ক্রিপ্টোকারেন্সি বা বিটকয়েন নিয়ে বিশ্বজুড়ে ব্যাপক উন্মাদনা এবং মার্কিন নীতিনির্ধারকদের নানা উদ্যোগ সত্ত্বেও যুক্তরাষ্ট্রে ক্রিপ্টো বিনিয়োগকারীর সংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে কমছে। সম্প্রতি প্রকাশিত এক গবেষণা প্রতিবেদনে দেখা গেছে, বিপুল সংখ্যক মার্কিন নাগরিক ক্রিপ্টো বাজার থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন।
আরবান ইনস্টিটিউটের গত ৯ জুলাইয়ের এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রায় ১৭ শতাংশ মার্কিন প্রাপ্তবয়স্ক কোনো না কোনো সময় ক্রিপ্টোকারেন্সি কিনেছিলেন। তবে বর্তমানে মাত্র ৯ শতাংশ মার্কিনির কাছে ক্রিপ্টো রয়েছে। অর্থাৎ, প্রায় অর্ধেক বিনিয়োগকারীই ইতিমধ্যে এই বাজার ছেড়ে চলে গেছেন। এর বিপরীতে দেশটির প্রায় ৬২ শতাংশ মার্কিন নাগরিক শেয়ার বাজারে বিনিয়োগ করে থাকেন।
২০২৪ সালের জানুয়ারিতে অবশ্য সেই পরিস্থিতির পরিবর্তন হয়েছিল, যখন ফেডারেল নিয়ন্ত্রকরা সাধারণ মার্কিন বিনিয়োগকারীদের জন্য শেয়ারের মতোই স্পট বিটকয়েন ইটিএফ কেনাবেচার অনুমতি দেওয়ার পক্ষে ভোট দেন।
বিটকয়েনের মূল্যের বড় ধরনের পতনই বিনিয়োগকারীদের এই বাজার ছাড়ার অন্যতম প্রধান কারণ বলে মনে করা হচ্ছে। শীর্ষ ক্রিপ্টোকারেন্সি বিটকয়েনের মূল্য ২০২৫ সালের অক্টোবরের প্রায় ১,২৫,০০০ ডলার থেকে কমে ২০২৬ সালের জুলাইয়ের শেষের দিকে প্রায় ৬৫,০০০ ডলারে নেমে এসেছে। দ্য মোটলি ফুল-এর ক্রিপ্টো বিশ্লেষক অ্যালেক্স কারচিডি জানান, বাজারে নতুন বিনিয়োগকারীদের কোনো বড় জোয়ার আসেনি। বরং গত অক্টোবরে বাজার ধসের পর থেকে অনেক পেশাদার বিনিয়োগকারী বাজার ছেড়েছেন বা নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়েছেন।
অথচ মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ক্রিপ্টোকারেন্সির প্রসারে জোর প্রচার চালিয়েছিলেন। তিনি যুক্তরাষ্ট্রকে "ক্রিপ্টোর বৈশ্বিক রাজধানী" হিসেবে গড়ে তোলার প্রতিশ্রুতি দেন এবং ২০২৫ সালের এক নির্বাহী আদেশে ডিজিটাল মুদ্রার ফেডারেল নিয়ন্ত্রণ ও জাতীয় ক্রিপ্টো মজুদ গড়ে তোলার কথা বলেন। ট্রাম্পের পারিবারিক ব্যবসাগুলোও ক্রিপ্টো প্রকল্প থেকে বিপুল লাভ করেছে; দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমসের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে তাদের বিভিন্ন ক্রিপ্টো প্রকল্প থেকে ১.৪ বিলিয়ন ডলার আয় হয়েছে। এছাড়া, ট্রাম্পের শ্রম মন্ত্রণালয় অবসরকালীন সঞ্চয় স্কিমে ক্রিপ্টো ও অন্যান্য বিকল্প বিনিয়োগ যুক্ত করার আইনি ও নিয়ন্ত্রণমূলক বাধা কমানোর প্রস্তাব করেছে।
তবে সমালোচকদের মতে, অত্যন্ত অস্থির প্রকৃতির হওয়ায় অবসরকালীন সঞ্চয়ে ক্রিপ্টোর কোনো স্থান থাকা উচিত নয়। আরবান ইনস্টিটিউটের জ্যেষ্ঠ গবেষণা সহযোগী লুইসা গডিনেজ-পুইগ বলেন, অনেকের কাছেই ক্রিপ্টো একটি রহস্য এবং এটি বোঝার জন্য বাড়তি পড়াশোনার প্রয়োজন রয়েছে। ইনভেস্টোপিডিয়ার প্রধান সম্পাদক ক্যালেব সিলভারের মতে, দাম কমতে দেখে অনেকেই তাদের ক্রিপ্টো বিক্রি করে দিয়েছেন, কারণ তাদের মূল লক্ষ্য ছিল কেবল দ্রুত মুনাফা করা।
বর্তমানে যারা ক্রিপ্টো ধরে রেখেছেন, তাদের ৪৫ শতাংশ বিনিয়োগে বৈচিত্র্য আনতে, ৩৭ শতাংশ নতুন প্রযুক্তির প্রতি আগ্রহ থেকে এবং ২৭ শতাংশ ক্রিপ্টোকে ভবিষ্যতের মুদ্রা মনে করে এতে যুক্ত আছেন। তবে অধিকাংশ বিনিয়োগকারীর পোর্টফোলিও বেশ ছোট; প্রায় ৪০ শতাংশ (পাঁচ ভাগের দুই ভাগ) বিনিয়োগকারীর কাছে ২৫০ ডলারের কম মূল্যের ক্রিপ্টো রয়েছে। গবেষণায় দেখা গেছে, ক্রিপ্টো বিনিয়োগকারীদের বড় অংশই তরুণ এবং পুরুষ। এছাড়া অন্যান্য জাতিগোষ্ঠীর চেয়ে এশীয়-আমেরিকানদের মধ্যে ক্রিপ্টো মালিকানার হার অনেক বেশি।
আরবান ইনস্টিটিউট তাদের প্রতিবেদনে সুপারিশ করেছে যে, ব্যাংক ও এক্সচেঞ্জগুলোর মতো ক্রিপ্টো সেবাদাতাদের ঝুঁকির বিষয়ে স্পষ্ট ও মানসম্মত তথ্য প্রকাশ করা বাধ্যতামূলক করা উচিত। মর্নিংস্টার-এর পোর্টফোলিও স্ট্র্যাটেজিস্ট অ্যামি আরনট মনে করেন, পোর্টফোলিওতে ক্রিপ্টোর অনুপাত ৫ শতাংশ বা তার কম রাখা বুদ্ধিমানের কাজ হবে, এমনকি অনেকে চাইলে এটি পুরোপুরি এড়িয়েও যেতে পারেন।
