করিম খানের বিরুদ্ধে প্রতিশোধমূলক আচরণের অভিযোগ প্রমাণিত হয়নি

আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের (আইসিসি) তদারকি সংস্থা অ্যাসেম্বলি অব স্টেটস পার্টিসের (এএসপি) সভাপতি পাইভি কাউকোরান্টা জানিয়েছেন, আইসিসির প্রধান কৌঁসুলি করিম খানের বিরুদ্ধে আনা প্রতিশোধমূলক আচরণের (রিটালিয়েশন) অভিযোগ প্রমাণিত হয়নি। গত ১৭ জুলাই সদস্য রাষ্ট্রগুলোর কাছে পাঠানো এক চিঠিতে ফিনল্যান্ডের এই কূটনীতিক জানান, এএসপির ২১ সদস্যের নির্বাহী ব্যুরো প্রয়োজনীয় দুই-তৃতীয়াংশ সমর্থন না পাওয়ায় করিম খানের বিরুদ্ধে ওই অভিযোগে অসদাচরণের কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারেনি।

২০২৪ সালের নভেম্বরে করিম খানের বিরুদ্ধে ওঠা অসদাচরণের অভিযোগ তদন্তের দায়িত্ব জাতিসংঘের অফিস অব ইন্টারনাল ওভারসাইট সার্ভিসেসের (ওআইওএস) কাছে হস্তান্তর করেন কাউকোরান্টা। ওই তদন্তে করিম খানের বিরুদ্ধে যৌন অসদাচরণের একটি অভিযোগও অন্তর্ভুক্ত ছিল। তবে অভিযোগকারী সহযোগিতা না করায় বিষয়টি নিয়ে আগে আইসিসির দুটি অভ্যন্তরীণ তদন্ত শুরু হলেও পরে তা বন্ধ হয়ে যায়। আদালতের নথি অনুযায়ী, ওআইওএস চারটি অভিযোগ তদন্ত করে। এর মধ্যে একটি ছিল করিম খানের কার্যালয়ের এক নারী কর্মকর্তার করা অবাঞ্ছিত যৌন আচরণ ও ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ। বাকি তিনটি ছিল তার কার্যালয়ের সদস্যদের করা প্রতিশোধমূলক আচরণের অভিযোগ।

করিম খান শুরু থেকেই সব ধরনের অভিযোগ অস্বীকার করে আসছেন। জাতিসংঘের তদন্তে তিনি এবং অভিযোগকারী উভয়েই সহযোগিতা করেন। এক বছরের বেশি সময় ধরে জাতিসংঘের তদন্তকারীরা সাক্ষ্যপ্রমাণ সংগ্রহ ও মূল্যায়ন করেন। তাদের ১৫০ পৃষ্ঠার তদন্ত প্রতিবেদন এবং প্রায় ৫ হাজার পৃষ্ঠার প্রমাণাদি ২০২৫ সালের ১১ ডিসেম্বর এএসপির নিয়োগ দেওয়া বিচারকদের একটি প্যানেলের কাছে জমা দেওয়া হয়। ওআইওএস তাদের প্রতিবেদনে প্রতিশোধমূলক আচরণের একটি অভিযোগ বাদ দিয়ে জানায়, প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট পদক্ষেপটি প্রতিশোধমূলক ছিল না; বরং অভিযোগকারীর কর্মদক্ষতা নিয়ে উদ্বেগের কারণে নেওয়া হয়েছিল।

