ডোনাল্ড ট্রাম্পের পররাষ্ট্রনীতি বরাবরই প্রথাগত মার্কিন কূটনীতির চেনা ছককে ভেঙে চুরমার করে দিয়েছে। ওমানে বোমা হামলার হুমকি, দক্ষিণ কোরিয়া থেকে সেনা প্রত্যাহার, ন্যাটো থেকে বের হয়ে যাওয়া কিংবা গ্রিনল্যান্ড ও কানাডা দখলের মতো অদ্ভুত সব প্রস্তাব বা হুমকি দিয়ে তিনি গত এক দশক ধরে বিশ্বমঞ্চে এক অস্থির পরিবেশ তৈরি করে চলেছেন। লাতিন আমেরিকার কোনো এক একনায়ককে বন্দি করতে মার্কিন বিশেষ বাহিনীকে নির্দেশ দেওয়া এবং সেই দেশের তেল সম্পদ দখল করার মতো চরমপন্থী চিন্তাভাবনাও তার নীতিতে স্থান পেয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের পররাষ্ট্রনীতি বিষয়ক নীতি নির্ধারকরা ট্রাম্পের এই আচরণে চরম ক্ষুব্ধ। তারা মনে করছেন, ট্রাম্প শত্রুদের বন্ধু বানাচ্ছেন আর বন্ধুদের বানাচ্ছেন শত্রু। ব্রাউন ইউনিভার্সিটির ওয়াটসন ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্ড পাবলিক অ্যাফেয়ার্সের 'চায়না ইনিশিয়েটিভ'-এর পরিচালক লাইল গোল্ডস্টেইন বলেন, "আমার কর্মজীবনে আমি এস্টাবলিশমেন্টকে কখনো এতটা হতাশ এবং আমাদের নেতা একের পর এক ভুল করছেন বলে নিশ্চিত হতে দেখিনি।" তবে ওয়াশিংটনভিত্তিক থিংক ট্যাংক 'ডিফেন্স প্রায়োরিটিজ'-এর এশিয়া প্রোগ্রামের পরিচালক হিসেবে কর্মরত গোল্ডস্টেইন ট্রাম্পের মিত্রদের প্রতি এই সন্দেহের প্রতি কিছুটা সহানুভূতি প্রকাশ করেন। তিনি মনে করেন, মার্কিন জীবনযাত্রার মান পিছিয়ে পড়ার অন্যতম কারণ হলো অন্য দেশগুলোর তুলনায় যুক্তরাষ্ট্র অনেক বেশি সামরিক ও আর্থিক বোঝা বহন করছে।
গোল্ডস্টেইনের মতে, ন্যাটো এবং জাতিসংঘের মতো আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর প্রতি ট্রাম্পের এই অবজ্ঞা বিশ্বকে একটি "জটিল বহুমুখী মেরুকরণ" বা 'কমপ্লেক্স মাল্টিপোলারিটি'-র দিকে ঠেলে দিচ্ছে। তিনি বারবার ৭৭ বছরের পুরোনো 'কাগুজে বাঘ' ন্যাটো সামরিক জোটের কার্যকারিতাকে খাটো করে দেখিয়েছেন। যেখানে ক্ষমতা শুধু যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের হাতে না থেকে বিভিন্ন অঞ্চল ও দেশের মধ্যে ছড়িয়ে পড়বে। তবে ওয়ার্ল্ড অ্যাফেয়ার্স থিংক ট্যাংক 'আটলান্টিক কাউন্সিল'-এর ফেলো এবং পোল্যান্ডে নিযুক্ত সাবেক মার্কিন রাষ্ট্রদূত ড্যানিয়েল ফ্রাইড মনে করেন, ট্রাম্প পুরোপুরি নতুন কোনো বিশ্বব্যবস্থা তৈরি করছেন—এমনটা বলার সময় এখনও আসেনি। বিল ক্লিনটন ও জর্জ ডব্লিউ বুশের সাবেক বিশেষ সহকারী ফ্রাইড বলেন, "বিশ্বব্যবস্থা পরিবর্তন করতে হলে আপনার কাছে বিকল্প কোনো কাঠামো থাকতে হবে। ট্রাম্প প্রশাসন আসলে কী চায় তা এখনও স্পষ্ট নয় এবং এই মেয়াদের পর এর কতটুকু স্থায়ী হবে তা বলা মুশকিল।"
