মার্কিন প্রতিরক্ষা সচিব পিট হেগসেথ জানিয়েছেন, ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার চলমান যুদ্ধে এ পর্যন্ত প্রায় ৩৭.৫ বিলিয়ন ডলার ব্যয় হয়েছে। ট্রাম্প প্রশাসন পেন্টাগনের এই যুদ্ধের ব্যয় মেটাতে এবং সামরিক সরঞ্জাম পুনর্গঠনে কংগ্রেসের কাছে আরও ১০ হাজার কোটি ডলারের বেশি অতিরিক্ত তহবিল চেয়েছে।
মঙ্গলবার সিনেট অ্যাপ্রোপ্রিয়েশন কমিটির শুনানিতে হেগসেথ এবং জয়েন্ট চিফস অব স্টাফের চেয়ারম্যান জেনারেল ড্যান কেইন এই অতিরিক্ত তহবিলের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেন। ট্রাম্প প্রশাসন ইরান সংঘাতের ব্যয় মেটাতে এবং জরুরি সামরিক সরবরাহ নিশ্চিত করতে অতিরিক্ত ৬৭ বিলিয়ন ডলারের একটি সম্পূরক বাজেট অনুরোধ করেছে। এর পাশাপাশি আগামী ২০২৭ (2027) অর্থবছরের জন্য আরও ১.৫ ট্রিলিয়ন ডলারের নিয়মিত বাজেট প্রস্তাবও চাওয়া হয়েছে। হেগসেথ এবং কেইন মে মাসে হাউস ও সিনেট অ্যাপ্রোপ্রিয়েশন সাব-কমিটির সামনে সাক্ষ্য দেওয়ার সময় প্রশাসনের এই অবস্থানের পুনরাবৃত্তি করেন যে, সামরিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা এবং পূর্ণ অর্থায়নের জন্য এই ১.৫ ট্রিলিয়ন ডলারের পাশাপাশি সম্পূরক তহবিলও প্রয়োজন।
গত মাসে প্রশাসন কংগ্রেসের কাছে ৮৮ (88) বিলিয়ন ডলারের আবেদন করেছিল, যার বড় অংশই ছিল সংঘাতের ব্যয় মেটানোর জন্য। এর মধ্যে যুদ্ধাস্ত্রের জন্য ২১ (21) বিলিয়ন ডলার, পরিচালন ব্যয়ের জন্য ১৭.৩ (17.3) বিলিয়ন ডলার, গোপনীয় কর্মসূচির জন্য ১২.১ (12.1) বিলিয়ন ডলার এবং অন্যান্য খাতের জন্য ১১.১ (11.1) বিলিয়ন ডলারের অনুরোধ অন্তর্ভুক্ত ছিল। শুনানিতে প্রতিরক্ষা সচিব সরাসরি ইরানের নাম উল্লেখ না করলেও বলেন যে, এই সম্পূরক অনুরোধে সামরিক প্রস্তুতির জন্য ২১ (21) বিলিয়ন ডলার অন্তর্ভুক্ত রয়েছে, যা সাম্প্রতিক অভিযানের সময় ব্যবহৃত অধিকাংশ সরঞ্জাম প্রতিস্থাপনে ব্যয় করা হবে।
শুনানিতে ডেমোক্র্যাট সিনেটরদের তীব্র সমালোচনার মুখে পড়েন হেগসেথ। শুনানিতে বেশ কয়েকজন ডেমোক্র্যাট সদস্য উল্লেখ করেন যে, পেন্টাগন আগের একটি রিকনসিলিয়েশন প্যাকেজ থেকে প্রায় ৭৫ (75) বিলিয়ন ডলার এখনও ব্যয় করেনি এবং তারা প্রশ্ন তোলেন কেন বিভাগটি কংগ্রেসের কাছে আরও অর্থ চাইছে। জবাবে হেগসেথ বলেন যে, ওই রিকনসিলিয়েশন তহবিলের ৯৫% (95%) অর্থই আগামী সেপ্টেম্বরের শেষের মধ্যে বরাদ্দ করা হবে। ইলিনয় থেকে নির্বাচিত ডেমোক্র্যাট সিনেটর রিচার্ড ডারবিনের প্রশ্নের জবাবে হেগসেথ জানান, ইরান সংকটে এ পর্যন্ত ৩৭.৫ বিলিয়ন ডলার ব্যয় হয়েছে, যার মধ্যে আগামী ৩০ সেপ্টেম্বর চলতি অর্থ বছর শেষ হওয়া পর্যন্ত কিছু সম্ভাব্য ব্যয়ও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। তবে সিবিএস নিউজকে ডেমোক্র্যাট ও অন্যান্য বিশ্বস্ত সূত্র জানিয়েছে, প্রকৃত ব্যয় এর চেয়ে অনেক বেশি, কারণ এই হিসাবে ক্ষতিগ্রস্ত মার্কিন ঘাঁটি পুনর্নির্মাণের মতো সামরিক নির্মাণ ব্যয় যুক্ত করা হয়নি। এর আগে মে মাসের মাঝামাঝিতে পেন্টাগনের এক কর্মকর্তা জানিয়েছিলেন, সে সময় পর্যন্ত যুদ্ধের ব্যয় ছিল প্রায় ২৯ বিলিয়ন ডলার।
