বিশ্বখ্যাত ব্যান্ড ‘দ্য বিটলস’-এর ‘অ্যাবে রোড’ অ্যালবামের প্রচ্ছদটি ইতিহাসের অন্যতম জনপ্রিয় এবং বহুবার অনুকরণ করা একটি ছবি। সম্প্রতি চলচ্চিত্র নির্মাতা স্যাম মেন্ডেস তাঁর নির্মাণাধীন চারটি বিটলস বায়োপিকের জন্য এই দৃশ্যটি পুনরায় ফুটিয়ে তুলেছেন। ১৯৬৯ সালের ৮ আগস্ট আলোকচিত্রী ইয়ান ম্যাকমিলানের ক্যামেরায় বন্দি হওয়া জেব্রা ক্রসিং পারাপারের এই অতি সাধারণ দৃশ্যটি কীভাবে বিশ্বজুড়ে এক অলৌকিক আকর্ষণে পরিণত হলো, তার পেছনে রয়েছে গভীর এক শিল্পভাবনা।
ছবিটির মূল সৌন্দর্য শুধু জেব্রা ক্রসিংয়ে হাঁটা চার তরুণের মধ্যে নয়, বরং তাদের পেছনের রাস্তাটির মধ্যেও নিহিত। উত্তর লন্ডনের সেই রাস্তাটি যেন এক নিখুঁত নীল আকাশের দিকে মিলিয়ে গেছে। গ্রীষ্মের সবুজ গাছে ঢাকা ইটের বাড়িগুলো প্রচ্ছদটিকে ডেভিড হকনির আঁকা কোনো পরাবাস্তব ছবির মতো ফুটিয়ে তুলেছে। রাস্তার মাঝখানের সাদা দাগ এবং জেব্রা ক্রসিংয়ের কালো-সাদা স্ট্রাইপগুলো ছবিটিতে এক ধরনের মনস্তাত্ত্বিক স্পষ্টতা এনে দিয়েছে।
এটি কোনো আকস্মিক ছবি ছিল না, বরং এটি ছিল একটি ধারণাগত শিল্প বা কনসেপ্টুয়াল আর্ট। সেই বছরই জন লেনন বিশ্বের অন্যতম প্রথাবিরোধী শিল্পী ইয়োকো ওনোকে বিয়ে করেন, যার ফলে ব্যান্ডটি এ ধরনের আধুনিক শিল্পের সাথে পরিচিত ছিল। প্রথমে নেপালে গিয়ে ছবি তোলার একটি পরিকল্পনা বাতিল হওয়ার পর, পল ম্যাককার্টনি উত্তর লন্ডনের সেন্ট জনস উডের রেকর্ডিং স্টুডিওর বাইরে এই ছবি তোলার প্রস্তাব দেন। ম্যাককার্টনি নিজেই খসড়া এঁকে পুরো দৃশ্যটি পরিকল্পনা করেছিলেন, যেখানে জেব্রা ক্রসিংয়ের ওপর চারজনকে কাঠির মতো অবয়বে দেখানো হয়েছিল। ছবি তোলার দিন ট্রাফিক থামানোর জন্য একজন পুলিশ সদস্যকে দায়িত্ব দেওয়া হয় এবং ম্যাকমিলান একটি মইয়ের ওপর দাঁড়িয়ে ছবিটি তোলেন।
১৯৬৬ সাল থেকে ম্যাককার্টনি বেলজিয়ান পরাবাস্তববাদী চিত্রশিল্পী রেনে মাগ্রিতের ছবি সংগ্রহ করতে শুরু করেছিলেন। অ্যাবে রোডের এই প্রচ্ছদে মাগ্রিতের সেই পরাবাস্তব ও অদ্ভুত অথচ শান্ত ভাবের প্রভাব স্পষ্ট। এটি কেবল একটি ছবি নয়, এটি ছিল নিখুঁত ব্রিটিশ সংস্কৃতির এক উদযাপন, কারণ জেব্রা ক্রসিং মূলত একটি ব্রিটিশ অনুষঙ্গ যা নিউ ইয়র্কে দেখা যায় না।
প্রচ্ছদটিতে বিটলসের চার সদস্যের মধ্যকার অভ্যন্তরীণ রসায়ন ও ব্যক্তিত্বের প্রকাশ ঘটেছে। জন লেনন সবার সামনে হাঁটছেন, তবে তাঁর মুখটি পুরোপুরি দেখা যাচ্ছে না এবং তাঁকে কিছুটা উদাসীন মনে হচ্ছে। লেনন সেই সেপ্টেম্বর মাসেই ব্যান্ড ছাড়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন, যা তাঁর এই হেঁটে চলে যাওয়ার ভঙ্গির সাথে মিলে যায়। অন্যদিকে, ম্যাককার্টনির খালি পা নিয়ে এক অদ্ভুত গুজব ছড়িয়ে পড়েছিল যে তিনি নাকি মারা গেছেন। এই ষড়যন্ত্র তত্ত্ব অনুযায়ী, কালো পোশাক পরা রিঙ্গো স্টার ছিলেন শেষকৃত্য পরিচালক এবং জর্জ হ্যারিসন ছিলেন কবর খননকারী।
বাস্তবে এই তত্ত্ব হাস্যকর ছিল, কারণ ম্যাককার্টনি নিজেই ছিলেন এই ছবির মূল পরিকল্পনাকারী। ব্যান্ডের প্রতি সবচেয়ে বেশি বিশ্বাসী ম্যাককার্টনি যেন জুতো খুলে নিজেকে সেই স্টুডিওর বাইরে চিরতরে বন্দি করে রাখতে চেয়েছিলেন। ১৯৬৯ সালের জানুয়ারি মাসে লন্ডনের স্যাভিল রো-তে অ্যাপল কর্পসের ছাদে করা তাদের শেষ লাইভ পারফরম্যান্সের মতোই, অ্যাবে রোডের এই ছবিও চারজন কিংবদন্তিকে চিরকালের জন্য ফ্রেমে বেঁধে রেখেছে। আজ পর্যন্ত রেড হট চিলি পেপার্স, কানিয়ে ওয়েস্ট থেকে শুরু করে ফ্রান্সিসকান সন্ন্যাসী এবং বুকার টি অ্যান্ড দ্য এমজিস-এর মতো অসংখ্য শিল্পী ও পর্যটক এই ঐতিহাসিক ছবির অনুকরণ ও প্যারোডি করে চলেছেন।

