কানাডার হকি সরঞ্জাম ও দুগ্ধজাত পণ্যে ট্রাম্পের ৫০% শুল্ক আরোপ

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প হকি সরঞ্জাম থেকে শুরু করে অ্যালকোহলজাতীয় পানীয়সহ বিভিন্ন কানাডীয় পণ্যের ওপর ৫০ শতাংশ শুল্ক আরোপের ঘোষণা দিয়েছেন। দুই দেশের মধ্যকার বাণিজ্য বিরোধের তীব্রতা বাড়িয়ে সোমবার ট্রাম্প এ সংক্রান্ত কয়েকটি ঘোষণাপত্রে স্বাক্ষর করেছেন, যা আগামী ১৯ আগস্ট থেকে কার্যকর হতে যাচ্ছে। হোয়াইট হাউসের পক্ষ থেকে কানাডার বিরুদ্ধে মার্কিন পণ্যের ওপর শুল্ক ও আমদানি নিষেধাজ্ঞা আরোপের মাধ্যমে "অযৌক্তিক, অসম ও বৈষম্যমূলক পদক্ষেপ" নেওয়ার অভিযোগ আনা হয়েছে। মূলত গত বছর ট্রাম্পের প্রথম দফার শুল্ক আরোপের পর কানাডা এই পদক্ষেপগুলো নেওয়া শুরু করে।

এর জবাবে এবার কানাডার ইলেকট্রনিক্স পণ্য, হকি সরঞ্জাম, মধু, ফুলের বাল্ব, পাখির পালক (ডাউন ফেদার), প্লাইউড, গরুর চামড়া ও অলঙ্কারসহ বেশ কিছু পণ্যের ওপর নতুন করে শুল্ক বসিয়েছে ট্রাম্প প্রশাসন। এছাড়া কানাডায় মার্কিন অ্যালকোহল বর্জন এবং দুগ্ধ আমদানিতে দীর্ঘদিনের কোটার প্রতিক্রিয়ায় কানাডীয় বিয়ার, ওয়াইন, মদ ও দুধের ওপরও শুল্ক আরোপ করা হয়েছে।

প্রশাসনের একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা অবশ্য দাবি করেছেন যে, এই পদক্ষেপের অর্থ এই নয় যে যুক্তরাষ্ট্র কানাডার সঙ্গে বাণিজ্য যুদ্ধে জড়াচ্ছে। ট্রাম্প প্রশাসন এখনও আলোচনার জন্য প্রস্তুত রয়েছে। তবে হোয়াইট হাউস যেটিকে বৈষম্যমূলক বাণিজ্য আচরণ হিসেবে দেখছে, তার জবাব দেওয়া প্রয়োজন ছিল বলে মন্তব্য করেন তিনি। তার মতে, ট্রাম্পের শুল্ক-নির্ভর বাণিজ্য নীতির বিরুদ্ধে কেবল কানাডা এবং চীনই পাল্টা ব্যবস্থা নিয়েছিল। ১৯৩০ সালের শুল্ক আইনের ৩৩৮ ধারার অধীনে এই নতুন শুল্ক আরোপ করা হয়েছে, যা মার্কিন বাণিজ্যের বিরুদ্ধে বৈষম্যমূলক আচরণ করা যেকোনো দেশের ওপর ৫০% পর্যন্ত শুল্ক আরোপের ক্ষমতা দেয় প্রেসিডেন্টকে। কর্মকর্তাটি জানান, এর আগে এই ধারাটি এভাবে ব্যবহার করা হয়নি, তবে প্রশাসন তাদের ক্ষমতার ব্যাপারে নিশ্চিত। উল্লেখ্য, চলতি বছরের শুরুতে মার্কিন সুপ্রিম কোর্ট এক রায়ে জরুরি অবস্থার ক্ষমতা ব্যবহার করে শুল্ক আরোপে ট্রাম্পের অধিকারে সীমাবদ্ধতা টেনেছিল।

এই সিদ্ধান্তের প্রতিক্রিয়ায় কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি সোমবার বলেন, গত বছর যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে কানাডার নেওয়া বাণিজ্য পদক্ষেপগুলো (যার মধ্যে গাড়ি আমদানিতে শুল্কও রয়েছে) ছিল মূলত ট্রাম্প প্রশাসনের শুল্কের সমপরিমাণ জবাব। কার্নির মতে, ট্রাম্পের সেই পদক্ষেপ ইউএসএমসিএ (USMCA) চুক্তি লঙ্ঘন করেছিল। তিনি জানান, কানাডা আলোচনা করতে এবং ইউএসএমসিএ চুক্তিকে আধুনিকায়ন করতে প্রস্তুত। কার্নি এক বিবৃতিতে বলেন, "এই বাণিজ্য বিরোধের কারণে সাধারণ পরিবারের খরচ বেড়েছে, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রে। আমাদের নাগরিকদের পারস্পরিক স্বার্থে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে অমীমাংসিত সমস্যাগুলো নিয়ে নিবিড়ভাবে কাজ করতে কানাডা প্রস্তুত।"