সম্প্রতি ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে উত্তেজনা নতুন করে বৃদ্ধি পেয়েছে। প্রায় এক সপ্তাহ ধরে উভয় পক্ষ রাতের বেলা একে অপরের ওপর হামলা চালাচ্ছে। এছাড়া হরমুজ প্রণালিতে বেশ কয়েকটি বাণিজ্যিক জাহাজে ইরানের হামলার পর দুই দেশের মধ্যকার ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি শেষ হয়। গত শুক্রবার ইরানি হামলায় তিন মার্কিন সেনা নিহত হন এবং ইরাকে একটি ইরানি ড্রোন ধ্বংস করার সময় নিয়ন্ত্রিত বিস্ফোরণে আরও এক মার্কিন সেনা প্রাণ হারান। গত ফেব্রুয়ারি মাসে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে এ পর্যন্ত ১৭ জন মার্কিন সেনা নিহত হয়েছেন এবং চলতি মাসে মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন ঘাঁটিতে চালানো একাধিক ইরানি হামলায় প্রায় ১০০ জন সেনা আহত হয়েছেন। সোমবার রাতেও মার্কিন বাহিনী টানা দশম রাতের মতো ইরানের সামরিক অবকাঠামোতে হামলা চালিয়েছে।
কমিটির শীর্ষ ডেমোক্র্যাট সদস্য সিনেটর প্যাটি মারে এই যুদ্ধের তীব্র সমালোচনা করে বলেন, "এই যুদ্ধ আবারও নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে। ট্রাম্প প্রশাসন আমাদের যে নতুন কোনো ঝুঁকিতে ফেলতে চায়, তার জন্য আমরা অন্ধভাবে অর্থ বরাদ্দ দেব না। মার্কিন জনগণ যুদ্ধের দ্রুত ও কৌশলগত অবসান চায়, করের ৭০ বিলিয়ন ডলার দিয়ে যুদ্ধ দীর্ঘায়িত করতে চায় না।"
ডেমোক্র্যাট সিনেটর গ্যারি পিটার্স প্রশাসনের ইরান কৌশলকে "ব্যর্থ" বলে অভিহিত করলে হেগসেথ ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানান এবং একে সেনাদের প্রতি "অপমানজনক" ও "কাণ্ডজ্ঞানহীন" মন্তব্য বলে আখ্যা দেন। পিটার্স পাল্টা জবাবে হেগসেথকেই একজন "ব্যর্থ" নেতা বলে উল্লেখ করেন এবং বলেন যে সঠিক কৌশলের অভাবে সম্মুখসারির সেনারা ঝুঁকিতে রয়েছেন।
কমিটির সভাপতি রিপাবলিকান সিনেটর সুসান কলিন্স নিহত সেনাদের প্রতি শ্রদ্ধা জানান। তিনি এবং সিনেটর লিসা মারকোভস্কির মতো কয়েকজন রিপাবলিকান সিনেটর ট্রাম্পের যুদ্ধ ক্ষমতার রাশ টানার পক্ষে অতীতে ভোট দিলেও, সেনাদের প্রস্তুতি ও প্রতিরক্ষার স্বার্থে এই বিল পরিশোধ করা জরুরি বলে মনে করেন। পেন্টাগন হাউস রিপাবলিকানদের মাধ্যমে বাজেট রিকনসিলিয়েশন প্রক্রিয়ায় এই অর্থ আদায়ের চেষ্টা করছে, তবে সিনেট মেজরিটি লিডার জন থুন এবং অন্য রিপাবলিকানরা সিনেটে এই প্রক্রিয়ার কার্যকারিতা নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেছেন।