বিচারকদের প্যানেল প্রায় তিন মাস তদন্ত নথি পর্যালোচনা করে সর্বসম্মতভাবে সিদ্ধান্তে পৌঁছায় যে, জাতিসংঘের তদন্তে উপস্থাপিত তথ্য প্রাসঙ্গিক আইনি কাঠামোর অধীনে কোনো অসদাচরণ বা দায়িত্ব লঙ্ঘনের প্রমাণ প্রতিষ্ঠা করে না। তবে কয়েক সপ্তাহ পর এএসপি ব্যুরোর সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্য বিচারকদের ওই মতামত উপেক্ষা করার পক্ষে ভোট দেন এবং করিম খান অসদাচরণ করে থাকতে পারেন বলে মত দেন। এতে পুরো প্রক্রিয়া রাজনৈতিকভাবে প্রভাবিত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়। পরবর্তীতে করিম খান ও অভিযোগকারীদের অতিরিক্ত বক্তব্যের সুযোগ দেওয়ার পর ব্যুরো তাকে সাময়িকভাবে বরখাস্তের সিদ্ধান্ত নেয় এবং বিষয়টি চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের জন্য এএসপির কাছে পাঠায়।

আগামী শুক্রবার নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সদর দপ্তরে অনুষ্ঠিতব্য এএসপির বৈঠকের আগে সদস্যভুক্ত ১২৫টি দেশের কাছে ওআইওএসের প্রতিবেদন, বিশেষজ্ঞ প্যানেলের মূল্যায়ন এবং সংশ্লিষ্ট অন্যান্য নথির সম্পাদিত কপি বিতরণ করা হয়েছে। ওই বৈঠকেই করিম খানের ভবিষ্যৎ নিয়ে ভোট হওয়ার কথা রয়েছে। মিডল ইস্ট আইয়ের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ৮ জুনের ব্যুরোর গোপন সিদ্ধান্তে বলা হয়েছিল, প্রমাণের ভিত্তিতে নিশ্চিত হওয়া গেছে যে করিম খান অভিযোগকারীর সঙ্গে যৌন সম্পর্কে জড়িয়েছিলেন। তবে প্রতিশোধমূলক আচরণের অভিযোগে ব্যুরো কোনো অসদাচরণের সিদ্ধান্ত দেয়নি। কাউকোরান্টার সাম্প্রতিক চিঠিও সেই অবস্থান নিশ্চিত করেছে। চিঠিতে তিনি লিখেছেন, ৮ জুনের সিদ্ধান্তে ব্যুরো স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছিল যে সাক্ষী ডব্লিউ০৬ ও ডব্লিউ১০-এর করা প্রতিশোধমূলক আচরণের অভিযোগে তারা কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারেনি। কারণ এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় দুই-তৃতীয়াংশ সমর্থন পাওয়া যায়নি। তিনি আরও বলেন, কৌঁসুলি নির্দোষ হিসেবে বিবেচিত হওয়ার আইনি অধিকার ভোগ করেন। একই কারণে প্রতিশোধমূলক আচরণের বিষয়টি এএসপির কাছে পাঠানো হয়নি এবং অভিযোগকারী দুই সাক্ষীকেও জানিয়ে দেওয়া হয়েছে যে এ অভিযোগের বিষয়ে তদন্ত কার্যক্রম সমাপ্ত হয়েছে।

এদিকে করিম খানকে ঘিরে তদন্ত পরিচালনায় এএসপি ব্যুরোর ভূমিকা নিয়ে সমালোচনা অব্যাহত রয়েছে। সাবেক ইউরোপীয় ইউনিয়নের পররাষ্ট্রনীতি বিষয়ক প্রধান জোসেপ বোরেল অভিযোগ করেছেন, বিচারকদের সিদ্ধান্তকে সম্মান না জানিয়ে করিম খানকে অপসারণের জন্য এএসপি একটি রাজনৈতিক ভোট আয়োজন করেছে। বোরেলের দাবি, ২০২৪ সালের মে মাসে ইসরাইল ও হামাসের শীর্ষ নেতাদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা চাওয়ার পর থেকে যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা ও হুমকিসহ আইসিসির বিরুদ্ধে যে চাপ সৃষ্টি হয়েছে, করিম খানকে ঘিরে বর্তমান ঘটনাও তারই অংশ।

Related posts