জাতিসংঘের সাধারণ সভায় সম্প্রতি একটি নতুন মানচিত্র প্রজেকশন বা অভিক্ষেপ আনুষ্ঠানিকভাবে গৃহীত হয়েছে, যা বিশ্বজুড়ে মানচিত্রের প্রচলিত ধারণা বদলে দেওয়ার সম্ভাবনা তৈরি করেছে। 'ইকুয়াল আর্থ' নামের এই মানচিত্রটি ১৬ শতকের বহুল ব্যবহৃত 'মারকেটর' প্রজেকশনের একটি কার্যকর বিকল্প হিসেবে তৈরি করা হয়েছে। দীর্ঘকাল ধরে সমালোচকরা মারকেটর প্রজেকশনের সমালোচনা করে আসছেন, কারণ এটি উত্তর গোলার্ধের দেশগুলোকে তাদের প্রকৃত আয়তনের চেয়ে অনেক বড় করে দেখায়, যা বিশ্বশক্তির কেন্দ্রবিন্দু সম্পর্কে ভুল ধারণা তৈরি করতে পারে।
টোগোর প্রস্তাবনায় আনা এই নতুন মানচিত্রটি ১৬৪টি দেশের সমর্থন পেয়েছে। তবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এই প্রস্তাবের বিপক্ষে ভোট দিয়েছে। জাতিসংঘে নিযুক্ত মার্কিন প্রতিনিধি ইয়ারিনা ফেরেনসেভিচ এই উদ্যোগকে অপ্রয়োজনীয় বলে মন্তব্য করেছেন। নতুন মানচিত্রে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং গ্রিনল্যান্ডের মতো দেশগুলোর আকার আগের চেয়ে ছোট দেখায়, যা নিয়ে বিভিন্ন মহলে আলোচনা চলছে। এছাড়া জাপান ও ইউক্রেনের মতো দেশগুলো মানচিত্রের কিছু নির্দিষ্ট সীমানা ও রঙের উপস্থাপনা নিয়ে আপত্তি জানিয়েছে। জাপান কুড়িল দ্বীপপুঞ্জ নিয়ে এবং ইউক্রেন ক্রিমিয়া নিয়ে তাদের উদ্বেগের কথা জানিয়েছে।
এই মানচিত্রটির উদ্ভাবক দলের সদস্য টম প্যাটারসন জানান, জাতিসংঘে এটি গৃহীত হওয়ার পর থেকে তিনি বিভিন্ন দেশের সরকারের কাছ থেকে প্রচুর জিজ্ঞাসার সম্মুখীন হয়েছেন। তিনি মার্কিন জাতীয় উদ্যান সংস্থার একজন কার্টোগ্রাফার হিসেবে পরিচিত। প্যাটারসন এই প্রকল্পটি ২০১৮ সালে ক্যালিফোর্নিয়ার সফটওয়্যার প্রকৌশলী বোজান সাভরিচ এবং অস্ট্রেলিয়ার মোনাস বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক বার্নহার্ড জেনির সাথে যৌথভাবে শুরু করেছিলেন।
বার্নহার্ড জেনি বলেন, মানচিত্র সবসময়ই একটি আপস বা সমঝোতার ফসল। গোলকাকার পৃথিবীকে সমতল কাগজে উপস্থাপন করতে গেলে বিকৃতি অনিবার্য। তিনি কমলালেবুর খোসার উদাহরণের মাধ্যমে বোঝান যে, গোলক থেকে সমতলে মানচিত্র রূপান্তরের সময় কিছু না কিছু অংশ টেনে প্রসারিত করতে হয়। তিনি আরও বলেন, 'মানচিত্র কখনোই নিরপেক্ষ নয়।'
ইকুয়াল আর্থ মানচিত্রটি সব মহাদেশের, বিশেষ করে আফ্রিকার আয়তনকে অনেক বেশি নির্ভুলভাবে উপস্থাপন করে। উদ্ভাবকরা মনে করেন, এটি মারকেটর প্রজেকশনের পুরোপুরি বিকল্প না হলেও স্কুল ও সরকারি দপ্তরে ব্যবহারের জন্য একটি উন্নত সংস্করণ। বোজান সাভরিচ বলেন, মানচিত্র তৈরির এই গবেষণার বিষয়বস্তু যে জাতিসংঘের মতো জায়গায় আলোচিত হবে, তা তিনি কখনোই কল্পনা করেননি। তিনি আশাবাদী যে, এই উদ্যোগের ফলে মানচিত্র সম্পর্কে সাধারণ মানুষের সচেতনতা বৃদ্ধি পাবে এবং তারা বুঝতে পারবে যে কোনো মানচিত্রই পৃথিবীর শতভাগ নিখুঁত প্রতিচ্ছবি হতে পারে না।
জেনি এই পুরো ঘটনাটিকে একজন কার্টোগ্রাফারের স্বপ্ন হিসেবে অভিহিত করেছেন। তিনি মনে করেন, ইকুয়াল আর্থ নামটি সহজবোধ্য হওয়ায় এটি জনপ্রিয়তা পেতে সাহায্য করেছে। তবে তিনি স্বীকার করেন যে, মানচিত্রের ক্ষেত্রে সবসময়ই কিছু না কিছু ছাড় দিতে হয়, যেমন ইকুয়াল আর্থ মানচিত্রে প্রান্তের দেশগুলো কিছুটা বিকৃত হতে পারে।

