ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন যুক্তরাষ্ট্রে অভিবাসীদের নাগরিকত্ব বাতিলের বিতর্কিত ও ব্যয়বহুল প্রক্রিয়াটিকে নজিরবিহীনভাবে জোরদার করছে। ২০২৫ সালের শুরু থেকে এ পর্যন্ত বিচার বিভাগ (ডিওজে) প্রায় ৯০ জনের নাগরিকত্ব বাতিলের জন্য আদালতে মামলা করেছে এবং আগামী অক্টোবরের মধ্যে এই সংখ্যা ২৫০-এ উন্নীত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। প্রশাসনের এই পদক্ষেপকে যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে অন্যতম বৃহত্তম নাগরিকত্ব প্রত্যাহার অভিযান হিসেবে বর্ণনা করা হচ্ছে।
ফেডারেল আইন অনুযায়ী, কেউ যদি জালিয়াতি বা মিথ্যা তথ্য দিয়ে—যেমন ভুয়া পরিচয় ব্যবহার করে বা অপরাধের রেকর্ড গোপন করে—নাগরিকত্ব অর্জন করেন, তবে আদালত তা বাতিল করতে পারে। তবে ট্রাম্প প্রশাসনের এই তৎপরতার গতি অতীতের যেকোনো সরকারের চেয়ে অনেক বেশি। উদাহরণস্বরূপ, জো বাইডেনের চার বছরের মেয়াদে মাত্র ২৪টি এমন মামলা করা হয়েছিল, যেখানে ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে এই সংখ্যা ছিল ১০২টি (মতান্তরে ১৬৮টি)। কেস ওয়েস্টার্ন রিজার্ভ ইউনিভার্সিটির আইনের অধ্যাপক ক্যাসান্ড্রা রবার্টসন বলেন, "এটি এমন একটি বড় ধরনের বৃদ্ধি যা আমরা গত কয়েক দশকে দেখিনি।"
ট্রাম্প প্রশাসন দাবি করেছে, যারা জালিয়াতি বা অপরাধের মাধ্যমে নাগরিকত্ব পেয়েছেন, তাদের লক্ষ্য করেই এই অভিযান চালানো হচ্ছে। হোমল্যান্ড সিকিউরিটি সেক্রেটারি মার্কওয়েন মুলিন এক বিবৃতিতে বলেন, "নাগরিকত্ব পাওয়ার প্রক্রিয়ায় জালিয়াতি করলে মার্কিন নাগরিকত্ব ধরে রাখার অধিকার হারাতে হয়। আমাদের হাতে থাকা সব ধরনের উপায় ব্যবহার করে এই জালিয়াতি চক্রকে চিহ্নিত ও বহিষ্কার করতে ডিএইচএস প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।" এছাড়া অ্যাসিস্ট্যান্ট অ্যাটর্নি জেনারেল ব্রেট শুম্যাট সতর্ক করে বলেছেন, "যারা প্রতারণা করে নাগরিকত্ব পেয়েছেন, তাদের কোনো ছাড় দেওয়া হবে না। আমরা কেবল শুরু করেছি, সামনে আরও অনেক মামলা আসছে।"
তবে অভিবাসন বিশেষজ্ঞ ও সাবেক সরকারি আইনজীবীরা এই উদ্যোগের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। বিচার বিভাগের সাবেক আইনজীবী স্টেসি ইয়ং মনে করেন, এই প্রক্রিয়া অত্যন্ত ধীরগতির এবং এটি প্রশাসনের সামগ্রিক ডিপোর্টেশন (বহিষ্কার) লক্ষ্যে তেমন কোনো প্রভাব ফেলবে না। তিনি বলেন, "এর মাধ্যমে আসলে একটি বার্তাই দেওয়া হচ্ছে যে, অভিবাসীদের অর্জিত নাগরিকত্ব স্থায়ী নয়, বরং অনিরাপদ।" সমালোচকদের আশঙ্কা, এই অভিযান যুক্তরাষ্ট্রের ২ কোটি ৬০ লাখের বেশি ন্যাচারালাইজড (অর্জিত নাগরিকত্ব পাওয়া) নাগরিকের মনে ভীতি তৈরি করতে পারে এবং এর ফলে জালিয়াতি বা দুর্নীতির মতো অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ মামলার প্রসিকিউশন থেকে মনোযোগ ও সম্পদ অন্যদিকে সরে যাবে।