ওয়াশিংটনভিত্তিক ব্রুকিংস ইনস্টিটিউশনের সেন্টার অন দ্য ইউএস অ্যান্ড ইউরোপের পররাষ্ট্রনীতি বিশেষজ্ঞ ড্যান হ্যামিল্টন মনে করেন, ট্রাম্প আন্তর্জাতিক নিয়মকানুনকে কেবল একটি প্রতিবন্ধকতা হিসেবে দেখেন। ট্রাম্প বিশ্বাস করেন, বিশ্বমঞ্চে সবচেয়ে বড় শক্তিকে সবাই বেঁধে রাখতে চায়, যা তিনি পছন্দ করেন না। ট্রাম্পের এই লেনদেনভিত্তিক কূটনীতির কথা উল্লেখ করে কানাডাভিত্তিক জিওপলিটিক্যাল রিস্ক অ্যান্ড সিকিউরিটি কনসালটেন্সি 'সেকডেভ গ্রুপ' এবং ব্রাজিলের থিংক ট্যাংক 'ইগাপারে ইনস্টিটিউট'-এর সহ-প্রতিষ্ঠাতা রবার্ট মুগাহ বলেন, ট্রাম্প তার মিত্রদের সাথে সম্পর্ককে নিছক লেনদেন হিসেবে দেখেন। তিনি কানাডা, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া এবং ইউরোপীয় দেশগুলোকে বাণিজ্য ও প্রতিরক্ষায় ছাড় দিতে বাধ্য করার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের ওপর তাদের নির্ভরতাকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেন।
ট্রাম্পের এই আগ্রাসী নীতি প্রথম মেয়াদ থেকেই শুরু হয়েছিল। প্যারিস জলবায়ু চুক্তি, ইরানের পরমাণু চুক্তি এবং বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে প্রত্যাহার করে নিয়েছিলেন তিনি। দশকের পর দশক ধরে চলে আসা মার্কিন নীতি লঙ্ঘন করে তিনি জেরুজালেমকে ইসরায়েলের রাজধানী হিসেবে স্বীকৃতি দেন এবং সেখানে মার্কিন দূতাবাস স্থানান্তর করেন। এছাড়া তিনি ১২টি প্রশান্ত মহাসাগরীয় দেশের সাথে ট্রান্স-প্যাসিফিক পার্টনারশিপ (টিপিপি) থেকে বেরিয়ে এসে মুক্ত বাণিজ্যের ওপর তার আক্রমণ শুরু করেন—যা তার দ্বিতীয় মেয়াদে আরও ত্বরান্বিত হয়—এবং কানাডা ও মেক্সিকোর সাথে উত্তর আমেরিকান মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (নাফটা) প্রতিস্থাপন করেন।
হোয়াইট হাউসে ফেরার পর থেকে ভ্লাদিমির পুতিন, শি জিনপিং এবং কিম জং উনের মতো একনায়কদের প্রতি ট্রাম্পের ব্যক্তিগত আগ্রহ স্পষ্ট হয়েছে। অন্যদিকে ন্যাটো জোটের শরিক ডেনমার্ককে গ্রিনল্যান্ড দখলের হুমকি দিয়ে আতঙ্কিত করেছেন এবং কিউবাকে "বন্ধুত্বপূর্ণভাবে দখল" করার কথাও ভাবছেন। কিম জং উনের সাথে সম্পর্ক নিয়ে ট্রাম্প বলেছিলেন, "কিম জং উন সবসময় আমাকে অত্যন্ত সম্মান দেখিয়েছেন… আমি তাকে বুঝি এবং সেও আমাকে বোঝে।" এই বন্ধুত্বের খাতিরে তিনি দক্ষিণ কোরিয়ার সাথে যৌথ সামরিক মহড়া কমিয়ে ফেলার নির্দেশ দিয়েছিলেন, যা পিয়ংইয়ংয়ের সম্ভাব্য হামলা মোকাবিলায় সিউলের জন্য অত্যন্ত জরুরি ছিল। অথচ উত্তর কোরিয়া ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা চালিয়ে যাচ্ছে এবং ইউক্রেন যুদ্ধে রাশিয়ার জন্য অস্ত্র সরবরাহ করছে। এছাড়া পুতিনের প্রতি ট্রাম্পের সদয় আচরণ এবং ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কিকে খাটো করে দেখার বিষয়টি ইউরোপের দেশগুলোর মধ্যে গভীর উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে।
