স্মার্ট টেলিভিশনের সুবিধা নিয়ে বিশ্বজুড়ে তৈরি হওয়া প্রাথমিক উন্মাদনা কাটার পর এখন তৈরি হয়েছে চরম অসন্তোষ। আধুনিক টিভিতে মাত্রাতিরিক্ত বিজ্ঞাপন প্রদর্শনী ও ব্যক্তিগত তথ্য সংগ্রহের অভিযোগ উঠায় অনেক ব্যবহারকারী এখন ডিভাইসগুলোকে ইন্টারনেট থেকে বিচ্ছিন্ন রাখার পথ বেছে নিচ্ছেন। এমনকি অনেকে ক্ষুব্ধ হয়ে ক্রাফট নাইফ বা ধারালো সরঞ্জাম দিয়ে টিভির মাইক্রোফোন ও বিভিন্ন যন্ত্রাংশ কেটে বাদ দিচ্ছেন। কম্পিউটার সায়েন্সে স্নাতকোত্তর ও টেলিকমিউনিকেশন খাতে কয়েক দশকের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন ড্যান নামের এক গ্রাহক জানান, প্রযুক্তিটি আয়ত্ত করা কঠিন নয়, তবে এটি দিন দিন বিরক্তি ও দুর্ভোগের কারণ হয়ে উঠছে। প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের এমন কর্মকাণ্ডে চরম বিরক্ত হয়ে তিনি একবার নিজের টিভির পর্দায় পাথর ছুড়ে মারতেও দ্বিধা করেননি।
২০০০-এর দশকের শেষের দিকে টেলিভিশন বাজার প্রযুক্তির এক নতুন যুগে প্রবেশ করে। তখন চওড়া ও পাতলা পর্দার টিভিতে অপারেটিং সিস্টেম, মিডিয়া প্লেয়ার ও বিভিন্ন অ্যাপ যুক্ত করে স্মার্ট টিভি বাজারে আনা হয়। প্রথমদিকে এটি বিলাসী পণ্য হিসেবে গণ্য হলেও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তুলনামূলক সস্তা মডেলগুলো সহজলভ্য হয়ে ওঠে। তবে ইলেক্ট্রনিক্স সাময়িকী ‘হোয়াট হাই-ফাই?’-এর টিভি ও অডিওভিজ্যুয়াল সম্পাদক টম পারসন্স জানান, কমদামী মডেলগুলো জটিল ফিচারের চাপ বেশিদিন সামলাতে পারে না। কেনার শুরুতে কিছুটা দ্রুত কাজ করলেও দুই, তিন বা চার বছর পার হতেই প্রসেসিংয়ের চাপে এগুলো মারাত্মক ধীরগতির হয়ে পড়ে। পারসন্স আরও উল্লেখ করেন, প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠানগুলো কীভাবে গ্রাহকদের ডেটা সংগ্রহ করছে তা নিয়ে উদ্বেগ প্রতিনিয়ত বাড়ছে। আধুনিক টিভিতে মাইক্রোফোনসহ নানা ধরনের সেন্সর থাকে, যা ব্যবহারকারীদের নিরাপত্তা ও গোপনীয়তা নিয়ে শঙ্কিত করে তোলে। তবে বেশিরভাগ ক্রেতা সব সুবিধা সংবলিত স্মার্ট টিভিই কেনেন, যার ফলে বাজারে কেবল ছবি প্রদর্শনের কাজ করা সাধারণ বা 'ডাম্ব' টিভির অস্তিত্ব নেই বললেই চলে। বাণিজ্যিক বিজ্ঞাপনের জন্য সস্তা মনিটর পাওয়া গেলেও কর্মক্ষমতার দিক থেকে সাধারণ হোম টিভির সমান সুবিধা এতে মেলে না।
সফটওয়্যার প্রকৌশলী শ্রয়ার ও তার স্ত্রী ম্যাককুইস্টন জানান, তারা তাদের বাড়ির টিভিকে ইচ্ছা করেই কোনো নেটওয়ার্কে যুক্ত রাখেন না। তাদের বাড়ির স্পষ্ট নিয়ম হলো—টিভিকে কখনো ওয়াই-ফাইয়ের পাসওয়ার্ড দেওয়া যাবে না। শ্রয়ার উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, নূন্যতম আনন্দদায়ক টিভি দেখার অভিজ্ঞতা পেতেও সাধারণ মানুষকে আইটি বিশেষজ্ঞ হতে হচ্ছে, যা অত্যন্ত হতাশাজনক। পূর্বে তারা এক্সবক্সের মাধ্যমে টিভি চালাতেন, তবে প্রতিনিয়ত অ্যাপ আপডেট, প্যাচ ইনস্টল ও পুনরায় অ্যাপ ডাউনলোডের ঝামেলা পোহাতে হতো। তাই এখন তারা টিভিকে কেবল একটি বড় ডিসপ্লে হিসেবে ব্যবহার করেন। ভবিষ্যতে যদি টিভিতে ইন্টারনেট ব্যবহার বাধ্যতামূলক করা হয়, তবে তার প্রকৌশলী স্বামী সার্ভিসের শর্ত ভেঙে টিভির ভেতরের সংযোগ কেটে ম্যানুয়ালি ইন্টারনেট বিচ্ছিন্ন করে দেবেন বলে জানান ম্যাককুইস্টন।