ঐতিহাসিকভাবে, ১৯৬৭ সালে সুপ্রিম কোর্টের একটি রায়ের পর থেকে নাগরিকত্ব বাতিলের ঘটনা বিরল হয়ে পড়ে। ওই রায়ে বলা হয়েছিল, কেবল জালিয়াতি বা ইচ্ছাকৃত মিথ্যা তথ্য দেওয়ার প্রমাণ পেলেই নাগরিকত্ব বাতিল করা যাবে। এর আগে প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ এবং ১৯৫০-এর দশক পর্যন্ত রাজনৈতিক শত্রু ও কমিউনিস্ট সন্দেহে প্রায় ২২,০০০ মানুষের নাগরিকত্ব কেড়ে নেওয়া হয়েছিল। ইউনিভার্সিটি অব ভার্জিনিয়ার আইনের অধ্যাপক আমান্ডা ফ্রস্ট বলেন, সুপ্রিম কোর্টের ওই রায়ের পর ডেমোক্র্যাট ও রিপাবলিকান উভয় প্রশাসনই বুঝতে পেরেছিল যে নাগরিকত্ব বাতিলের বিষয়টি অত্যন্ত সীমিত পরিসরে ব্যবহার করা উচিত, এটি অভিবাসন নিয়ন্ত্রণের সাধারণ হাতিয়ার নয়।
বর্তমানে দায়ের হওয়া মামলাগুলোর মধ্যে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই গুরুতর অপরাধের (যেমন যৌন নির্যাতন, অর্থ জালিয়াতি, মাদক চোরাচালান) রেকর্ড গোপন করা বা ভুয়া নাম ব্যবহারের অভিযোগ রয়েছে। কিছু মামলায় আল-কায়েদা বা আল-শাবাবের মতো বিদেশি সন্ত্রাসী গোষ্ঠীকে সমর্থন বা যুদ্ধাপরাধে জড়িত থাকার অভিযোগও আনা হয়েছে। তবে বোস্টন কলেজের আইনের অধ্যাপক ড্যানিয়েল কানস্ট্রুম বলেন, "আপাতদৃষ্টিতে এই মামলাগুলো পূর্ববর্তী প্রশাসনের করা মামলার চেয়ে খুব একটা আলাদা নয়।" তবে এবার বিচার বিভাগের সিভিল ডিভিশনের পাশাপাশি দেশজুড়ে ইউএস অ্যাটর্নি অফিসগুলোকে এই প্রক্রিয়ায় সরাসরি যুক্ত করা হয়েছে, যা আগে কখনো দেখা যায়নি।
ট্রাম্প প্রশাসনের এই অভিযানের রাজনৈতিক লক্ষ্য নিয়েও বিতর্ক তৈরি হয়েছে। ট্রাম্প নিজেই মিনেসোটার ডেমোক্র্যাট প্রতিনিধি ইলহান ওমর এবং নিউইয়র্কের মেয়র জোহরান মামদানীর নাগরিকত্ব নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। এছাড়া কংগ্রেসে রিপাবলিকান প্রতিনিধি চিপ রয় সমাজতন্ত্র, কমিউনিজম বা ইসলামি মৌলবাদ প্রচারকারীদের নাগরিকত্ব বাতিলের জন্য বিল এনেছেন এবং সিনেটর এরিক শ্মিট নাগরিকত্ব পাওয়ার ১০ বছর পরও গুরুতর অপরাধে জড়িতদের নাগরিকত্ব বাতিলের আইন প্রস্তাব করেছেন। তবে আইনি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যেকোনো বড় আকারের নাগরিকত্ব বাতিলের প্রচেষ্টায় সবচেয়ে বড় বাধা হবে ফেডারেল আদালত, কারণ মার্কিন আইন অনুযায়ী নাগরিকত্ব কেড়ে নেওয়ার বিষয়টি অত্যন্ত সংবেদনশীল এবং বিচারকরা প্রতিটি মামলা অত্যন্ত সতর্কতার সাথে যাচাই করবেন।