ট্রাম্প হয়তো ওমানে বোমা হামলা করবেন না, তবে তিনি এই উপসাগরীয় দেশটিকে হুমকি দিয়েছেন। কারণ ওমান হরমুজ প্রণালী পুরোপুরি খুলে দেওয়ার জন্য ইরানের সাথে একটি চুক্তির চেষ্টা করছে, যা ট্রাম্প ও ইসরায়েলের যৌথ উদ্যোগে শুরু হওয়া যুদ্ধের কারণে মূলত বন্ধ রয়েছে। গোল্ডস্টেইন বলেন, "ইরান যুদ্ধ যে একটি বড় ধরনের বিপর্যয়, তা এখন স্পষ্ট। যুক্তরাষ্ট্র যদি ইরানের মতো একটি মাঝারি শক্তির দেশের সাথে যুদ্ধে হিমশিম খায়, তবে চীনের মুখোমুখি হওয়া আমাদের পক্ষে অসম্ভব।"
ট্রাম্পের কূটনীতির আরেকটি অনন্য দিক হলো নিজের ব্যবসায়িক স্বার্থের সাথে পররাষ্ট্রনীতিকে যুক্ত করা। গ্লাসগো বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও বৈশ্বিক শাসনের অধ্যাপক প্যাট্রিক শেয়া বলেন, এর আগে থিওডোর রুজভেল্ট, হ্যারি ট্রুম্যান বা জন এফ কেনেডি লেনদেনভিত্তিক নীতি অনুসরণ করলেও কেউ নিজের অর্থনৈতিক স্বার্থকে এভাবে জড়াননি। সৌদি আরব, কাতার এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতে ট্রাম্পের রিয়েল এস্টেট ব্যবসা রয়েছে। এমনকি ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনার হোয়াইট হাউস ছাড়ার মাত্র ছয় মাস পর সৌদি আরবের সার্বভৌম তহবিল থেকে ২ বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ পেয়েছিলেন, যা নিয়ে স্বার্থের সংঘাতের প্রশ্ন উঠলেও কুশনার তা প্রত্যাখ্যান করেছেন।
ট্রাম্পের এই নীতির কিছু ইতিবাচক দিকও দেখছেন বিশ্লেষকরা। ড্যানিয়েল ফ্রাইড বলেন, ন্যাটোর ক্ষেত্রে ট্রাম্পের চাপ কাজ করেছে, কারণ ইউরোপীয় দেশগুলো এখন তাদের প্রতিরক্ষা বাজেট বাড়াচ্ছে। জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়া শত শত বিলিয়ন ডলারের মার্কিন বিনিয়োগ প্যাকেজে সম্মত হয়েছে। তবে ট্রাম্পের এই চাপ অনেক সময় হিতে বিপরীতও হয়েছে। যেমন কানাডার ওপর শুল্ক আরোপের কারণে দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য যুদ্ধ শুরু হয়েছে, যার জবাবে কানাডা ইস্পাত, অ্যালুমিনিয়াম, পনির ও সামুদ্রিক খাবারসহ ২০ বিলিয়ন ডলারের মার্কিন পণ্যের ওপর শুল্ক আরোপ করেছে।
ইরানের সাথে যুদ্ধ এবং তেলের দাম বৃদ্ধির কারণে আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের মধ্যে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে, যার ফলে ডলারের আধিপত্যকে চ্যালেঞ্জ করছে ইউরো। এছাড়া মুদ্রাস্ফীতি এবং মার্কিন ট্রেজারি বন্ডের উচ্চ সুদের হারের কারণে সাধারণ মানুষের জন্য ঋণ নেওয়া ব্যয়বহুল হয়ে পড়েছে। ড্যান হ্যামিল্টন মনে করেন, ট্রাম্পের মেয়াদ আর মাত্র দুই বছরের কিছু বেশি সময় বাকি আছে। তাই মার্কিন মিত্ররা আপাতত তোষামোদির মাধ্যমে ক্ষতি সীমিত রাখার চেষ্টা করছে এবং ট্রাম্পের পরবর্তী সময়ের দিকে তাকিয়ে আছে। রবার্ট মুগাহর মতে, ট্রাম্প আজ মার্কিন শক্তি থেকে সর্বোচ্চ সুবিধা নিচ্ছেন, কিন্তু ভবিষ্যতে অন্য দেশগুলো যাতে যুক্তরাষ্ট্রের ওপর কম নির্ভর করে, সেই পথও তৈরি করে দিচ্ছেন।