যুক্তরাজ্যের হেলথ সিকিউরিটি এজেন্সিতে এআই ডেলিভারি খাতে কর্মরত ওয়েলসের ৫১ বছর বয়সী হেলেন নর্থমোরের কাছেও গোপনীয়তা একটি বড় দুশ্চিন্তার বিষয়। চার বছর আগে তার পুরোনো সাধারণ টিভিটি হঠাৎ নষ্ট হয়ে যাওয়ার পর বদলাতে গিয়ে স্মার্ট স্ক্রিনের প্রতি তার এই ক্ষোভের জন্ম হয়। অন্যদিকে অস্ট্রেলিয়ার সরকারি চাকরিজীবী পল জানান, একটি ঐতিহ্যবাহী সাধারণ টিভি খুঁজে পাওয়া এখন কতটা কঠিন। ১০ বছর পুরোনো ৩২ ইঞ্চির নন-স্মার্ট টিভি নষ্ট হওয়ার পর তিনি টানা তিন সপ্তাহ শহরের বিভিন্ন দোকানে খুঁজেও একইরকম টিভি পাননি। অবশেষে একটি দোকানের পেছনের কক্ষে ধুলোবালি জমে থাকা ৪০ ইঞ্চির একটি নন-স্মার্ট টিভি খুঁজে পান তিনি, যার দাম ছিল প্রায় ২০০ ডলার। এতে ইন্টারনেটের কোনো সংযোগ ছিল না, কেবল চালের অ্যারিয়াল ও ভিএইচএস প্লেয়ার যুক্ত করার সুবিধা এবং একটি বিল্ট-ইন ডিভিডি প্লেয়ার ছিল। বন্ধুরা এই টিভি দেখে হাসাহাসি করলেও পলের স্বস্তি, এটি তার ওপর কোনো নজরদারি চালায় না।
তবে পলের মতো ব্যবহারকারীদের এই স্বস্তি কতদিন বজায় থাকবে তা নিয়ে সংশয় রয়েছে। গত সেপ্টেম্বরে অস্ট্রেলীয় সরকার দেশটির ফ্রি-টু-এয়ার সম্প্রচারের ভবিষ্যৎ নিয়ে এক মতামত আহ্বান করেছে, যেখানে প্রথাগত সম্প্রচার বন্ধ করে সম্পূর্ণ স্ট্রিম ও ভিডিও অন-ডিমান্ড অ্যাপভিত্তিক সেবা চালুর প্রস্তাব রাখা হয়েছে। একই মাসে যুক্তরাজ্য সরকার একটি মিডিয়া গ্রিন পেপার প্রকাশ করেছে, যেখানে ২০৩৪ সালের মধ্যে ডিজিটাল টেরিস্ট্রিয়াল টেলিভিশন বন্ধ করে ব্রডব্যান্ড নেটওয়ার্কভিত্তিক সেবায় স্থানান্তরের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এর ফলে দর্শকদের অ্যাপ ও স্ট্রিমিং সেবার ওপর পুরোপুরি নির্ভরশীল হতে হবে।
উত্তর আমেরিকায় এমন সিদ্ধান্ত এলেও জেমস নামের এক গ্রাহকের তাতে কিছু যায় আসে না। যুক্তরাষ্ট্রে জন্ম নেওয়া জেমস বর্তমানে কানাডার ব্রিটিশ কলাম্বিয়ায় বাস করছেন। তার কাছে প্রথাগত ব্রডকাস্ট টিভি অনেক আগেই অপ্রাসঙ্গিক হয়ে গেছে এবং তিনি স্ট্রিমিং সেবা ও ইউটিউব দেখতে পছন্দ করেন। দুই সন্তানের বাবা জেমসের কাছে পরিবারের গোপনীয়তাই সর্বাগ্রে। গত সেপ্টেম্বরে ইউটিউব চ্যানেল ‘গেমার্স নেক্সাস’ এলজি ইলেকট্রনিক্সের স্মার্ট টিভি নিয়ে দুই ঘণ্টার একটি তদন্তমূলক ভিডিও প্রকাশ করে। সেখানে অভিযোগ করা হয়, এলজি স্মার্ট টিভিগুলো অফলাইনে বা পাওয়ার বন্ধ থাকা অবস্থাতেও অডিও রেকর্ড করে। দক্ষিণ কোরীয় এই ইলেকট্রনিক্স জায়ান্ট অবশ্য সব অভিযোগ অস্বীকার করেছে।
এই বিতর্কের পর অনেক ব্যবহারকারী নিজেরাই স্মার্ট টিভি মডিফাই করার উদ্যোগ নেন। অনলাইনের বিভিন্ন ভিডিওতে ব্যবহারকারীদের মাদারবোর্ড পরিবর্তন করা, ব্লুটুথ ও ওয়াই-ফাই মডিউল কেটে ফেলা এবং রিমোটের মাইক্রোফোন সরাতে দেখা যায়। অনলাইনের পরামর্শ অনুসরণ করে জেমস একটি সাধারণ ক্রাফট নাইফ দিয়ে তার টিভির রিমোটের ওপর থেকে মাইক্রোফোনটি কেটে ফেলে দেন। এর পরও রিমোটটি স্বাভাবিকভাবে কাজ করছে। জেমসের এই পদক্ষেপের মূল কারণ তার সন্তানদের নিরাপত্তা। তিনি জানান, তার সন্তানরা এখনো কিশোর বয়সে পৌঁছায়নি এবং নিজেদের ব্যক্তিগত তথ্য রক্ষা করার মতো সচেতনতা তাদের নেই। টিভির মাধ্যমে কেউ আড়িপাতলে তার মেয়ের ব্যক্তিগত বিষয়গুলো অন্যের কাছে উন্মুক্ত হয়ে পড়তে পারে, যা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। ফলে সাধারণ জটিলতা এড়াতে ব্যবহারকারীরা নিজেরাই যন্ত্রাংশ নষ্ট করে সমাধান খুঁজছেন, যা প্রশ্ন তোলে—আমাদের বাড়ির টিভিগুলো কি প্রয়োজনের চেয়ে বেশি 'স্মার্ট' হয়ে উঠেছে?

