পদত্যাগের সিদ্ধান্ত নিলেন রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিন, জানাচ্ছে পরিবার

অবশেষে গুঞ্জনই সত্যি হতে যাচ্ছে। রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন পদত্যাগের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন বলে নিশ্চিত করেছে তার পরিবার। শারীরিক অসুস্থতার কারণে তিনি এই সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন। রাষ্ট্রপতির দপ্তরের একাধিক কর্মকর্তা এবং তার ঘনিষ্ঠ একজন বলেছেন, রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন পদত্যাগের সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছেন। তবে স্পিকার দেশে না থাকায় পদত্যাগপত্র জমা দেওয়ার বিষয়টি বিলম্বিত হচ্ছে। সংসদ সচিবালয়ের কর্মকর্তারা জানান, চিকিৎসার জন্য গত ১৯ জুলাই থাইল্যান্ডে গেছেন স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ। সূচি অনুযায়ী তার ২৬ তারিখ ফেরার কথা থাকলেও তার আগেই তিনি ফিরতে পারেন বলে আভাস পেয়েছেন তার দপ্তরের কর্মকর্তারা।

রাষ্ট্রপতির কার্যালয়ের সচিব মো. নূরুল আমীন বলেন, পদত্যাগপত্রে এখনো তিনি স্বাক্ষর করেননি। পদত্যাগ করলে জানানো হবে। বঙ্গভবনের একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বলেছেন, স্পিকার দেশে না থাকায় চাইলেও এখনই পদত্যাগপত্র জমা দিতে পারছেন না রাষ্ট্রপতি। পদত্যাগটা যার কাছে করবেন তিনি নিজেও দেশে নাই। তবে রাষ্ট্রপতি পদত্যাগের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন জানিয়ে ওই কর্মকর্তা বলেন, তিনি পদত্যাগের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, সেটা স্বাস্থ্যগত কারণেই হোক আর মানসিক কারণেই হোক। রাষ্ট্রপতির ঘনিষ্ঠ একজনও স্পিকারের দেশে না থাকার বিষয়টি সামনে এনে বলেছেন, মহামান্য তার কর্মকর্তাদের বলেছেন, দুয়েক দিনের মধ্যে তিনি বঙ্গভবনের পাট চুকিয়ে ফেলতে পারেন।

তবে সরকার রাষ্ট্রপতিকে পদত্যাগ করতে বলেনি বলে জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। বৃহস্পতিবার (২৩ জুলাই) সচিবালয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনকে বিএনপি সরকার পদত্যাগ করতে বলেনি, তবে তিনি চাইলে পদত্যাগ করতে পারেন। তিনি আরও বলেন, রাষ্ট্রপতির পদত্যাগ নিয়ে গুঞ্জন তো গুঞ্জনই। যদি রাষ্ট্রপতি স্বাস্থ্যগত কারণে হোক বা যে কোনো কারণে হোক পদত্যাগ করতে চান, সেই অপশন তো উনার আছে।

দেশের ২২তম রাষ্ট্রপতি হিসেবে ২০২৩ সালের ২৪ এপ্রিল শপথ নেন মো. সাহাবুদ্দিন। সে অনুযায়ী তার পাঁচ বছরের মেয়াদ ২০২৮ সালের এপ্রিলে শেষ হওয়ার কথা। তবে মেয়াদ শেষের আগেই দায়িত্ব থেকে সরে যাচ্ছেন আলোচিত-সমালোচিত এই রাষ্ট্রপতি। বিএনপির একটি নির্ভরশীল সূত্র বলেছে, পদত্যাগ করতে ইতোমধ্যে রাষ্ট্রপতি মোহাম্মদ সাহাবুদ্দিনকে দলের উচ্চপর্যায় থেকে বার্তা দেওয়া হয়েছে। নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের আগ পর্যন্ত জাতীয় সংসদের স্পিকার মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমদ ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করবেন।

সূত্রমতে, ছাত্র-জনতার তীব্র আন্দোলনের মুখে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশ থেকে চলে যাওয়ার কয়েক মাস পর রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিন চলে আসেন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে। আওয়ামী লীগের নিয়োগ করা এই রাষ্ট্রপতির পদত্যাগের দাবিতে তখন মাঠ ছিল দারুণ গরম। এমনকি বিক্ষোভকারীরা চলে যায় বঙ্গভবনের কিনারা পর্যন্ত। ‘সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা’রক্ষায় তখন বিএনপি রাষ্ট্রপতির পদত্যাগের বিপক্ষে অবস্থান নেয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে বিক্ষোভকারীদের সামাল দিয়ে ড. ইউনূস নেতৃত্বাধীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার রাষ্ট্র পরিচালনা করে। গত ১৭ ফেব্রুয়ারি বিএনপি সরকার শপথ নেওয়ার পরও রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করে আসছেন সাহাবুদ্দিন। সরকারের পাঁচ মাসের মাথায় এখন নতুন করে আবারও রাষ্ট্রপতির পদত্যাগের ইস্যুটি জোরেশোরে আলোচনায় এসেছে।

