ভারতীয় ক্রিকেট দলের সাবেক ফিল্ডিং কোচ টি দিলীপ মনে করেন, ইন্ডিয়ান premiয়ার লিগ (আইপিএল) দেশের ফিল্ডিং সংস্কৃতিকে ধ্বংস করেনি, বরং একে সম্পূর্ণ বদলে দিয়েছে। দীর্ঘ চার বছর ভারতের ফিল্ডিং কোচের দায়িত্ব পালন করা দিলীপ ক্রিকবাজের সাথে এক সাক্ষাৎকারে ফিল্ডিংয়ের বিভিন্ন প্রযুক্তিগত দিক, আধুনিক ক্রিকেটের চ্যালেঞ্জ এবং বৈচিত্র্যময় ক্রীড়া অনুশীলনের গুরুত্ব নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন।
আইপিএলের ইতিবাচক প্রভাবের কথা উল্লেখ করে দিলীপ বলেন, এই টুর্নামেন্ট তরুণ ভারতীয় খেলোয়াড়দের বিশ্বের সেরা ফিল্ডারদের সাথে ড্রেসিংরুম ভাগাভাগি করার সুযোগ করে দিয়েছে। তরুণরা দেখতে পায় কীভাবে বিশ্বমানের ফিল্ডাররা প্রস্তুতি নেন এবং খেলায় নিজেদের নিয়োজিত রাখেন। সাম্প্রতিক সময়ে ক্যাচিংয়ের দক্ষতায় কিছুটা ওঠানামা দেখা গেলেও সামগ্রিকভাবে আইপিএল বাউন্ডারি ফিল্ডিং, রিলে ওয়ার্ক, বল কুড়ানো ও দ্রুত থ্রো করার দক্ষতাকে এক অন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছে। দিলীপ টি-২০ (T20) ক্রিকেটকে কোনো সমস্যা হিসেবে দেখতে রাজি নন। তাঁর মতে, টি-২০ ক্রিকেটে ব্যবধান কম হওয়ায় তা কোচ ও খেলোয়াড়দের প্রতিনিয়ত নতুন কিছু করার জন্য উৎসাহিত করেছে এবং এই ফরম্যাট ফিল্ডিংকে সম্পূর্ণ অন্য স্তরে নিয়ে গেছে। খেলোয়াড়রা এখন মাঠে আরও দ্রুত দৌড়াতে পারেন, বাউন্ডারি লাইনে ক্যাচ নেওয়ার দক্ষতা অনেক উন্নত হয়েছে এবং বল কুড়িয়ে দ্রুত থ্রো করার গতিও বেড়েছে।
ফিল্ডিংয়ের তিনটি প্রধান দিক—ক্যাচ ধরা, বল থামানো এবং থ্রো করা নিয়ে দিলীপ তাঁর কোচিং দর্শনের ব্যাখ্যা দেন। তিনি বলেন, স্লিপ ক্যাচ, আউটফিল্ডের উঁচু ক্যাচ এবং বৃত্তের ভেতরের ফ্ল্যাট ক্যাচের জন্য ভিন্ন ভিন্ন দক্ষতার প্রয়োজন হয়। গ্রাউন্ড ফিল্ডিংয়ের ক্ষেত্রে বল ব্যাটে লাগার আগেই খেলোয়াড়ের প্রস্তুতি শুরু হয়। অন্যদিকে, থ্রো করার ক্ষেত্রে কেবল শক্তির চেয়ে বল ছাড়ার গতি, নির্ভুলতা এবং সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়া বেশি গুরুত্বপূর্ণ। প্রতিটি খেলোয়াড়কে তার ম্যাচ পজিশন অনুযায়ী আলাদা অনুশীলন করানো উচিত।
ছোটবেলায় একাধিক খেলাধুলার অভ্যাস একজন খেলোয়াড়কে আরও ভালো ফিল্ডার হতে সাহায্য করে বলে বিশ্বাস করেন দিলীপ। বাস্কেটবল খেললে স্থানিক সচেতনতা, ভারসাম্য ও লাফানোর ক্ষমতা বাড়ে; ফুটবল পায়ের কাজ ও শরীরের নিচের অংশের সমন্বয় উন্নত করে এবং ব্যাডমিন্টন বা টেনিস খেললে প্রতিক্রিয়া ও চটপটে ভাব বাড়ে। তবে ক্রিকেটের নিজস্ব কিছু দক্ষতা যেমন ব্যাটের সুইং বোঝা বা বলের গতিপথ অনুমান করা আলাদাভাবে শিখতে হয়। তিনি আরও জানান, 'অ্যান্টিসিপেশন' বা বল কোন দিকে যাবে তা আগে থেকে অনুমান করা কোনো আন্দাজের বিষয় নয়, এটি ম্যাচ সচেতনতা ও অ্যাঙ্গেল বোঝার মাধ্যমে তৈরি হয়।
ফিল্ডিংয়ের তথ্য বা ডেটা বিশ্লেষণের অভাব নিয়ে বিস্ময় প্রকাশ করে সাবেক এই কোচ বলেন, বোলিং বা ব্যাটিংয়ের মতো ফিল্ডিংয়ের ডেটা এখনো সেভাবে উন্মুক্ত নয়। বল মারার সময় ফিল্ডারের অবস্থান, প্রতিক্রিয়া জানানোর সময়, বলের দিকে যাওয়ার গতিপথ এবং থ্রো করার নির্ভুলতা পরিমাপের জন্য আধুনিক প্রযুক্তির আরও ব্যবহার হওয়া উচিত। নিজের কোচিং ক্যারিয়ারে সবচেয়ে বড় অর্জনের কথা বলতে গিয়ে তিনি কোনো একক খেলোয়াড়ের নাম না নিয়ে পুরো বোলিং ইউনিটের প্রশংসা করেন। বোলাররা যেভাবে রান বাঁচানো, সতীর্থকে ব্যাক-আপ দেওয়া এবং কঠিন স্পেল শেষেও ক্যাচ নেওয়ার ক্ষেত্রে দায়িত্বশীলতা দেখিয়েছেন, তা তাকে সবচেয়ে বেশি তৃপ্তি দিয়েছে।
আধুনিক টি-২০ (T20) ক্রিকেটের ব্যস্ত সূচি প্রসঙ্গে দিলীপ বলেন, ঘনঘন ম্যাচ, ভ্রমণ ও ক্লান্তির কারণে খেলোয়াড়দের মূল মনোযোগ চলে যায় ব্যাটিং বা বোলিংয়ের দিকে। ফ্র্যাঞ্চাইজি ক্রিকেটে অনেক সময় ফিল্ডিং অনুশীলন ঐচ্ছিক থাকে, যা ক্যাচিংয়ের ধারাবাহিকতায় প্রভাব ফেলে। এর সমাধান হিসেবে তিনি ঐচ্ছিক দিনগুলোতেও অল্প সময়ের জন্য হলেও উচ্চমানের ক্যাচিং অনুশীলনের পরামর্শ দেন। এছাড়া আন্তর্জাতিক মানের প্রতিষ্ঠিত খেলোয়াড়দের ক্ষেত্রে বড় কোনো পরিবর্তনের চেয়ে ছোটখাটো সমন্বয় এবং নতুন ভেন্যুর বাতাস বা আলোর সাথে মানিয়ে নেওয়ার ওপর জোর দেন তিনি। কারণ ক্যাচিং মূলত স্পর্শ এবং আত্মবিশ্বাসের বিষয়।

