪৬ রানের জুটি গড়ে ভারতকে বেশ ভুগিয়েছেন। সুথারের বিপক্ষে ডানহাতি ব্যাটারদের কন্ট্রোল পার্সেন্টেজ ৭৫ শতাংশ হলেও বাঁহাতিদের ক্ষেত্রে তা ছিল ৮৪.৩৩ শতাংশ।
অন্যদিকে, অভিজ্ঞ রবীন্দ্র জাদেজা ৩টি উইকেট নিয়ে টেস্ট ক্রিকেটে ৩৫০ উইকেটের মাইলফলক পার করেন। জাদেজার বোলিং দেখতে সুথারের মতো অতটা আকর্ষণীয় না হলেও তিনি ছিলেন সমান বিপজ্জনক। শ্রীলঙ্কার অধিনায়ক ধনঞ্জয় ডি সিলভাকে আউট করার ক্ষেত্রে জাদেজার নিখুঁত লাইন-লেন্থের প্রমাণ মেলে। টানা ১৩টি বল খেলে ডি সিলভা যখন পরাস্ত হচ্ছিলেন, ঠিক ১৪তম বলটিতে সুইং ও টার্নের ফাঁদে পড়ে স্লিপে ক্যাচ দিতে বাধ্য হন তিনি। জাদেজার বিপক্ষে ডানহাতি ব্যাটারদের কন্ট্রোল পার্সেন্টেজ ছিল ৭২.৩৪ শতাংশ এবং বাঁহাতিদের ৮৩.৯৫ শতাংশ।
মাত্র ২৪ বছর বয়সী মানব সুথারকে অশ্বিন ও জাদেজার পর ভারতের সবচেয়ে সম্ভাবনাময় ফিঙ্গার স্পিনার হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। তাঁর বোলিংয়ে আরও উন্নতির সুযোগ রয়েছে এবং জাদেজার মতো একজন বিশ্বমানের স্পিনারের কাছ থেকে শেখার দারুণ সুযোগ রয়েছে এই তরুণের সামনে।