বঙ্গভবনের এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, রাষ্ট্রপতি অসুস্থ। তিনি নিউরো জটিলতায় ভুগছেন। সম্প্রতি তিনি দুইবার সিএমএইচে এমআরআইসহ নানা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করিয়েছেন। চিকিৎসকরা তাকে বিদেশে উন্নত চিকিৎসা নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন। রাষ্ট্রপতির ঘনিষ্ঠ সূত্রগুলোর সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার প্রথম দিন থেকেই পদত্যাগের বিষয়টি সহজভাবে ভাবছিলেন সাহাবুদ্দিন। জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় গত ১৭ ফেব্রুয়ারি মন্ত্রীদের শপথ পড়ানোর পর এ বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকেও তিনি জানিয়েছিলেন। রাষ্ট্রপতি তখন তারেক রহমানকে বলেছিলেন, আপনারা বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে ক্ষমতায় এসেছেন। এখন রাষ্ট্রপতি আপনারা নির্বাচিত করবেন, সেটাই স্বাভাবিক। আমিও এ ব্যাপারে সব ধরনের সহযোগিতা করতে প্রস্তুত আছি।

সংবিধান বিশেষজ্ঞ ড. শাহদীন মালিক বলেছেন, স্বাভাবিক পরিস্থিতিতে স্বেচ্ছায় পদত্যাগ করতে চাইলে স্পিকারের উদ্দেশে স্বাক্ষরযুক্ত পত্রযোগে পদত্যাগ করতে পারেন রাষ্ট্রপতি। এক্ষেত্রে নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত না হওয়া পর্যন্ত স্পিকার দায়িত্ব পালন করবেন। এ বিষয়ে সংবিধানে স্পষ্ট করেই বলা আছে। তিনি আরও বলেন, রাষ্ট্রপতির পদত্যাগে কোনো সংকট হবে না। এর আগেও রাষ্ট্রপতি ড. একিউএম বদরুদ্দোজা চৌধুরী পদত্যাগ করলে তৎকালীন স্পিকার ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকার অস্থায়ী রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করেছেন। সংবিধানের ৫০(৩) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, স্পিকারের উদ্দেশে স্বাক্ষরযুক্ত পত্রযোগে রাষ্ট্রপতি স্বীয় পদত্যাগ করিতে পারিবেন। পাশাপাশি সংবিধানের ৫৪ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য হইলে কিংবা অনুপস্থিতি, অসুস্থতা বা অন্য কোনো কারণে রাষ্ট্রপতি দায়িত্ব পালনে অসমর্থ হইলে স্পিকার রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করিবেন। সংবিধানের ৪৮(১) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের একজন রাষ্ট্রপতি থাকিবেন, যিনি আইন অনুযায়ী সংসদ-সদস্যগণ কর্তৃক নির্বাচিত হইবেন।

১৯৭১ সালের ২৩ মার্চ পাবনা টাউন হল ময়দানে বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলনকারীদের মধ্যে সাহাবুদ্দিন ছিলেন অন্যতম। তিনি পাবনা জেলা স্বাধীন বাংলা ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের আহ্বায়ক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। সাহাবুদ্দিন ১৯৭১ সালে মুজিব বাহিনীর সদস্য হিসেবে মহান মুক্তিযুদ্ধে সক্রিয়ভাবে অংশ নেন। তিনি ১৯৭৪ সালে পাবনা জেলা যুবলীগের সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৭৫ সালে বাংলাদেশ কৃষক-শ্রমিক আওয়ামী লীগ (বাকশাল) গঠিত হলে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তাকে পাবনা জেলা বাকশালের যুগ্ম সম্পাদক হিসেবে মনোনয়ন দেন। ১৯৮২ সালে বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিস (বিচার) ক্যাডারে যোগ দেন মো. সাহাবুদ্দিন। তিনি জেলা ও দায়রা জজ হিসেবে ২০০৬ সালে অবসর গ্রহণ করেন। সাহাবুদ্দিন ২০১১ থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) কমিশনার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

সাহাবুদ্দিনের স্ত্রী ড. রেবেকা সুলতানা সরকারের যুগ্ম সচিব হিসেবে ২০০৯ সালে অবসর গ্রহণ করেন। মো. আরশাদ আদনান তাদের একমাত্র সন্তান। তার দুই যমজ নাতি তাহসিন মো. আদনান ও তাহমিদ মো. আদনান। ভ্রমণ, বই পড়া ও গান শোনা রাষ্ট্রপতির প্রিয় শখ।