মার্কিন স্পিরিট উৎপাদনকারীদের প্রতিনিধিত্বকারী বাণিজ্য গোষ্ঠী 'ডিস্ট্রিল্ড স্পিরিটস কাউন্সিল অব দ্য ইউনাইটেড স্টেটস' এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, ৫০ শতাংশের এই শুল্ক বাণিজ্য উত্তেজনাকে আরও গভীর করবে এবং এমন এক সময়ে আরও পাল্টা পদক্ষেপের ঝুঁকি বাড়াবে যখন যুক্তরাষ্ট্রের আতিথেয়তা খাতের অনেক ব্যবসা আর্থিক সংকটের মুখোমুখি। সংগঠনের প্রধান নির্বাহী ক্রিস সোঙ্গার বলেন, প্রায় দেড় বছর ধরে কানাডার বেশিরভাগ দোকানে মার্কিন স্পিরিট সরিয়ে রাখা হয়েছে, যা এই খাতের বাইরের এক বাণিজ্য বিরোধের কারণে সৃষ্ট ক্ষতি। তবে প্রশাসন যে এই বিধিনিষেধের ফলে মার্কিন ডিস্টিলারদের হওয়া বড় ধরনের ক্ষতিকে স্বীকৃতি দিয়েছে, সেটিকে আমরা স্বাগত জানাই। তবে আমরা আশা করেছিলাম যে উত্তেজনা আর না বাড়িয়েই এই সমস্যার সমাধান সম্ভব হবে। অন্যদিকে, কানাডিয়ান চেম্বার অব কমার্সের প্রেসিডেন্ট ও সিইও ক্যান্ডিস লেং এই নতুন শুল্ককে একটি "দুঃখজনক উত্তেজনা বৃদ্ধি" বলে অভিহিত করেছেন। তবে শুল্ক কার্যকর হওয়ার আগের ৩০ দিন সময়কে আনুষ্ঠানিক আলোচনা এগিয়ে নেওয়ার কাজে লাগানোর জন্য দুই দেশের প্রতি আহ্বান জানান তিনি।

সরকারি তথ্য অনুযায়ী, মেক্সিকোর পর কানাডাই যুক্তরাষ্ট্রের দ্বিতীয় বৃহত্তম বাণিজ্য অংশীদার। চলতি বছরের প্রথম পাঁচ মাসেই দুই দেশের সীমান্তে ৩০০ বিলিয়ন ডলারের বেশি মূল্যের পণ্য লেনদেন হয়েছে। ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদের শুরুর দিক থেকেই দুই দেশের বাণিজ্য সম্পর্ক বেশ উত্থান-পতনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। মাদক ও অভিবাসী পারাপার ঠেকাতে কানাডার পদক্ষেপকে অপর্যাপ্ত আখ্যা দিয়ে ট্রাম্প যখন শুল্কের হুমকি দিয়েছিলেন, তখন থেকেই এই উত্তেজনার শুরু। পরবর্তীতে বাণিজ্য আলোচনার পর ইউএসএমসিএ মেনে চলা পণ্যগুলোকে শুল্কমুক্ত ঘোষণা করে সাময়িক স্বস্তি দেওয়া হলেও উত্তেজনা পুরোপুরি কমেনি। ট্রাম্প প্রায়ই শুল্ক বাড়ানোর হুমকি দেন এবং ২০৩৬ সালের পর ইউএসএমসিএ চুক্তি নবায়ন না করার ইঙ্গিত দিয়েছেন। এছাড়া ন্যাটো এবং কানাডাকে যুক্তরাষ্ট্রের অন্তর্ভুক্ত করার বিষয়ে ট্রাম্পের মন্তব্য নিয়েও দুই দেশের মধ্যে বিরোধ রয়েছে।

সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের পূর্বাঞ্চল ও মধ্য-পশ্চিমাঞ্চলে কানাডার দাবানলের ধোঁয়া ছড়িয়ে পড়ার পর ট্রাম্প কানাডাকে "নোংরা, দূষিত ও অস্বাস্থ্যকর বাতাস" দ্বারা আক্রান্ত হওয়ার দায়ে অভিযুক্ত করে অতিরিক্ত শুল্কের হুমকি দিয়েছিলেন। কানাডা অবশ্য দাবানল নিয়ন্ত্রণে তাদের পদক্ষেপের সপক্ষে যুক্তি দিয়েছে। তবে সোমবার ঘোষিত শুল্কগুলো সেই দাবানল সংক্রান্ত শুল্ক নয় বলে নিশ্চিত করেছেন মার্কিন প্রশাসনের ওই জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা। তিনি জানান, দাবানল নিয়ে উপদেষ্টারা প্রেসিডেন্টকে অন্যান্য বিকল্পের বিষয়ে অবহিত করছেন।

কন্টেন্ট: সংগৃহীত

Related posts